ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪

দণ্ডিত চালক জামির 'নির্দোষ'

দণ্ডিত চালক জামির 'নির্দোষ'

বাসচালক জামির হোসেন - সংগৃহীত

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২২ | ০২:১৯

সড়ক দুর্ঘটনায় চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদ ও এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর নিহতের মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া বাসচালক জামির হোসেন ছিলেন 'নির্দোষ'। বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হকের অনুসন্ধানে নির্মিত তথ্যচিত্র 'সোশ্যাল ক্রসফায়ার'-এ তা তুলে ধরা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় জাদুঘরে তথ্যচিত্রটির প্রদর্শনী হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, অধ্যাপক সামছুল হকের অনুসন্ধানে পরিস্কার হয়েছে, চালক জামির নির্দোষ ছিলেন।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসের চাপায় নিহত হন মাইক্রোবাসে থাকা তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে মানিকগঞ্জের আদালত বাসচালক জামিরকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০২০ সালের ১ আগস্ট ঈদের দিন কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথেরিন মাসুদের আরেক মামলায় ৪ কোটি ৬১ লাখ ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাসমালিক ও চালককে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

তবে সামছুল হকের অনুসন্ধান বলছে, দুর্ঘটনায় বাসচালকের দোষ ছিল না। তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় হার্ড ব্রেক কষার কারণে সড়কের পিচ ও পাথর কুচি উঠে যাওয়ার দাগ থাকবে। হঠাৎ সংঘর্ষের কারণে তারেক মাসুদের বহনকারী মাইক্রোবাস হার্ড ব্রেক করতে পারেনি, তাই দাগ ছিল না। অর্থাৎ মাইক্রোবাসটি ব্রেক করার সময়ই পাননি।

দুর্ঘটনার সময় বৃষ্টি হচ্ছিল। দুর্ঘটনার ঠিক আগে ঢাকামুখী একটি বাস ডান পাশ দিয়ে ইজিবাইককে অতিক্রম করে ডান দিকের লেনে চলে যায়। বাসের পিছুপিছু তারেক মাসুদদের মাইক্রোবাসটিও ইজিবাইকে অতিক্রম করে। এতে মাইক্রোবাসটি ডান দিকের লেনে চলে যায়। দুই লেনের মহাসড়কের মাঝে বিভাজক ছিল না। দুর্ঘটনাস্থলে সড়কে বাঁকও ছিল। বাঁকের আড়ালে ছিল জামিরের চালানো চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাস।

অটোরিকশাকে প্রথমে অতিক্রম করা বাসের চালক বিপরীত দিক থেকে আসা আরিচামুখী জামিরের বাসটিকে দেখতে পেয়ে ওভারটেকের পর বাম লেনে অর্থাৎ সঠিক লেনে ফিরে যায়। তবে মাইক্রোবাসের সামনে বাস থাকায় বিপরীত দিক থেকে আসা বাসটি দেখতে পাননি। সামনের বাসটি বাম লেনে ফিরে গেলে, মাইক্রোবাসটি চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স বাসের সামনে পড়ে। মাইক্রোবাসের চালক বাম লেনে ফেরার চেষ্টা করেও পারেননি। ফলে মাইক্রোবাস ও বাসের মারাত্মক সংঘর্ষ হয়। বাসের গতি ও ভরের কারণে ধাক্কা খেয়ে বিধ্বস্ত মাইক্রোবাসটি বাম লেনে গিয়ে পড়ে। সে কারণেই আদালতের মনে হয়েছিল মাইক্রোবাস সঠিক ছিল। সাজা পেতে হয় বাসচালক জামিরকে।

সামছুল হকের অনুসন্ধান অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সূত্রপাত ইজিবাইকে। সড়কটি প্রশস্ত ছিল না এবং মাইক্রোবাস চালকের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স পরিবহনের বাসটি সঠিক লেনেই ছিল।

পুরো দুর্ঘটনার পুনর্নির্মাণ করে তথ্যচিত্রে তুলে ধরা হয়েছে। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে সারাদেশে প্রতিবাদ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঝড় ওঠে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান বলেন, 'ড. সামছুল হকের তথ্যচিত্র বিচারকদের কাছেও পাঠানো হবে। তাঁদের দেখতে হবে, কী অন্যায় তাঁরা করেছেন।'

অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, দুর্ঘটনার বহুমাত্রিক কারণ থাকে। দুর্ঘটনা তদন্তের কমিটিতে বিজ্ঞানভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। জামিরের বাস সঠিক লেনে ছিল।

প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী, সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার, এআরআইর সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ, তথ্যচিত্রের প্রযোজক সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী।

আরও পড়ুন

×