উপজেলা পরিষদ
সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপ আরও বাড়ার শঙ্কা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য পরিদর্শন কক্ষের নামে অফিস স্থাপন হলে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা আরও কমবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কর্তৃত্ব নিয়ে এমপি ও চেয়ারম্যানদের ‘পুরোনো’ বিরোধ বাড়বে। ১৩টি জেলার ৩৬ জন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের ৩২ জনই এই মত জানিয়ে বলেছেন, স্থানীয় সরকারে নৈরাজ্য হবে। তাই এমপিদের সংসদীয় এলাকায় অফিস দিতে হলে পরিষদের বাইরে দেওয়া উচিত।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন। সংবিধান অনুযায়ী স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব উপজেলা পরিষদের। এমপিদের পরিষদ ভবনে কার্যালয় দেওয়া হলে ক্ষমতার ভারসাম্য আর থাকবে না। এমপিরা উন্নয়ন কাজে জড়িয়ে পড়লে জবাবহিদিতা, স্বচ্ছতা থাকবে না। স্থানীয় সরকারও থাকবে না। সংসদীয় এলাকায় এমপিদের অফিস রক্ষণাবেক্ষণে মাসে ১৫ হাজার টাকা ভাতা দেওয়া হয়। তা দিয়ে তারা পরিষদের বাইরে অফিস নিতে পারেন।
সম্প্রতি এনসিপির এমপি ড. আতিকুর রহমান মুজাহিদ সংসদে বক্তৃতায় এমপিদের জন্য নির্বাচনী এলাকায় কার্যালয় সুবিধা দেওয়ার দাবি জানান। গত মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে জানান, প্রধানমন্ত্রী এই দাবি পূরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রতিটি উপজেলায় পরিষদের ভবনে একটি কক্ষ এমপিদের জন্য নির্ধারিত রাখতে উপজেলা নির্বাচনী কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে সরকারি আদেশ জারি করা হয়েছে। তবে আইনের কারণে অফিস নয়, নাম হবে পরিদর্শন কক্ষ।
সরকারি এবং বিরোধীদলের এমপিরা একযোগে টেবিল চাপড়ে এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। বিরোধী দলের এমপিরা এই ইস্যুতে সরকারকে সমর্থন করছেন। সরকারি দলের মতো বিরোধীদলীয় এমপিরাও বলছেন, উপজেলা পরিষদে কার্যালয় স্থাপন হলে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় নেই। বরং পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে এমপিরা উন্নয়ন কাজে সমন্বয় করতে পারবেন। সরকারি এবং বিরোধী দলের আট এমপি সমকালের কাছে একই রকম মন্তব্য করেছেন।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সমকালকে বলেছেন, অফিস নয়, একটি ‘পরিদর্শন কক্ষ’ দেওয়া হচ্ছে এমপিদের। তারা পরিষদের কাজে খবরদারি করবেন না। পরিদর্শন কক্ষে বসে শুধু স্থানীয় জনগণ এবং সাক্ষাৎপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলবেন।
কুমিল্লা-১১ আসনের এমপি এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, কোনো এমপি যদি উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করতে চান, তাহলে তো অফিস না থাকলেও তা করতে পারেন। আবার অফিস থাকলেই হস্তক্ষেপ করবেন, তেমন নয়।
সাবেক চেয়ারম্যানরা ‘বিপদ’ দেখছেন
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের পতনের পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ১০ দিনের মাথায় স্থানীয় সরকার-সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশ জারি করে। এসব অধ্যাদেশে সিটি করপোরেশন আইন, জেলা পরিষদ আইন, উপজেলা পরিষদ আইন এবং পৌরসভা আইন সংশোধন করা হয়।
বিশেষ পরিস্থিতিতে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, সদস্য, কাউন্সিলরদের কারণ দর্শানো ছাড়াই অপসারণ করে অনির্বাচিত প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতা সরকারকে দিয়ে আইনে বিধান যুক্ত করা হয়। এই ক্ষমতাবলে আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় সরকারি কর্মকর্তাদের।
