কোটি টাকা লোপাটের ছক বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে

স্বাস্থ্য খাত

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাজবংশী রায়

চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন (এমই অ্যান্ড এইচএমডি) শাখা থেকে জনস্বাস্থ্য ও ক্লিনিক্যাল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে পাঠানোর নামে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা লোপাটের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় চলতি বছর দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণের জন্য নির্ধারিত প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ব্যয়ের টাকা না পাঠিয়ে বেসরকারি কিংবা লিমিটেড কোম্পানির অ্যাকাউন্টে পাঠানো হচ্ছে।

এ প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি গ্রুপে বিভক্ত ৪২৬ জন থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা ও ইন্দোনেশিয়া যাবেন। ইতিমধ্যে একটি দল গত ২ জুলাই ইন্দোনেশিয়ায় গেছে। অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে এ মাসে যাওয়ার কথা। চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত এ প্রশিক্ষণে কর্মকর্তা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদেরও পাঠানো হচ্ছে। তাদের সংখ্যাও চিকিৎসকের তুলনায় বেশি। এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একটি গ্রুপ দুর্নীতির এ ছক তৈরি করেছে। এ বিষয়ে স্ব্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, প্রয়োজন নেই এমন নন-মেডিকেল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভবিষ্যতে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য বিবেচনা করা হবে না। এবার জারি করা সরকারি আদেশে তাদের নাম রাখা হয়েছিল। এখন শেষ মুহূর্তে নাম বাদ দেওয়া হলে তারা কষ্ট পাবেন। তাই তাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

টাকা পাঠানোয় অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, চলতি বছরের শুরু থেকে তিনি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব ও সংশ্নিষ্ট পরিচালক, লাইন ডিরেক্টরসহ অন্য কর্মকর্তারা এ বিষয়টি দেখভাল করেন। তারাই এ সম্পর্কে ভালো বলতে পারবেন। স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগে খুব শিগগির নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। নতুন মহাপরিচালক এলে জটিলতা কমে আসবে।

চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন সমকালকে জানান, সম্প্রতি সচিব হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছেন। তাই অনেক কিছুই তার জানা নেই। বিদেশে প্রশিক্ষণের ঘটনাও তেমন একটি বিষয়। এ নিয়ে সংশ্নিষ্ট শাখায় তিনি কথা বলবেন।

টাকা যাচ্ছে যেসব অ্যাকাউন্টে :স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কাছে অগ্রিম টাকা চেয়ে পাঠানো বিল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পাবলিক হেলথের বিভিন্ন বিষয়ের ওপর মালয়েশিয়ায় ৫৬ জনের প্রশিক্ষণের জন্য এক কোটি ৯০ লাখ ৪০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু টাকা পাঠানোর জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট দেওয়া হয়েছে থাইল্যান্ডের স্কুল অব গ্লোবাল স্টাডিজ, থমসট ইউনিভার্সিটির। অ্যাকাউন্ট নম্বর ৪৭৫-০-৭১৫৯৭-২ উল্লেখ করা হয়েছে।

একই বিষয়ের ওপর আরেকটি আবেদনে ১৮৫ জনের মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য ছয় কোটি ২৯ লাখ টাকা চাওয়া হয়। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা বরাবর পাঠানো এ আবেদনের ডিডিও আইডি- ১৬২০১০১ নম্বর। এ ছাড়া 'রিউমাটোলজি ও পুনর্বাসন, জরুরি রোগী ব্যবস্থাপনা' শীর্ষক মালয়েশিয়ায় ৪১ জনের প্রশিক্ষণের জন্য এক কোটি ৩৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এ দুই প্রশিক্ষণের জন্য 'পেট্রোনেজ ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট মালয়েশিয়া এসডিএন.বিএইচডি' নামের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং ৮৮৮১০২৬৮৮০৬৩২ অ্যাকাউন্ট নম্বরে টাকা পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। ব্যাংকের নাম হিসেবে সে দেশের এএম ব্যাংকের নাম উল্লেখ করা হয়।

