অভিমত
স্থানীয় নির্বাচন হওয়া দরকার
বদিউল আলম মজুমদার
বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫২ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্টভাবে চারটি দায়িত্ব দিয়েছে সংবিধান। ১১৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, সীমানা পুনর্বিন্যাস ও ভোটার তালিকা প্রণয়ন তাদের কাজ। এর বাইরে অন্যান্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে সংবিধানে বলা আছে, যেরূপভাবে আইন দ্বারা নির্ধারণ করবে, সেইভাবে নির্বাচন হবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যাপারে সরকার নির্বাচন কমিশনকে সুস্পষ্টভাবে অনুরোধ করে, তারপর কমিশন ব্যবস্থা নেয়। এটাই হলো প্রচলিত পদ্ধতি। এখন সরকার হয়তো তাদের সঙ্গে তথ্য শেয়ার করেছে, কিন্তু সুস্পষ্টভাবে নির্বাচনের জন্য কমিশনকে অনুরোধ করেনি। এটা বর্তমানে সরকারের অবস্থান। তবে নির্বাচন করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনেরই ক্ষমতা নিরঙ্কুশ এবং সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা তাদের দায়িত্ব।
জুলাই সনদে স্থানীয় সরকার নিয়ে প্রস্তাব রয়েছে। এর আগে স্থানীয় সরকার কমিশনের ধারণা নিয়েও আলাপ হয়েছে। ওই ধারণা এসেছিল ২০০৭ সালে, ‘সুজন’-এর উদ্যোগে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে তখন অনুরোধ করা হয়েছিল, স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী ও কার্যকর করার জন্য তারা যেন কিছু উদ্যোগ নেয়। কারণ অতীতে সব রাজনৈতিক সরকারই স্থানীয় সরকারকে দুর্বল করেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার আধুনিক, সমন্বিত আইনি কাঠামোর প্রস্তাব করে ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও গতিশীলকরণ কমিটি’ গঠন করে। ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে ওই কমিটিতে সদস্য ছিলাম। আমরা সব নির্বাচনী আইন পুনর্লিখন করেছি। একটা সমন্বিত আইনের প্রস্তাব করেছি। সেখানেই আমরা একটা প্রস্তাব করেছি স্থানীয় সরকার কমিশন। শুধু প্রস্তাব নয়; আমরা স্থানীয় সরকার কমিশন আইনের খসড়াও তৈরি করে দিয়েছি সরকারকে।
ওই কমিশনের মোটা দাগে দুইটা দায়িত্ব ছিল। প্রথমত রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্যায়ভাবে যে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের বিভিন্নভাবে বরখাস্ত করে; নানা প্রকারে নিপীড়ন করে, এগুলোর জন্য। আদালতে যাওয়া ছাড়া তাদের কোনো প্রতিকার থাকে না। স্থানীয় সরকার কমিশনের মাধ্যমে তাদের একটা প্রতিকারের ব্যবস্থা করা, আপিল কর্তৃপক্ষ স্থানীয় সরকার কমিশন পালন করবে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়া দরকার। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগ করছে। এটা তাদের ৩১ দফার লঙ্ঘন; দ্বিতীয়ত সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। কারণ ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এই স্থানীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবেন। তাই নির্বাচনটা হওয়া দরকার। আইনগুলোকে পরিশীলিত ও যুগোপযোগী করা দরকার।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ছিলেন; তাঁকে বলেছিলাম, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে আইনগুলোর খসড়া প্রস্তুত করে দেব। তিনি বলেছিলেন, এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলতে হবে।
বর্তমান স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ড. আব্দুল মঈন খানকে একই বার্তা দিয়ে বলেছি, আইনগুলোকে পরিশীলিত ও যুগোপযোগী করা এবং মান্ধাতার আমলের আইনগুলো পরিবর্তন করা দরকার। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।
নির্বাচন কমিশন যতই বলুক নির্বাচন করবে; সরকারের সেভাবে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। কারণ তাদের প্রশাসকরা এসব চালাচ্ছেন। তারা পরোক্ষভাবে বিরোধিতা করবেন এবং এমপিরাও বিরোধিতা করবেন। কারণ এমপিদের ওখানে অফিস দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। তারা ছড়ি ঘুরাবেন। তাই ধারণা করা যায়, খুব দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে না।
সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের স্থানীয় সরকারের আইনগুলো পশ্চাৎমুখী। এগুলো সাংঘর্ষিকও। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের বিধান থাকলেও জেলা পরিষদের নির্বাচন স্বল্প নির্বাচকমণ্ডলী নিয়ে ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’র আদলে পরোক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সরকার আইনের এসব দুর্বলতা দূর করে ২০০৭ সালে গঠিত স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও গতিশীলকরণ কমিটির সুপারিশ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকার প্রায় পুরোটাই উপেক্ষা করে। গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ড. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করা হয়, যা আমাদের আগের সুপারিশকৃত আইনি কাঠামোকে আরও পরিশীলিত করে।
উপর্যুক্ত দুটি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আমাদের স্থানীয় সরকারের আইনি কাঠামোকে যুগোপযোগী করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার মাধ্যমে একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির পথ সুগম হবে। আশা করি, আমাদের নতুন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নির্বাচনের আগে এ সুযোগ কাজে লাগাবেন।
লেখক: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)