বিএনপি ক্ষমতায় এসে সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দিয়ে দলীয় নেতাদের প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ এবং প্রশাসক নিয়োগের অধ্যাদেশগুলোকে আইনে পরিণত করেছে বিএনপি সরকার। যদিও বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি ছিল, আদালতের রায়ে দণ্ডিত না হলে জনপ্রতিনিধিদের অপসারণ করা হবে না। মৃত্যুজনিত কারণে পদ শূন্য না হলে প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না।
অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হওয়ায় ভবিষ্যতে সরকার চাইলে যে কোনো সময় যে কোনো জনপ্রতিনিধিকে সরিয়ে দিতে পারবে। আওয়ামী লীগ আমলের আইনে বলা ছিল, কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে শুধু আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করলে তবেই সাময়িক বরখাস্ত করা যাবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অপসারিত হওয়া ৩৬ জন উপজেলা চেয়ারম্যান এবং ২৩ জন ভাইস চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। চেয়ারম্যানদের ৩২ জন পরিষদে এমপির কার্যালয়কে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতার শেষ হিসেবে দেখছেন। দুইজন কাজের সমন্বয়ের জন্য ইতিবাচক বলেছেন। বাকি দুইজন মত জানাননি। ভাইস চেয়ারম্যানদেরও অধিকাংশ পরিষদে এমপির কার্যালয় স্থাপনের বিরোধী। যারা বিএনপি বা জামায়াতের সমর্থিত উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন তারা এ সিদ্ধান্তকে বিপজ্জনক বলছেন।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতা এবং বানারীপাড়া উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মাওলাদ হোসেন সানা সমকালকে বলেন, এমপিরা যখন উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা; তাতেই যে কোনো প্রকল্পের সুপারিশ আনতে কিছু ‘ভাগ’ দিতে হতো। এখন পরিষদের এমপিদের দপ্তর থাকলে খবরদারি করার পূর্ণ ক্ষমতা পাবেন। চেয়ারম্যানদের স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্য বলে কিছুই থাকবে না।
বরিশাল সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা আজিজুল হক আক্কাস বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানরা আগেও স্বাধীন ছিলেন না। এমপিরা কখনোই উপেজেলা চেয়ারম্যানদের পাত্তা দেননি। এমপিদের অফিস থাকলে তো চেয়ারম্যানদের না থাকার মতো হয়ে যাবে।
ময়মনসিংহের ফুলপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বাশার বলেন, এমপিরা অফিস করলে পরিষদ খেলার মাঠ হয়ে যাবে। সংসদীয় এলাকায় অবশ্যই এমপিদের অফিস দরকার আছে। কিন্তু তা পরিষদের বাইরে হওয়া উচিত। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার সাবেক চেয়ারম্যান ডেভিড রানা চিসিম বলেন, উপজেলা পরিষদে এমপি বসলে, কর্তৃত্ব নিয়ে বাদানুবাদ তৈরি হবে। এতে প্রশাসনিক কাজের ব্যাঘাত ঘটবে।
গাজীপুর শ্রীপুর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ফরিদা জাহান স্বপ্না বলেন, চাঁদকে আকাশেই মানায়, মাটিতে নয়। এমপিদের সংসদেই মানায়, উপজেলা পরিষদে নয়। এতে করে গ্রুপিং বাড়বে, দ্বন্দ্ব বাড়বে। তবে বরগুনার আমতলী উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আরিফ মোল্লা বলেছেন, এমপিরা উপজেলা পরিষদে থাকলে জনগণের সেবা পেতে সহজ হবে।
স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি ছিল
বিএনপির ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতার অঙ্গীকার রয়েছে। স্থানীয় সরকারে এমপিদের খবরদারি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হয়েছে, ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকতর স্বাধীন, শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান করা হবে। এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে যেন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে।
