দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ
কোলাজ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ০১:০০ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ০৭:২০
স্বাধীনতার ৫০ বছরেও বাংলাদেশে কোনো জাতীয় প্রতিষ্ঠান ঠিকভাবে গড়ে ওঠেনি। আদালতে গিয়ে সবাই সমান বিচার বা পুলিশের কাছে গিয়ে সবাই সমান সেবা পান কিনা– তা নিয়ে সন্দেহ আছে। একাত্তরে স্বাধীনতা লাভের পর যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা ছিল, সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে দক্ষিণ এশিয়ার অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেও বাংলাদেশ তা ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যা আজ দৃশ্যমান নয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার অধ্যাপক রেহমান সোবহান এবং ড. রওনক জাহান সম্পাদিত ‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ: ইকোনমি, পলিটিকস, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে বক্তারা এসব কথা বলেন। রাজধানীর ধানমন্ডিতে গবেষণা সংস্থা সিপিডির কার্যালয়ে এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো রওনক জাহান। সমাপনী বক্তব্য দেন সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান। অনুষ্ঠানে বইটির লেখকরা সশরীরে ও অনলাইনে যুক্ত হয়ে তাদের লেখার সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন।
অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, আমাদের দেশের উন্নয়নে অনেক ফাঁক আছে। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, বিচারালয়ে গিয়ে সবাই কি সমান বিচার পান? পুলিশের কাছে গেলে সবাই কি সমান আচরণ পান? ব্যাংকে গিয়ে সবাই কি ঋণ পুনঃতপশিলের সুযোগ পান? তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়নি। নির্বাচন কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের কথাই বলি– সর্বক্ষেত্রে একই অবস্থা চলছে। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ না হওয়ায় সুশাসনে সমস্যা তৈরি করছে; সমস্যা তৈরি করছে রাজনীতিতেও।’
গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে বলতে গিয়ে রেহমান সোবহান বলেন, আমাদের রাজনৈতিক উত্তরণ নিয়েও কথা আছে। ছিয়ানব্বইয়ের প্রেক্ষাপটে যখন রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয়, তখন সব কিছু ভালোই ছিল। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ, অবাধ ও সর্বজন-গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে পঁচাত্তরের পর আওয়ামী লীগ ফের ক্ষমতায় এসেছিল। নির্বাচনের এ প্রক্রিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে– কীভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে করা যায়। গত নির্বাচনের বিষয়টি বাদ দিলে পাকিস্তান এবং নেপাল বাংলাদেশের এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে নির্বাচন ব্যবস্থার প্রচলন করেছিল।
বিশিষ্ট এ অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি দ্বিদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। একানব্বইয়ে বিএনপি এবং ছিয়ানব্বইয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় আসায় এক প্রত্যাশা তৈরি হয়– তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছ, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়। উভয় দল একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল এবং এর মাধ্যমে ক্ষমতার একটি ভারসাম্য তৈরি হয়েছিল, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করছিল। তবে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নব্বইয়ে আন্দোলন করে এরশাদ সরকারের পতনের পর যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জন্ম হয়েছিল, সে বাংলাদেশ আজ কোথায়– প্রশ্ন রাখেন তিনি।
