ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিকল্পনা

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যসেবায় বড় পরিকল্পনা
×

 মেসবাহুল হক

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৯:০৪ | আপডেট: ১০ জুন ২০২৬ | ০৯:২৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বড় পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার আওতায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে। এর অংশ হিসেবে আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নথি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন সংস্থার বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় মিলিয়ে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৩০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির দশমিক ৫৭ শতাংশ।

ওষুধ, অবকাঠামো ও জরুরি সেবায় বড় বরাদ্দ
অর্থ বিভাগের বাজেট নথি অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণে বিভিন্ন কর্মসূচির জন্য পৃথক বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক কার্যক্রমে সাত হাজার ৮৫৪ কোটি টাকা রাখা হচ্ছে। বর্তমানে একই ধরনের কর্মসূচি চালু থাকলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধ না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষজ্ঞদের মতে, জবাবদিহি ও নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে বরাদ্দ বৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নে পাঁচ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ের ৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। তবে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট আছে। 
এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসাসেবা ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস শক্তিশালীকরণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে এ প্রকল্পের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। খুলনা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, নরসিংদী ও নোয়াখালী– এই পাঁচ জেলায় ২৫ লাখ ই-হেলথ কার্ড বিতরণের পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৬২ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানো এবং স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের অন্যতম বড় উদ্যোগ হতে যাচ্ছে ‘ই-হেলথ কার্ড’ বলে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় জানান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, এটি কোনো নগদ সহায়তার কার্ড নয়। বরং এর মাধ্যমে নাগরিকদের চিকিৎসাসেবা ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হবে এবং হয়রানিমুক্ত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হবে। জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে এটি চালু হলে চিকিৎসা খাতে অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে। 

এ ছাড়া হাসপাতাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষার জন্য আট কোটি টাকা এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন নিশ্চিত করতে পানির ৩০ হাজার উৎস ও ২৫ হাজার স্যানিটারি টয়লেট নির্মাণ কর্মসূচির জন্য তিন হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নীতির আওতায় সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য এডিপিতে বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে ২৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।

বরাদ্দ বাড়লেও ব্যয় সক্ষমতা দুর্বল
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা, যা মোট এডিপির ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ। তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির পেছনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের ব্যয় সক্ষমতা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে তারা মোট বরাদ্দের এক-দশমাংশেরও কম অর্থাৎ প্রায় ৯৩৩ কোটি টাকা ব্যয় করতে পেরেছে। প্রতিবছরই উন্নয়ন বরাদ্দের বড় একটি অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন সমকালকে বলেন, প্রতিবছরই মূল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও পরে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে আনা হয়। তাঁর মতে, সমস্যার মূল কারণ বরাদ্দের পরিমাণ নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতার ঘাটতি। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের ক্রয় ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবলকে দায়িত্ব দেওয়া হলে এ সমস্যা অনেকাংশে কমে আসত। কিন্তু বাস্তবে অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও দেওয়া হয় না। পরে বরাদ্দ ব্যবহৃত হচ্ছে না—এই যুক্তিতে অর্থ কমিয়ে দেওয়া হয়। 

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজর
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের ওপর সার্বক্ষণিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাঁর নির্দেশনায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে, যার দায়িত্ব হবে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
তবে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার। তিনি বলেন, গতানুগতিক আমলাতান্ত্রিক গতিতে চললে সরকারের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। 

সীমিত বরাদ্দ, তবু ফেরত যায় অর্থ
সভায় প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জানান, দেশের মোট বাজেটের মাত্র ৭ শতাংশের মতো স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সীমিত বরাদ্দেরও ২০ থেকে ২৫ শতাংশ অর্থ প্রতিবছর অব্যয়িত থেকে সরকারি কোষাগারে ফেরত যায়। তাঁর মতে, হাসপাতালগুলোতে ফার্নিচার, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও জনবলের ঘাটতি থাকার পরও বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয় করতে না পারা প্রশাসনিক অদক্ষতা ও সুশাসনের ঘাটতির প্রতিফলন।

১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী ও জাতীয় কল সেন্টার
স্বাস্থ্যসেবাকে বিশ্বমানে উন্নীত করতে আগামী তিন বছরে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। তারা ক্যান্সার সচেতনতা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করবেন। এ ছাড়া জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতে চালু করা হবে একটি জাতীয় কল সেন্টার। 
সভায় উল্লেখ করা হয়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ক্ষেত্রে সময়মতো প্রাথমিক চিকিৎসা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার অভাব দায়ী। নতুন কল সেন্টার ও প্রি-হাসপাতাল মেডিকেল সার্ভিস এই মৃত্যুহার কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বেসরকারি হাসপাতালের শয্যা ব্যবহার
ঢাকা মহানগরে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেল চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলোতে প্রায় এক লাখ শয্যা রয়েছে, যার প্রায় ৩০ শতাংশ সব সময় খালি থাকে। এই শয্যাগুলোকে জনসেবায় কাজে লাগাতে ঢাকার চারটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাহাবুদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। 

আরও পড়ুন

×