ইসির এখতিয়ার ‘বন্দি’ স্পিকারের দপ্তরে
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নৈতিক স্খলনের দায়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কৃত সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের পদ বাতিলের চিঠি এখন স্পিকারের দপ্তরে ‘বন্দি’। বহিষ্কারের পর প্রায় দুই মাস পার হলেও স্পিকারের কার্যালয় থেকে এখনও নির্বাচন কমিশনে (ইসি) কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা ‘রেফারেন্স’ পাঠানো হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘সংসদ সদস্য পদ (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন, ১৯৮০’-এর ৩ ধারা অনুযায়ী কোনো বিরোধ তৈরি হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা ইসিতে পাঠানোর যে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, স্পিকারের দপ্তর তা স্পষ্ট লঙ্ঘন করছে।
এ ব্যাপারে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের বক্তব্য জানতে পারেনি সমকাল। স্পিকারের দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বিষয়ে বক্তব্য না দেওয়ার সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে জাতীয় সংসদের সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া দুই ধরনের মত দিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় সমকালের সঙ্গে আলাপকালে প্রথমে তিনি বলেন, সংসদের বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এ-সংক্রান্ত নির্দেশনা মেনে তারা ইসির কাছে চিঠি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পরে আইনে ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনে পাঠানোর নির্দেশনার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সংসদ সচিব বলেন, বিরোধ তৈরি হলে ইসির কাছে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে আইনে। কিন্তু এখানে আসলেই কি কোনো বিরোধ তৈরি হয়েছে– পাল্টা প্রশ্ন রাখেন তিনি।
দল থেকে বহিষ্কারের পর জামায়াতের তরফে গত ২৩ জুলাই প্রথমে স্পিকারের দপ্তরে এবং একই দিন বিকেলে সিইসির দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়। চিঠিতে জামায়াত বলেছে, সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চিঠিতে গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তবে সংসদীয় কমিটিতে রাখা নিয়ে সংসদের বৈঠকে গত ৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এক বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, দল থেকে বহিষ্কার করা হলে সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয় না। নিজ থেকে পদত্যাগ না করলে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ আসে না।
গতকাল রাতে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও বিরোধীদলীয় হুইপ রফিকুল ইসলাম খান জানান, তাদের দলের অবস্থান চিঠি দিয়ে স্পিকার ও সিইসিকে জানানো হয়েছে। গাজী নজরুলের আসন শূন্য হওয়ার জন্য আইনি সব পদক্ষেপ তারা দলীয়ভাবে নিয়েছেন। আইনে সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরও বিষয়টি স্পিকারের দপ্তর থেকে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। সংসদ সচিবের মন্তব্য সম্পর্কে তিনি বলেন, সরকারের ইঙ্গিতে স্পিকারের দপ্তর চলছে।
ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর আগে দল থেকে বহিষ্কার হওয়া একাধিক সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়া নিয়ে আইনি বিতর্কের নজির থাকলেও ইসির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃষ্টান্ত নেই। দশম সংসদে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন টাঙ্গাইল থেকে নির্বাচিত এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তখন স্পিকারের দপ্তর থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য তৎকালীন সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। কমিশন এ বিষয়ে শুনানি করে, তবে রায় ঘোষণার আগেই সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন লতিফ সিদ্দিকী।
গতকাল আগারগাঁওয়ে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, জামায়াত বেশ কিছুদিন আগে তাদের দলীয় প্যাডে ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল গাজী নজরুলকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ইসির এ মুহূর্তে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, বিষয়টি সংসদ সচিবালয় থেকে ইসিকে জানানোর বিধান আছে। স্পিকারের কাছ থেকে চিঠি পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে কিংবা দল থেকে পদত্যাগ করলে তাঁর আসন শূন্য হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যদি দল তাঁকে বহিষ্কার করে, সে ক্ষেত্রে কী হবে– তা সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ নেই। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া এবং এই পদে থাকার বেশ কিছু যোগ্যতার কথা বলা আছে। একই সঙ্গে এই অনুচ্ছেদে বলা আছে, নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো সংসদ সদস্য ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অযোগ্য হয়েছেন কিনা বা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো সংসদ সদস্যের আসন শূন্য হবে কিনা, সে বিষয়ে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।
ইসি ও সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০০৮ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের পর থেকে এমপি প্রার্থী হতে বা এমপি পদে থাকতে হলে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন বাধ্যতামূলক। স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে তাঁকে ১ শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক সই নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে। দল থেকে বহিষ্কারের পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। দল থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল নিজেও দাবি করেছিলেন, দল বহিষ্কার করলেও এমপি হিসেবে তিনি বহাল আছেন।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আওতায় জামায়াতের বহিষ্কৃত এমপি গাজী নজরুলের বিষয়টি আসবে কিনা, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার ইসির। স্পিকারের দপ্তর নীরব থাকার অর্থ তারা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চলছেন।
- বিষয় :
- গাজী নজরুল ইসলাম