সারাদেশে বাস চলাচল শুরু
ভাড়া বেশি, স্বাস্থ্যবিধি মানায় গরজ কম
সীমিত পরিসরে গণপরিবহন চললেও মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি। প্রথম দিনে ঠেলাঠেলি করেই যাত্রীদের বাসে উঠতে দেখা যায়। সোমবার শনিরআখড়া এলাকার ছবি- সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০১ জুন ২০২০ | ১৫:১২
করোনা মহামারি রোধে দীর্ঘ দুই মাস বন্ধ থাকার পর গতকাল সোমবার যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হয়েছে রাজধানীসহ সারাদেশে। বাসগুলোতে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ায় আদায় হলেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসের আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা পালন করতে দেখা গেছে। তবে ভিন্ন চিত্রও ছিল কোথাও কোথাও। চট্টগ্রাম নগরীর টাইগারপাস মোড়ে বাসে দাঁড়িয়েও যাত্রী পরিবহন করতে দেখা গেছে। সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হলেও রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এবং নারায়ণগঞ্জের একটি কাউন্টারে যাত্রীরা গা ঘেঁষে লাইনে দাঁড়িয়ে বাসে উঠেছেন। বাসে স্যানিটাইজার রাখা, যত্রতত্র যাত্রী না তোলা, যাত্রী ওঠানামার সময় তিন ফুট দূরত্ব রক্ষা, প্রতি যাত্রার আগে বাস জীবাণুমুক্ত করার এসব শর্তও মানা হচ্ছে না।
লোকসান পোষাতে ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়লেও প্রথম দিনে কোনো বাসে ভাড়া দ্বিগুণের বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার যাত্রী না থাকায় অধিকাংশ বাস প্রথম দিন সড়কে নামেনি। মালিকরা বলছেন, যাত্রী নেই। বাস নামিয়ে লাভ কী? আবার যাত্রীরা বলছেন, করোনার ভয়ে বাসে উঠতে ভয় হয়। একেবারে অপরাগ না হয়ে কেউ বাসে উঠছেন না।
যাত্রীদের বাদুড়ঝোলা করে বহনের 'খ্যাতি' রয়েছে গাবতলী-সদরঘাট রুটের বাসগুলোর। কিন্তু গতকাল দেখা গেল ভিন্ন দৃশ্য। সরেজমিন সেন্ট্রাল পরিবহনের বাসে (ঢাকা মেট্রো-জ-১১-৩০২৩) ভ্রমণ করে দেখা গেল, ১০টি বাড়তি আসন বসানো হয়েছে। ৩২ সিটের বাসকে অবৈধভাবে ৪২ সিটে রূপান্তর করা হয়েছে। করোনাকালে বাসটিতে সর্বোচ্চ ১৬ জন যাত্রী পরিবহনের অনুমতি রয়েছে। অবৈধভাবে যোগ করা বাড়তি আসন হিসাবে ধরলে ২১ জন যাত্রী পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। বাসটিতে সিকদার মেডিকেল থেকে গাবতলী ভ্রমণ করে দেখা গেল, কখনোই ১৬ জন যাত্রী পায়নি। সিকদার মেডিকেল থেকে গাবতলীর সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১০ টাকা। আগে নেওয়া হতো ১৫ টাকা। গতকাল নেওয়া হয় ২৫ টাকা।
কোনো বাসে নেই বর্ধিত ভাড়ার তালিকা। মালিক-চালকরা জানিয়েছেন, সরকার এখনও তালিকা দেয়নি তাদের। তাই তারা নিজের মতো হিসাব করে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। যাত্রীদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক হচ্ছে। তালিকা পেলে এ সমস্যা থাকত না।
বাড়তি ভাড়া নিতে দেখা গেল নতুন বাজার থেকে সাভার রুটের 'অগ্রগামী পরিবহনে'। গাবতলী সেতু থেকে হেমায়েতপুরের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ২৫ টাকা। এ পথে সরকার নির্ধারিত ভাড়া ১৪ টাকা। করোনকালে তা ২২ টাকা হওয়ার কথা। যাত্রীরা বলছেন, আগে ১০ টাকা নেওয়া হতো। বাসের চালক নজরুল ইসলাম বললেন, যাত্রী পেতে আগে তারা ৪ টাকা কম নিতেন। ৪০ আসনের বাসে অন্তত ৬০ জন যাত্রী নিতেন। ৪ টাকা কম নিলেও পোষাত। এখন ২০ জন যাত্রী নিতে পারবেন, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তাও পাচ্ছেন না। তাই কম ভাড়া নেওয়া সম্ভব নয়।
সেন্ট্রাল পরিবহন ও অগ্রগামী দুটি বাসেই অর্ধেক সিট খালি রেখে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা হয়েছে। তবে স্যানিটাইজার, চালক-শ্রমিকের মাস্ক, গ্লাভসসহ বাকি সুবিধাগুলো নেই। কয়েকজন মালিক দাবি করেছেন, তারা সব সরঞ্জাম দিয়েছেন। তবে উভয় বাসের চালক বললেন, মালিকের কাছ থেকে তারা সুরক্ষা সরঞ্জাম পাননি।