এমপিদের অফিস বরাদ্দের মাধ্যমে বিএনপি নিজের ৩১ দফা এবং নির্বাচনী ইশতেহার থেকে সরে আসছে কিনা– জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম বলেন, প্রশ্নই ওঠে না। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ওপর এমপিদের কোনোরকম খবরদারি থাকবে না।
১৯৮৪ সালে সামরিক শাসনের সময় উপজেলা পরিষদ চালু হয়। পৌরসভায় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসন শুরু হয়। প্রথম উপজেলা নির্বাচন হয় ১৯৮৫ সালে। দ্বিতীয় উপজেলা নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালে। সেই সময় আইনে উপজেলা পরিষদকে স্থানীয় উন্নয়ন, প্রশাসন এবং জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ সরকারি কর্মচারীরা উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে জবাবদিহি করতেন।
১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে উপজেলা পরিষদ বাতিল করে। বিলুপ্ত সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান পনির উদ্দিন আহমদের রিট মামলায় আপিল বিভাগ রায় দেন, সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পরিষদ বহাল থাকবে।
আদালতের রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৯৮ সালে উপজেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করে। কিন্তু নির্বাচন দেয়নি। ২০০১ সালে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারও নির্বাচন দেয়নি। ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধবায়ক সরকার উপজেলা পরিষদ আইন শক্তিশালী করে। সেই সরকারের সময় ঘোষিত তপশিলে ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি উপজেলা নির্বাচন হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার মাত্র ১৬ দিনে মধ্যে এই নির্বাচন হয়।
সংসদ গঠনের পর আওয়ামী লীগ উপজেলা আইন পরিবর্তন করে। এমপিদের পরিষদের উপদেষ্টা পদে বসানো হয়। ইউএনওকে পরিষদের সাচিবিক কর্মকর্তা থেকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব দেয়। আইনের ২৫ ধারায় বিধান যুক্ত করা হয়, উপদেষ্টা হিসেবে এমপির পরামর্শ গ্রহণ করবে উপজেলা পরিষদ। সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এমপিকে জানাবে পরিষদ। সাবেক সব চেয়ারম্যান সমকালকে বলেছেন, এর মাধ্যমে তখন থেকেই উপজেলা পরিষদ এমপি এবং ইউএনওর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে গেছে। কার্যালয় থাকলে, এমপির অধীন হয়ে যাবে।
বিএনপি সরকার দলীয় নেতাদের সিটি করপোরেশন এবং জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দিলেও উপজেলা এবং পৌরসভায় সরকারি কর্মচারীরাই প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, এমপিরা উপজেলা এবং পৌরসভায় রাজনৈতিক প্রশাসক চান না। তাদের চাপেই সরকার এই দুটি স্তরে প্রশাসক দেয়নি। উপজেলা চেয়ারম্যান এবং পৌর মেয়রকে স্থানীয় রাজনীতিতে এমপির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হয়।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, এমপিদের কাজ আইন প্রণয়ন। তারা স্থানীয় সরকারের উপদেষ্টা হতে পারেন; কিন্তু শাসক নয়। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ স্থানীয় সরকারকে স্বাধীনতা দিয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়েছে। ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার কর আরোপ করতে পারে। এমপিরা নীতি নির্ধারক। যারা নীতি নির্ধারণ করবেন, তারাই যদি নীতি বাস্তবায়নের কাজে জড়িয়ে পড়েন, তা স্বার্থের সংঘাত, যা থেকে দুর্নীতি সৃষ্টি হয়। তাই সংবিধানের চেতনা মেনে, এমপিদের স্থানীয় সরকার থেকে দূরে রাখতে হবে। তা না হলে যতটুকু স্থানীয় সরকার রয়েছে, তাও আর থাকবে না। তখন জনগণকে স্থানীয় সেবা কে দেবে?
- বিষয় :
- উপজেলা পরিষদ আইন
- সংসদ সদস্য