রেহমান সোবহান বলেন, আজ ব্যাংক খাতের সংস্কারের নামে নতুন ধাঁচের অবনমন শুরু হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দিয়েছে ব্যাংকগুলো। খেলাপি ঋণের কারণে আমানতকারীরা ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণ সংকট শুধু সুশাসনের অভাবে। এখন আর্থিক খাতকে শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে রক্ষা করতে হবে।
অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে নানা পরিবর্তন হয়েছে। কীভাবে এ পরিবর্তন হয়েছে, তা দেখতে ও বুঝতে কারা পরিবর্তন করেছেন, কীভাবে পরিবর্তন এবং এ পরিবর্তনের জন্য কোথায়, কাকে কতটুকু মূল্য দিতে হয়েছে, তা বুঝতে নতুন বইটিতে নানামুখী প্রবন্ধ সংকলন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এর আগে ১৯৯৬ সালে ২৫ বছর উপলক্ষে বাংলাদেশ নিয়ে এ রকম আরেকটি বই প্রকাশ করা হয়েছিল। তখন ধারণা করা হয়েছিল, বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে ভালো জায়গায় যাবে। তখন অর্থনীতি নিয়ে তত উচ্চাশা ছিল না। এখন রাজনীতি নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে; বরং অর্থনীতি ভালো অবস্থায় আছে। তিনি আরও বলেন, পরিবর্তনের যেমন ভালো দিক আছে, তেমনি মন্দ দিকও আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। তবে এ জন্য কিছু মূল্য দিতে হয়; আমাদের দিতে হয়েছে। ২৫ বছর আগে ১৯৯৬ সালে ভবিষ্যৎ নিয়ে যে ধারণা করেছিলেন, তা সত্য হয়নি।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান নিজের কলেজ জীবনে ১৯৬২ সালে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঢাকায় প্রথম মিছিলে যোগ দেওয়ার স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেদিন মিছিলে স্লোগান দিয়েছি– সামরিক শাসন চাই না। নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই, ভোটের অধিকার চাই। বাক্স্বাধীনতা চাই। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই। তার পরের ইতিহাস আমরা সবাই জানি। ইতোমধ্যে ৬২ বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। আমরা সে দাবির কথা এখনও বলি। এখনও বলি– নির্বাচন চাই, গণতন্ত্র চাই, ভোটের অধিকার চাই, কথা বলার অধিকার চাই, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই।’
অর্থনীতিবিদ আখতার মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে সেচ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রেমিট্যান্সের ভূমিকা বেশি। সুশাসনের দুর্বলতার পরও এ উন্নতি হয়েছে। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নানা সমস্যার মধ্যেও আর্থসামাজিক নানা সূচকে উন্নতি হয়েছে। প্রথম প্রজন্মের চ্যালেঞ্জগুলো কোনোভাবে উত্তরণ করে গেছে। এখন দ্বিতীয় প্রজন্মের চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। তবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতাভিত্তিক প্রতিযোগী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারব কিনা, তার ওপর। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে বের হতে না পারলে ব্রাজিল ও ফিলিপাইনের মতো মধ্যম আয়ের দেশের ফাঁদে আটকে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা নিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তৈরি পোশাক দিয়ে আমরা উন্নয়নের পরবর্তী ধাপ পার করতে পারব না। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার মান দুর্বল হয়েছে। ব্যাংক, কর এবং বিচার ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সংস্কার করতে গেলে যে বাধা আসছে, তা রুখে দিতে রাজনৈতিক ঐক্য দরকার। সেলিম রায়হান বলেন, দুর্নীতির ক্ষেত্রে দেশে এক ধরনের স্থিতিশীলতা আছে। এই চক্র ভাঙতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।
নিজের প্রবন্ধ নিয়ে বলতে গিয়ে ড. এম এম আকাশ বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে গড় উন্নতির মতো। এই গড় উন্নতি হলো এমন যে, অর্ধেকটা ফ্রিজের মধ্যে, বাকি অর্ধেকটা ওভেনে। এভাবে আমরা নাতিশীতোষ্ণ অবস্থায় আছি। এই ‘গড়’ ফাঁকির মধ্যে আমরা পড়ে আছি। এ কারণে এখানে দারিদ্র্য কমলেও অন্যায্যতা বেড়েছে। শ্রমিকের গড় উৎপাদনশীলতার সঙ্গে মজুরি বাড়েনি।