গাবতলী থেকে হানিফ পরিবহনের রংপুর বিভাগের জেলাগুলোর বাস ছাড়ে। হানিফের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোশাররফ হোসেন জানালেন, তারা বাসে স্যানিটাইজার দিচ্ছেন। বাসে ওঠার আগে যাত্রীদের জীবাণুমুক্ত করছেন। কিন্তু যাত্রীর খুবই সংকট। যে বাসে ২০ জন যাত্রী পরিবহনের অনুমতি রয়েছে, সেখানে ১০ থেকে ১২ জন যাত্রী হচ্ছে।
হিমাচল পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আফতাব মাসুদ সমকালকে জানান, তার কোম্পানির বাস চারটি রুটে চলে। ঢাকা-নোয়াখালী রুটে ৬০টি দূরপাল্লার বাস রয়েছে। গতকাল চলেছে ১৬টি। যাত্রী না থাকায় বাকিগুলো পথে নামাননি। মিরপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটে চলে ৪০টি বাস। গতকাল নেমেছিল ২০টি। কিন্তু সেখানেও যাত্রী সংকট। 'গুলশানের চাকা' বাস এখনও চালুই করেননি।
আফতাব মাসুদ জানালেন, মিরপুর-নারায়ণগঞ্জ রুটের ভাড়া ছিল ৬০ টাকা। এখন নিচ্ছেন ৯৫ টাকা। এর আগে ঢাকা-নোয়াখালীর ভাড়া ছিল ৩৮০। এখন নিচ্ছেন ৬০০। তিনি বলেন, একে তো করোনা, তার ওপর আবার ভাড়া বেশি। কেউ বাসে উঠতে চায় না।
রাজধানীর হাজারীবাগ, বছিলা, মোহাম্মদপুর, গাবতলী, কল্যাণপুর, শ্যামলী, তেজগাঁও, প্রেসক্লাব, শাহবাগ হয়ে জিগাতলা পর্যন্ত গণপরিবহনের প্রায় অভিন্ন দৃশ্য দেখা গেছে। বাসগুলো স্বাস্থ্যবিধি মানছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণে বিআরটিএ বা সরকারের কোনো সংস্থার তদারকি দেখা যায়নি। অনলাইন ব্রিফিংয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ ভিজিল্যান্স টিম, মোবাইল কোর্টসহ টার্মিনাল কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয় তদারকি করতে বলা হয়েছে।
মহাখালী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয়েছে। সেখান থেকে যাত্রীর আগে বাসে জীবাণুনাশক স্প্রে করতে দেখা গেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, প্রথম দিনে সার্বিক পরিস্থিতি সন্তোষজনক। সামাজিক দূরত্ব ভঙ্গের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সরকার যা নির্ধারণ করেছে, সেই ভাড়াই নিচ্ছেন মালিকরা।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেছেন, প্রথম দিনে দু-এক জায়গায় বাড়তি ভাড়া ছাড়া আর কোনো অভিযোগ নেই। যাত্রী কম, তাই সামাজিক দূরত্ব আছে। কিন্তু যাত্রী বাড়লে তা থাকবে এমন নিশ্চিয়তা নেই। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় চালক-শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। এতে সমস্যা হচ্ছে।
এদিকে খুলনা ব্যুরো জানিয়েছে, ৬০ শতাংশেরও বেশি বাড়তি ভাড়া আদায় করায় খুলনা-বাগেরহাট রুটের নিউ নূপুর পরিবহনকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। তবে এখানকার বাসগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাচল করতে দেখা গেছে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, শিমুলিয়া-ঢাকা রুটের বিভিন্ন পরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না। এমনকি বাসের হেলপারদের যাত্রীদের হাত ধরে টানাটানি করতে দেখা গেছে। কাউন্টারগুলোতেও ছিল যাত্রীদের জটলা। বর্ধিত ভাড়া নিলেও আসন ফাঁকা রাখার নির্দেশনা মানেনি অনেক বাস। পাশাপাশি দুই সিটেও যাত্রীরা বসছেন।
পটুয়াখালী প্রতিনিধি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পটুয়াখালীতে দূরপাল্লা ও অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীবাহী বাস চলাচল শুরু হয়েছে। এতে খুশি সাধারণ যাত্রীরা। বর্ধিত ভাড়া পেয়ে খুশি পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, স্বাস্থ্যবিধি মেনেই জেলা সদর থেকে সব রুটে বাস চলাচল শুরু হয়েছে। দূরপাল্লার বাসে সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ার বাইরেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ছিল যাত্রীদের।