কার্ডিওলজি, স্কিল্ড মেডিকেল ল্যাব, স্পাইন সার্জারি, জেরিয়াট্রিক বিষয়ের ওপর ৪৭ জনের প্রশিক্ষণের জন্য এক কোটি ৫৯ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং অ্যাডভান্সড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং অন লিডারশিপ অ্যান্ড গভর্ন্যান্স ফর ডেভেলপমেন্ট অব হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের ওপর মালয়েশিয়ায় ৮ জনের প্রশিক্ষণের জন্য ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। এই টাকা সে দেশের সিআইএমবি ইসলামিক ব্যাংক বারহ্যাডে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। অ্যাকাউন্ট নাম হিসেবে ইউটিএমস্পেস এবং নম্বর ৮৬০১৫১৮২২৮ উল্লেখ করা হয়েছে।

বেসিক মেডিকেল সায়েন্স ও কমিউনিটি মেডিসিনের ওপর মালয়েশিয়ায় ২০ জনের প্রশিক্ষণের জন্য ৭০ লাখ ৩১ হাজার ৪৭২ টাকা চাওয়া হয়। এই টাকা মালায়ান ব্যাংকিং বারহ্যাড ব্যাংকের সিইউসিএমএস এডুকেশন এসডিএন.বিএইডি নামের ৫১২৪-৪৬২০-৪১৫৫ নম্বর অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলা হয়।

'ক্লিনিক্যাল স্পেশালিটি, ট্রেনিং অন এক্সপোজার ভিজিট অন রোলস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিস অব মেডিকেল প্রফেশনালস' শীর্ষক শ্রীলংকায় ৯ জনের প্রশিক্ষণের জন্য ৩০ লাখ ৬০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এতে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নাম হিসেবে কনকোয়েস্ট সল্যুয়েশনস (প্রা.) লি., ব্যাংকের নাম হিসেবে ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পিসিএল এবং অ্যাকাউন্ট নম্বর ১০১৬২০০০০৪৩৫ উল্লেখ করা হয়।

পাবলিক হেলথের বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা বিষয়ের ওপর ইন্দোনেশিয়ায় ১৮ জনের প্রশিক্ষণের জন্য ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছে। এ টাকা সে দেশের ব্যাংক মান্দেরির 'লেমব্যাগা রিসেট কেশেহাটান' নামে ১০৩-০০-০৫১৩৩৫৮-৮ নম্বর অ্যাকাউন্টে পাঠাতে অনুরোধ করা হয়। একই বিষয়ের ওপর একই দেশে আরও ৩৮ জনের প্রশিক্ষণের জন্য এক কোটি ২৯ লাখ ২০ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এই টাকা সে দেশের ওসিবিসি এনআইএসপি ব্যাংকের পিটি এআইটি জেজারিং ইন্দোনেশিয়া নামের ৬৫১৮০০০০০৭৩৯ নম্বর অ্যাকাউন্টে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) আরিফুল ইসলাম সেখের ভাই আলতাব হোসেন থাইল্যান্ডের স্কুল অব গ্লোবাল স্টাডিজ, থমসট ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করেন বলে মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ কারণে অন্য দেশের প্রশিক্ষণের টাকাও তার ভাইয়ের চাকরি করা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে। আলতাব হোসেনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এসব প্রতিষ্ঠানের গুণগত মান নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য তিনি কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বরগুলোও তিনি সরবরাহ করেছেন। ৪২৬ জনের কাছ থেকে জনপ্রতি বাড়তি দুই থেকে আড়াই হাজার ডলার হিসেবে হাতিয়ে নিতেই এ আয়োজন করা হয়েছে বলে এসব সূত্র নিশ্চিত করেছে।

