পরিবার পরিকল্পনায় ৭১% প্রকিউরমেন্ট শেষের পথে, নভেম্বরে মিলবে পূর্ণ সরবরাহ
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৩৭ | আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:৫২
নতুন প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থায়ন প্রস্তুতিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে দেশে গর্ভনিরোধ সামগ্রীর সরবরাহে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত নিরসনের পাশাপাশি জন্মহার নিয়ন্ত্রণে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম পুনর্জাগরণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সরবরাহ সংকটে মাঠকর্মীদের মধ্যেও হতাশা ও অনীহা তৈরি হয়েছে। তাই সামগ্রী সরবরাহের পাশাপাশি মাঠকর্মীদের সক্রিয় করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর জানিয়েছে, গর্ভনিরোধ সামগ্রীর প্রায় ৭১ শতাংশ প্রকিউরমেন্ট শেষের পথে। এরই মধ্যে কয়েক ধরনের সামগ্রী ওয়্যারহাউসে পৌঁছেছে এবং সেগুলো মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। নভেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ পাওয়ার কথা থাকলেও জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় ধাপে ধাপে সামগ্রী সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব গর্ভনিরোধ দিবস উপলক্ষে শনিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। ‘আধুনিক গর্ভনিরোধ পদ্ধতিতে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সাম্প্রতিক চ্যালেঞ্জ এবং তা উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সভায় সরকারি কর্মকর্তা, পরিবার পরিকল্পনা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভায় পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, গর্ভনিরোধ সামগ্রীর সংকটের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। তাদের আগে পুনরায় সক্রিয় ও উৎসাহিত করতে হবে। তিনি বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরা শুধু গর্ভনিরোধ সামগ্রী সরবরাহ করেন না। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের উদ্বুদ্ধ করা, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া, স্বাভাবিক প্রসব বিষয়ে কাজ করা, স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম এবং উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ড. জিন্নাত রেহানা বলেন, ‘হাত গুটিয়ে ফেলা’ বা কর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া হতাশার জায়গাটি আগে মোকাবিলা করতে হবে। মাঠপর্যায়ের প্রায় ৪০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পুনরায় সক্রিয় করতে পারলে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
ব্যবহার ৭২ শতাংশ, কার্যকর ব্যবহার ৬২ শতাংশ
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, সন্তান ধারণক্ষম ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে মাঠকর্মীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্টরা সক্ষম দম্পতি ও নবদম্পতিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে গর্ভনিরোধ পদ্ধতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেন। বর্তমানে দেশে গড়ে প্রায় ৭২ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তবে তাদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ পদ্ধতি গ্রহণ করলেও বাস্তবে তা নিয়মিত ব্যবহার করেন না। ফলে কার্যকর বা দৃশ্যমান ব্যবহার প্রায় ৬২ শতাংশে নেমে আসে।
এই কার্যকর ব্যবহার ৮০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ জন্য শুধু সামগ্রী সরবরাহ করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ের জনবল ও কার্যক্রমও সক্রিয় করতে হবে।
৭১ শতাংশ প্রকিউরমেন্ট শেষের পথে
গর্ভনিরোধ সামগ্রীর প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মোট প্রকিউরমেন্টের প্রায় ৭১ শতাংশ শেষ হওয়ার পথে। কয়েক ধরনের সামগ্রী ইতোমধ্যে সরবরাহ পর্যায়ে রয়েছে। প্রায় ১৬টি সামগ্রী কমপ্লিট পর্যায়ে আছে এবং আরও কয়েকটি সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোতে (সিএমএসডি) যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, তিনটি ওয়্যারহাউসে সামগ্রী ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে। সেগুলো মাঠপর্যায়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে এবং সরবরাহ কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রকিউরমেন্টের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় কাজ করছেন। অনেক ক্ষেত্রে রাত পর্যন্ত অফিস করতে হচ্ছে। প্রতিটি প্রকিউরমেন্টের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক নথি ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে হয়।
এক জেলায় সংকট, অন্য জেলায় অতিরিক্ত মজুত
আলোচনায় আইপাস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ডা. সাইদ রুবায়েত বলেন, দেশের এক জেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট থাকলেও অন্য জেলায় একই সামগ্রীর অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। এ অবস্থায় সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এক জায়গার অতিরিক্ত সামগ্রী অন্য জায়গায় সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তিনি সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি গর্ভনিরোধ পদ্ধতি ব্যবহারে সচেতনতা তৈরিতে সমন্বিত প্রচারণার ওপর গুরুত্ব দেন।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, সামগ্রী না থাকায় কিছু এলাকায় পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরা স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষম পরিবারগুলোকে বাজার থেকে গর্ভনিরোধ সামগ্রী কিনে ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছেন। কিছু এলাকায় জেলা প্রশাসন ও এনজিওগুলোর সহায়তায় স্থানীয়ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে জরুরি কার্যক্রম চালানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বাধাগ্রস্ত বাড়ি বাড়ি কার্যক্রম
বক্তারা বলেন, গর্ভনিরোধ সামগ্রীর সরবরাহ বন্ধ বা কমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কারণ, অনেক পরিবার মাঠকর্মীদের কাছ থেকেই সামগ্রী পাওয়ার প্রত্যাশা করে। সামগ্রী দিতে না পারলে তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
সংকটের সময়ে কিছু পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা স্থানীয়ভাবে সক্ষম ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল পরিবারগুলোকে বাজার থেকে গর্ভনিরোধ সামগ্রী কিনে ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করেছেন। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কার্যক্রম চালু রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নভেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ
গর্ভনিরোধ সামগ্রী সরবরাহে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা সচিব এ কে এম বেনজামিন রিয়াজী বলেন, নতুন প্রকল্প অনুমোদন এবং অর্থায়ন প্রস্তুতিতে সময় লেগেছে। ডিপিপি অনুমোদনের পর সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী দরপত্রসহ ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হয়।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রয় প্রক্রিয়ায় তার অংশের কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর কার্যাদেশ পেলেই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন শুরু করতে পারে। ফলে কার্যাদেশ ও উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরবরাহের সময়সূচি সম্পর্কিত।
সচিব বলেন, নভেম্বরের মধ্যে পুরো সরবরাহ পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় পুরো সামগ্রী একসঙ্গে না নিয়ে প্রথম লট বা ধাপে ধাপে দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে।
৫০০ কোটি টাকা ফেরত
সভায় জানানো হয়, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সেবা কর্মসূচি সাতটি অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে পরিচালিত হতো। এসব অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ফেরত গেছে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়। এতে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়েছে বলে মত দেন অংশীজনেরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম সভায় ‘আধুনিক গর্ভনিরোধ পদ্ধতিতে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। প্রবন্ধে আধুনিক গর্ভনিরোধ পদ্ধতির প্রাপ্যতা ও জনগণের কাছে এর প্রবেশাধিকার বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি এবং বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়।
সভায় অংশীজনেরা বলেন, গর্ভনিরোধ সামগ্রীর সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের জনবল সংকট দূর করা, কর্মীদের পুনরায় সক্রিয় করা, জনগণের কাছে তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া এবং জেলা পর্যায়ে সামগ্রীর মজুত ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন। সামগ্রী ও জনবল-দুই দিকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সেবা আরও গতিশীল করা সম্ভব হবে।