দুর্নীতি বেড়েছে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অনুপস্থিতিতে
বিশেষজ্ঞ মত
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০১:১৬ | আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৩:৩৭
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) প্রতিবেদনে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানের অবনতি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ জন্য দায়ী দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের অভাব। তারা বলছেন, জবাবদিহি না থাকায় বেড়েছে দুর্নীতি। দুর্নীতি দমনের পরিবর্তে সরকার উল্টো দুর্নীতিবাজদের রক্ষা করছে। ফলে ক্ষমতাবানরা এক ধরনের বিচারহীনতার সুবিধা ভোগ করছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত টিআইর প্রতিবেদন অনুসারে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪৯তম। আগের বছর ১৪৭তম অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
সংস্থাটির মতে, সরকারি কেনাকাটা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি বেশি বেড়েছে। অর্থ পাচার এবং আর্থিক অপরাধের বিষয়গুলোতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, যথাযথ পদক্ষেপ না নেওয়ায় বেড়েছে ঋণখেলাপি। সেপ্টেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা। সঙ্গে বাড়ছে টাকা পাচার। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা জিএফআইর তথ্য বলছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো এবং এসডিজি বাস্তবায়নে
নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য সমকালকে বলেন, দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের যে অবনতি হয়েছে, তা জনগণের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন। সাম্প্রতিক সময়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সূচকে যে অবনতি হয়েছে, তার সঙ্গে দুর্নীতির সূচকের অবনতির সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া গণতান্ত্রিক পরিবেশের বর্তমান যে প্রবণতা, তার সঙ্গে দুর্নীতি বাড়ার ধারণাকে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কারণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া দুর্নীতি কমানো যায় না। বাংলাদেশে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুর্বল, ফলে দুর্নীতির ধারণা সূচকে যেসব তথ্য ও পরিসংখ্যান এসেছে, তা যুক্তিযুক্ত মনে হয়।
গত ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নতুন সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কেনাকাটাসহ সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি বলছে, দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবনতি প্রমাণ করে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবিক অর্থে কার্যকর হয়নি। সংস্থাটির মতে, আইনের প্রয়োগ ও কাঠামোগত দুর্বলতায় বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে; বরং যারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত তাদের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা বেড়েছে।
টিআইবির এসব মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুদার বলেন, সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব নয়।
ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের অধ্যাপক মুশতাক হুসাইন খান বলেন, বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমরা জানি, দুর্নীতি ব্যাপকভাবেই আছে। তা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এটি এমন জায়গায় গেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর। যেমন ব্যাংকিং খাতে ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা ও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থপাচার। স্বাভাবিক দেশ হলে নিচের থেকে দুর্নীতি কমিয়ে আনতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। রপ্তানি বাজার সংকুচিত, রিজার্ভ কমে আসছে, ব্যাংকিং খাতে অনাদায়ী লোন ১০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। এ রকম বিশেষ সময় সরকারকে বিশেষ কিছু খাতে হাত দেওয়া উচিত। কিন্তু সেখানে শক্তিধরদের স্বার্থ জড়িত। তিনি বলেন, শতভাগ দুর্নীতি কমাতে না পারি, শতভাগ হুন্ডি বন্ধ করতে না পারি, শতভাগ ঋণ ফেরাতে না পারি, অন্তত ৫০ ভাগ সমাধান না করলে দেশ বিপদে পড়বে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোর দুর্নীতি আমাদের কমাতেই হবে।