এ বিষয়ে থাইল্যান্ডে অবস্থানকারী আলতাব হোসেনকে ফোন করলে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, থমসট ইউনিভার্সিটিতে দু-একটি দল প্রশিক্ষণ নেবে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তবে এই ইউনিভার্সিটির ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর বিষয়টি তার জানা নেই। মালয়েশিয়ায় এ ইউনিভার্সিটির কোনো শাখা নেই।

এ বিষয়ে আরিফুল ইসলাম সেখ সমকালকে বলেন, দেশে উড়ো খবর তো কম হয় না। সব উড়ো খবর ধরে তো আর কাজ করা যায় না। কাগজপত্র ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যাচাই করুন। সংশ্নিষ্টদের জিজ্ঞাসা করুন। এগুলো আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তিনি নতুন নয় জানিয়ে এপিএস আরিফুল বলেন, প্রায় ছয় বছর ধরে আছি। কোথাও কোনো ইন্টারফেয়ার করিনি। এসব বিষয়ে কোনো ইনভল্‌ভমেন্ট নেই। তারপরও একটি চেয়ারে যেহেতু আছি, অনেক কথা উঠবেই। এটি কোনো ব্যাপার নয়; আপনি সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলুন।

স্থানীয় প্রশিক্ষণ কাটছাঁট করে লোপাট :অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ট্রেনিং প্ল্যান অনুযায়ী নতুন নিয়োগ করা চিকিৎসকদের জন্য ১৫ দিনব্যাপী 'বেসিক সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট' শীর্ষক স্থানীয় প্রশিক্ষণের জন্য পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু এ প্রশিক্ষণ কাটছাঁট করে চার কোটি টাকা বৈদেশিক প্রশিক্ষণ খাতে নিয়ে যাওয়া হয়। চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে বলা হয়, প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে 'নবনিয়োগকৃত চিকিৎসকদের জন্য ১৫ দিনব্যাপী বেসিক সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট প্রশিক্ষণ' সম্পন্ন করতে গেলে এ সংকট আরও ঘনীভূত হবে। এই প্রশিক্ষণ আংশিক সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়ে প্রস্তাবে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ের এ প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকে চার কোটি টাকা বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে।

প্রস্তাবটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর পর চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি তা অনুমোদন পায়। যুগ্ম সচিব একেএম মাসুদুর রহমান স্বাক্ষরিত অনুমোদনপত্রে অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে পাঁচটি শর্তারোপ করা হয়। এর পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে গত ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার সংশ্নিষ্টদের কাছে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের দিনক্ষণ নির্ধারণের জন্য চিঠি পাঠানো হয়। এতে দেখা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জুলকিফিলি বিন ওসমান নামে একটি ব্যক্তির কাছে পাঁচটি গ্রুপে ভাগ করে ৫৩ জনের তালিকা সংবলিত একটি চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে তাকে ইউনিভার্সিটি টেকনোলজি মালয়েশিয়ার (ইউটিএম) ট্রান্সন্যাশনাল এডুকেশন ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একই দিন অপর এক আদেশে মালয়েশিয়ায় আরও ১৭টি গ্রুপে ভাগ করে ২৫৯ জনের তালিকা দিয়ে ডেভিড বেনজামিন খোর নামে এক ব্যক্তির কাছে চিঠি পাঠানো হয়। তাকে ইউনিভার্সিটি অব মালয়েশিয়ার জিডি মাল্টিস্পেশালিস্ট হসপিটালের ইন্টারন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। মালয়েশিয়ায় আরও ৬টি গ্রুপে ৪২ জনের নামের তালিকা পাঠানো হয়।

