ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সিপিডির গবেষণা

সরবরাহে ঘাটতি ও সিন্ডিকেটে বেসামাল খাদ্যপণ্যের দাম

উৎপাদক থেকে খুচরা বাজারে পণ্যভেদে দামের ফারাক ১১৬ শতাংশ

সরবরাহে ঘাটতি ও সিন্ডিকেটে  বেসামাল খাদ্যপণ্যের দাম
×

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৪৫ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ১৩:১২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সরবরাহের কৃত্রিম ঘাটতি, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুত এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে অতিরিক্ত হাতবদলের কারণে দেশে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। উৎপাদক বা কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে এসে পণ্যভেদে দামের ফারাক হচ্ছে ১১৬ শতাংশ পর্যন্ত। চাল, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচের মতো নিত্যপণ্যে মধ্যস্বত্বভোগী ও কমিশন এজেন্টরা চড়া মুনাফা করলেও উচ্চ পশুখাদ্য ও উৎপাদন খরচের চাপে লোকসান গুনছেন প্রান্তিক খামারিরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যশৃঙ্খল: বাজারব্যবস্থা, মুনাফার মার্জিন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা’ শীর্ষক এক গবেষণায় এই তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ আয়োজিত এক সংলাপে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরেন সিপিডির জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফকরুদ্দিন আল কবির।

দেশে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক চড়া ও অস্থির থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের খুচরা বাজার থেকে উৎপাদক পর্যায় পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসন্ধান করার জন্য এই গবেষণা চালানো হয়। মাঝারি মানের চাল, মসুর ডাল, দেশি পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, মুরগির ডিম, গরুর মাংস, রুই মাছ এবং মুরগির মাংস– এই ১০টি নিত্যপণ্যের ওপর গবেষণা করা হয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য দৈবচয়ন পদ্ধতিতে ঢাকা বিভাগের ১০টি খুচরা বাজার নির্বাচন করা হয়। প্রতিটি বাজারে ১০টি নির্দিষ্ট পণ্যের প্রতিটির জন্য ৫ জন; মোট ৫০০ জন খুচরা বিক্রেতার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ পণ্যের ক্ষেত্রে বেশি মুনাফা করছেন কৃষক, মিল মালিক, শহরাঞ্চলের পাইকারি কমিশন এজেন্ট এবং খুচরা বিক্রেতারা। তবে সংলাপে অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদ ও কৃষিবিদরা এ বিষয়ে আপত্তি জানান। তাদের মতে, ডাল, পেঁয়াজের মতো কৃষিপণ্যে কৃষক বেশি মুনাফা করতে পারেন না। মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা পর্যায়ে বেশি মুনাফা হচ্ছে। 
কৃষক থেকে খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের কাছে আসতে কাঁচামরিচে ১১৬ শতাংশ, পায়জাম চালে ১০০, পেঁয়াজে ৮৭, মসুর ডালে ৭৮, বেগুনে ৭২, আলুতে ৫০, ডিমে ২৫, ব্রয়লার মুরগিতে ২২, গরুর মাংসে ১৩, মাছে ১০ শতাংশ দাম বাড়ছে। 

গবেষণায় আরও দেখা যায়, পশুখাদ্যের অতিরিক্ত দামের কারণে পোলট্রি ও গবাদি পশু খামারিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। পেঁয়াজ, বেগুন, কাঁচামরিচ, মাছ ও গরুর মাংসের বিক্রিতে কমিশন প্রথার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। পাশাপাশি আড়তদারদের ওপর খুচরা বিক্রেতাদের নির্ভরতা ও বাজারে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ পণ্যের দাম বাড়াচ্ছে।
পরিস্থিতি নিরসনে সরবরাহ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় হাতবদল কমানো এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিযোগিতা কমিশনের কঠোর তদারকির মাধ্যমে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সিপিডি। একই সঙ্গে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতাদের জন্য বিকল্প বাজারের সুযোগ তৈরি এবং মূল্য ও বাজার তথ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বে গড়ে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিকস ব্যয় হলেও বাংলাদেশে তা ১৬ শতাংশ। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চ উৎপাদনশীলতায় বিনিয়োগের সক্ষমতা কম। এজন্য কৃষিকে আরও বেশি সহায়তা, গবেষণা এবং প্রযুক্তির আওতায় আনতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, বাজারে তথ্যের অসমতা কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যেমন, টানা দুই বছর ধরে এক কোটি টনের বেশি আলু উৎপাদন হচ্ছে। কৃষক আলুর ন্যায্যমূল্য না পেলেও উৎপাদন অব্যাহত রেখেছেন। কৃষক বাজারসংক্রান্ত সঠিক তথ্য ও বিকল্প উৎপাদন পরিকল্পনা পাচ্ছেন না। সেজন্য উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে ট্রেসেবিলিটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোন পর্যায়ে দাম বেশি বাড়ছে তা সহজে বোঝা যাবে। 

বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে লজিস্টিকস ব্যয় হ্রাস, উৎপাদন উপকরণের খরচ নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে। এতে কৃষকের আয় বাড়বে, ভোক্তার ব্যয় কমবে। 
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ বলেন, এবারের বাজেটে কয়েকটি নিত্যপণ্যে করছাড় দেওয়া হয়েছে। ভোক্তা সেই সুফল পাচ্ছে না। এর সুবিধা কোথায় কীভাবে কারা পাচ্ছে তা দেখা দরকার। 
পণ্যের উৎপাদন খরচ ও কৃষক বেশি মুনাফা করার যে চিত্র তুলে ধরেছে সিপিডি, তাতে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এএইচএম শফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, বাস্তবতা হচ্ছে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা। কারণ স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ঋণ, সার ও বীজে সরকারের দেওয়া সুবিধা যথাযথভাবে পাচ্ছেন না কৃষক। 
শফিকুজ্জামান আরও বলেন, চাঁদাবাজির কারণে পণ্যের দাম ৩০ শতাংশ বাড়ে। সবজি শুধু কারওয়ান বাজারেই কয়েকটি হাতবদল হয়। তাঁর দাবি, দেশে ২০ লাখ টনের মতো সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। রপ্তানি হয় মাত্র ১ শতাংশ। অথচ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে সুগন্ধি চালের কেজি ১৭০ টাকা থেকে বেড়ে ২৩০ টাকা হয়ে গেছে। 

সাগরে তেল-চিনির জাহাজ ভাসিয়ে রেখে দাম বাড়ানো হয় এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দাম বাড়াতে বাধ্য করে।
কৃষিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতির মূল সমস্যা হচ্ছে স্থিতিশীল উৎপাদন। উৎপাদন না বাড়লে সরবরাহে ঘাটতি থেকে যাবে। এ জন্য তিনি কৃষককে সার্বিক সহায়তা ও জমির সঠিক ব্যবহার করার তাগিদ দেন।

খরচ কমানোর জন্য ট্রেনে পণ্য পরিবহন চালু করার পরামর্শ দেন ঢাকা চেম্বারের সাবেক সহসভাপতি শোয়েব চৌধুরী। এছাড়া বাকৃবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মণ্ডল, সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান প্রমুখ বক্তব্য দেন। 
গবেষণার অস্পষ্টতা প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এটি প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ। সামনে আরও গভীরে বিশ্লেষণ
করা হবে।

আরও পড়ুন

×