অর্থনীতিবদ ড. রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের কথা বলতে গেলে কৃষির উন্নতির কথা বলতেই হবে। এ দেশে কৃষিতে নীরব বিপ্লব হয়েছে। কৃষি ব্যবস্থা বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্যের জোগানের পাশাপাশি কর্মসংস্থানও তৈরি করেছে। এক সময় এ দেশের প্রধান ফসল আমনের পরিবর্তে এখন বোরো ধান প্রধান ফসলে রূপান্তর হয়েছে। দেশে শিল্পে শ্রমিক এবং বিদেশে প্রবাসী শ্রমিকরা উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। তবে তার প্রকৃত মূল্য তারা পাচ্ছেন না।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা লাভের পর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ার কথা ছিল। সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর মতে, বাংলাদেশ এখনও সস্তা শ্রমের ফাঁদে আটকে গেছে। যেমন ব্রাজিল ও ফিলিপাইনও আটকে আছে। এখন দুর্নীতি অতি ধনী তৈরি করছে। দুর্নীতি আগেও ছিল। তখন দুর্নীতি হতো নিজের সুবিধার জন্য। এখন দুর্নীতি হয় নিজেকে টিকিয়ে রাখতে।
ড. জাহিদ হোসেন বলেন, স্বাধীনতার পর আমাদের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ছিল– সবার জন্য সমতা নিশ্চিত করা হবে। তবে ৫০ বছরেও এটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আমাদের উন্নতি হয়েছে বটে, তবে ভবিষ্যৎকে বন্ধক রেখে উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। উন্নতি হচ্ছে, তবে কার উন্নয়ন কার খরচে হচ্ছে, তা দেখার বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরে অন্যায্য অবস্থা বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. সেলিম জাহান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে অঞ্চলভেদে অসমতাও বেড়েছে। আমাদের উন্নয়ন দারিদ্র্যকে দূর করে দিতে পারেনি। উন্নয়ন যতটা হয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বৈষম্য ও অসমতা বেড়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানীয় জলের সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। আগামীর পরিবর্তনকে বিবেচনায় রেখে নীতিমালা করা দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
ড. মির্জ্জা এম হাসান বলেন, গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে সত্যিকারের রাজনীতি দেখা যায়নি। এখানে একটি দল একক প্রাধান্য বিস্তার করে আছে, যার কথায় সব কিছু চলে। ৪৩ বছর ধরেই এ অবস্থা চলছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচনের পর দল একক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে, ক্ষমতার বদল হয়েছে। তারপর ওই বিজয়ী দল সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেছে। এখন ব্যবসায়ীরা রাজনীতিও নিয়ন্ত্রণ করছে। বাংলাদেশের পুঁজিবাদ কি যুক্তরাষ্ট্রের মতো, নাকি তা চীনের মতো রাজনৈতিক পুঁজিবাদ ব্যবস্থা চলবে, তা এখনও ঠিক হয়নি।
আলাদা তিনটি গবেষণামূলক লেখায় বলা হয়েছে, স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যবস্থা মূলত তিনটি রূপ গ্রহণ করেছে। সামরিক শাসন, প্রতিযোগিতামূলক দল ব্যবস্থা ও কর্তৃত্ববাদী দল ব্যবস্থা। এখন চলছে কর্তৃত্ববাদী দলব্যবস্থা; এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে অনির্বাচিত শাসকের শাসনব্যবস্থার মতো।
এতে আরও বলা হয়েছে, রক্ষণশীল ইসলামপন্থি রাজনীতি ক্রমে শক্তিশালী হচ্ছে। গণতান্ত্রিক পরিসর আরও কমে এলে ক্ষমতাসীনদের নৈতিক বৈধতার জন্য ইসলামী শক্তির ওপর নির্ভরতা আরও বাড়বে। এর ফলে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি ও ইসলামপন্থি রাজনীতির মধ্যে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা ক্ষেত্রে পরিণত হবে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা আর আছে কিনা– তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
- বিষয় :
- গণতন্ত্র
- অধ্যাপক রেহমান সোবহান