চারটি গ্রুপে ৫৬ জনের তালিকা পাঠানো হয় থাইল্যান্ডের পাইথাই নওয়ামিন হাসপাতালের প্রফেশনাল ট্রেনিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (পিটিএম) ডিরেক্টরের কাছে। সূত্র মতে, পাইথাই নওয়ামিন হাসপাতালের কোনো প্রতিষ্ঠান নয় এই পিটিএম। এটির মালিক বাংলাদেশি সরফরাজ নেওয়াজ জিউস। বিষয়টি জানতে থাইল্যান্ডে অবস্থানকারী জিউসকে কয়েক দফা ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি রিসিভ করেননি। সম্প্রতি পাইথাই নওয়ামিন হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহরিয়ার নবী শাকিল। সেখানকার প্রশিক্ষণে অসন্তোষ প্রকাশ করে তিনি সমকালকে বলেন, প্রশিক্ষণের ধরন নিয়ে তিনি হতাশ। সরকারিভাবে কোনো প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে গেলে লক্ষ্য থাকে ভালো প্রশিক্ষণ হবে এবং সেখান থেকে শিক্ষণীয় কিছু পাওয়া যাবে, যেটি রোগীর সেবার পাশাপাশি সহকর্মীদের সঙ্গে শেয়ার করে তাদেরও দক্ষ করে তোলা যায়। ওই প্রশিক্ষণে সেসব কোনো বিষয় ছিল না।

এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় দুটি গ্রুপে ৪৩ জনের তালিকা পাঠানো হয় এশিয়ান ইন্টিগ্রেটেড ট্রেনিং নেটওয়ার্ক নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর বিজায়ন্ত সোহেদির কাছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন :স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণের জন্য ১৯টি বিষয়ের আওতায় ৩১ প্যাকেজে ৪২৬ জনের নামে সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়। প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ভাতা বাবদ চার কোটি ৯৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৫ টাকা, বিমান ভাড়া দুই কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর বাইরে টিউশন, ইনস্টিটিউশনাল ও প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ব্যয় হিসেবে ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৪৭২ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সব মিলে বিদেশে প্রশিক্ষণ বাবদ ২১ কোটি ৭২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৭ টাকা ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রশিক্ষণের জন্য জনপ্রতি চার হাজার ডলার বা তিন লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। পৃথক দেশের প্রতিষ্ঠান হলেও সবটির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় একই ধরা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্নিষ্ট শাখার কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, গত কয়েক বছর ভারত, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বড় বড় নামি-দামি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য চিকিৎসক-কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণে পাবলিক হেলথের বিভিন্ন বিষয়ে সর্বোচ্চ দেড় হাজার ডলার এবং ক্লিনিক্যাল বিষয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার ডলার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় হতো। কিন্তু এবার সব প্রশিক্ষণের জন্যই ৪ হাজার ডলার করে ব্যয় ধরা হয়েছে, যা আগের তুলনায় জনপ্রতি দুই থেকে আড়াই হাজার ডলার বেশি এবং অস্বাভাবিক। ফলে ১০ থেকে ১২ কোটি টাকা এর সঙ্গে যুক্ত সিন্ডিকেটের পকেটে যাবে বলে মনে করেন তারা। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দেবে, সেগুলোর গুণগত মানও তেমন ভালো নয় বলে জানিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।

চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী সমকালকে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের কেনাকাটা ও অর্থ বরাদ্দ থেকে শুরু করে সর্বত্র সীমাহীন লুটপাট চলছে। বিদেশে প্রশিক্ষণের নামেও একই কাজ হচ্ছে। জনপ্রতি বরাদ্দ, বিমান ভাড়া ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় থেকে শুরু করে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মান পর্যালোচনা করলে দুর্নীতির বিষয়টি স্পষ্ট হবে। গুণগত মান নেই- এমন প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের জন্য কেন এত টাকা ব্যয় করতে হবে? আশা করি, এ দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।

স্বাচিপ সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম ইকবাল আর্সলান সমকালকে বলেন, বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণার্থীরা ঘোরাঘুরি ও শপিং করা নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করেন। ৭ এবং ১০ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে একটি সিন্ডিকেট বাণিজ্য করছে। এবার সেটি অত্যন্ত ভয়ানকভাবে হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য আগে যেভাবে প্রশিক্ষণার্থীদের পাঠানো হতো, এবারও একইভাবে পাঠানো হয়েছে। তবে প্রক্রিয়াগত কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে।