কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে পরীক্ষিত বীজ ব্যবহারের তাগিদ
বিএআরসি ক্যাম্পাসের সার্ক কৃষি কেন্দ্রে কর্মশালা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:০০
বাংলাদেশে কৃষি খাতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ মেট্রিক টন বীজের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ বীজ ফরমাল বা পরীক্ষিত ও মান নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছায়। বাকি ৪০ শতাংশ সেমি-ফরমাল এবং ৩০ শতাংশ কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজ। কৃষির উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াতে পরীক্ষিত ও মানসম্মত বীজের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক খোরশেদ আলম।
আজ মঙ্গলবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ক্যাম্পাসের সার্ক কৃষি কেন্দ্রে আয়োজিত এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ এগ্রিকালচার রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএআরএফ) সদস্যদের নিয়ে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
খোরশেদ আলম বলেন, কৃষিতে উৎপাদন বাড়াতে হলে বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে ফরমাল সিড ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে। যেসব বীজ পরীক্ষিত ও মান নিয়ন্ত্রিত, সেগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে। মানসম্মত বীজ নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের উৎপাদন ও ফলন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিতে ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হবে।
বীজ খাতে বর্তমানে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে বীজ উইংয়ের মহাপরিচালক বলেন, বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা, বিশুদ্ধতা, স্বাস্থ্য, লেবেলিং ও সংরক্ষণ—এসব বিষয়ে ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে সঠিক মানের বীজ সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়াও বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, কোনো জাতের বীজ দীর্ঘদিন ব্যবহার করার পর নতুন ও উন্নত বীজ দিয়ে প্রতিস্থাপন না করলে জাতের অবক্ষয় হতে পারে। এতে রোগবালাইয়ের বিস্তারও বাড়তে পারে। তাই বীজ প্রতিস্থাপনের হার বাড়ানো প্রয়োজন।
বীজ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং পর্যাপ্তভাবে শুকানো না হলে বীজের গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। তাই উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও কৃষকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
মৌসুম শুরুর আগেই কৃষকের কাছে প্রয়োজনীয় বীজ পৌঁছানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, মানসম্মত বীজ থাকলেও তা যদি সঠিক সময়ে কৃষকের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে কৃষি উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
দেশে কিছু বীজের চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। তবে আমদানিনির্ভর বীজ ব্যবস্থায়ও নানা ধরনের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানান খোরশেদ আলম।
তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জাহাজীকরণ, ফাইটোস্যানিটারি বা উদ্ভিদ স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতার কারণে বীজ আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে প্রয়োজনীয় সময়ে কৃষকের কাছে বীজ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে দেশে বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানসম্মত দেশীয় বীজের সরবরাহ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বীজ উৎপাদন ও কৃষির ওপর নতুন নতুন ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলেও কর্মশালায় উল্লেখ করা হয়। খোরশেদ আলম বলেন, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, জলমগ্নতা ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যা কৃষি উৎপাদনকে প্রভাবিত করছে। একই সঙ্গে নতুন ও বর্ধিত পোকামাকড়ের আক্রমণও বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে ঝুঁকি তৈরি করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনশীল জাতের বীজের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর মতে, লবণাক্ততা, খরা, বন্যা, জলমগ্নতা ও তীব্র তাপমাত্রা সহনশীল জাতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কৃষকের চাহিদা ও স্থানীয় পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে জলবায়ু-বান্ধব বীজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বীজের মান নিশ্চিত করার সঙ্গে কৃষকের উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানসম্মত বীজের ব্যবহার বাড়াতে পারলে একই জমিতে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ ও ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি দেশের কৃষির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও বাড়বে।
খোরশেদ আলম বলেন, গত বছর পেঁয়াজের বীজ নিয়ে কৃষকের মাঠে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে বিদেশ থেকে বীজ আমদানি করে কৃষকের কাছে সরবরাহ করেছিল। এর ফলে ওই বছর পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়। এরপর সরকার পেঁয়াজের বীজের বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে এবং কৃষকের হাতে উন্নত ও মানসম্মত বীজ তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এর সুফল হিসেবে চলতি বছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বেড়েছে। ফলে পেঁয়াজের দামও কম রয়েছে এবং এখন পর্যন্ত দেশে কোনো পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়নি। তবে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষক যাতে তাঁদের উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্য দাম পান, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।