গৃহকর্মী এখনও পলাতক, সন্দেহে দেহরক্ষীও

 ধানমন্ডিতে জোড়া খুন

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

পলাতক গৃহকর্মী- সংগৃহীত

রাজধানীর ধানমন্ডির ফ্ল্যাটে দুই নারীকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় রহস্যের জট এখনও খোলেনি। টাকা-গহনা লুটপাটের উদ্দেশ্যেই তাদের হত্যা করা হয়, নাকি নেপথ্যে অন্য কিছু ছিল তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে হত্যায় জড়িত হিসেবে সন্দেহের কেন্দ্রে রয়েছে ঘটনার দিন গৃহকর্মী হিসেবে সদ্য কাজে যোগ দেওয়া এক তরুণী। তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে বেরিয়ে আসবে অনেক প্রশ্নের উত্তর। নিহত আফরোজা বেগমের জামাতা ব্যবসায়ী কাজী মনির উদ্দিন তারিমের দেহরক্ষী ও ব্যক্তিগত সহকারী বাচ্চুও এ ঘটনায় সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন। বাচ্চুসহ অন্তত ছয়জনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এ ঘটনায় গতকাল মধ্যরাতে নিহত গৃহকর্ত্রীর মেয়ে দিলরুবা বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা করেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের ধানমন্ডি জোনের সহকারী কমিশনার হাসিনুজ্জামান সমকালকে বলেন, ওই বাসা থেকে সংগ্রহ করা সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়েছে। এতে সন্দেহভাজন গৃহকর্মীকে বাসায় ঢুকতে ও বের হতে দেখা যায়। তাকে গ্রেপ্তারে সম্ভাব্য স্থানগুলোয় অভিযান চালানো হচ্ছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় ধানমন্ডির ২৮ নম্বর সড়কের ২১ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে গৃহকর্ত্রী আফরোজা বেগম ও তার গৃহকর্মী দিতির রক্তাক্ত লাশ পাওয়া যায়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে গলা কেটে তাদের হত্যা করা হয়। ঘরের ভেতর তছনছ ও আলমারি ভাঙা অবস্থায় ছিল। স্বজনরা বলছেন, কিছু টাকা-গহনা লুট হয়েছে, তবে তার পরিমাণ এখনও নিশ্চিত নয়।

নিহত আফরোজা বেগমের জামাতা কাজী মনির উদ্দিন তারিম জানান, কেন তাদের খুন করা হয় তা এখনও নিশ্চিত নয় কেউ।

তবে শুধু টাকা-গহনা লুট করা খুনির উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয় না। তাহলে তাদের বেঁধে রেখে বা অচেতন করে জিনিসপত্র নিয়ে চলে যেতে পারত। আর একজন গৃহকর্মী একাই এমন ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ড ঘটাতে পারার কথা নয়। সম্ভবত এটি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। তারা পরিকল্পিতভাবেই এটা করেছে। তবে আফরোজা বেগমের সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। সে ক্ষেত্রে কারা কেন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে।

মনির উদ্দিন আরও জানান, শাশুড়ির হাতে স্বর্ণের চুড়ি ও আংটি ছিল, যা খুন হওয়ার পর পাওয়া যায়নি। আলমারি ভাঙা থাকায় ধারণা করা হয়, কিছু টাকা লুট করা হতে পারে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, স্বজনরা বাচ্চুকে পুরোপুরি বিশ্বস্ত মনে করলেও তাকে ঘিরে কিছু সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। তিনিই শুক্রবার নতুন গৃহকর্মীকে বাড়ির প্রধান ফটক থেকে নিয়ে যান। এরপর তাকে দীর্ঘসময় ধরে আফরোজা বেগমের ফ্ল্যাটটি ঘুরে দেখান। তখন আফরোজা ষষ্ঠ তলায় তার মেয়ে দিলরুবা সুলতানার ফ্ল্যাটে ছিলেন। আবার খুনের ঘটনার সময় বাচ্চু বাসায় ছিলেন নাকি বাইরে তা নিয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে। কেউ বলছেন, তখন তিনি তারিমের সঙ্গে বাসার বাইরে ছিলেন। আবার বাসার নিরাপত্তাকর্মীসহ কয়েকজন বলছেন, খুনের সময় তিনি বাসাতেই ছিলেন। বাইরে যাওয়ার আগে একবার তিনি লুঙ্গি পরে নিচে নামেন, তখন তাকে অস্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। তখনই ফিরে গিয়ে তিনি প্যান্ট-শার্ট পরে নেমে আসেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, আফরোজার ফ্ল্যাট থেকে আগে বাচ্চু বের হন, তার কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে আসেন সন্দেহভাজন নতুন গৃহকর্মী।

এদিকে বাচ্চুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাসার অদূরের কোনো এক পান দোকানি নতুন গৃহকর্মীর ব্যাপারে সুপারিশ করেন। গতকাল শনিবার ওই পান দোকানিকে পুলিশের একটি দল আটক করে বলে একটি সূত্রে জানা গেলেও দায়িত্বশীল কেউ তা নিশ্চিত করেননি। পাশাপাশি সন্দেহভাজন গৃহকর্মীর অবস্থান গতকাল পর্যন্ত ঢাকাতেই ছিল বলে জানা গেছে। তিনি একটি মোবাইল ফোন নম্বরে বেশ কয়েকবার কথা বলেছেন। সেই ফোন নম্বরটি পাবনার।

স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের পর আফরোজা বেগমের আইফোন না পাওয়া যাওয়ায় সেটি দুর্বৃত্তরা নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে পরে জানা যায়, আফরোজা নিজেই ওই ফোন সেটটি তার নাতনিকে ব্যবহারের জন্য দিয়েছিলেন। আর তার ব্যবহূত ফোনটি ঘটনাস্থলেই ছিল, যা পুলিশ সদস্যরা আলামত হিসেবে জব্দ করেছিলেন। আফরোজার ফ্ল্যাটে সন্দেহজনক একটি ছোট ব্যাগও পাওয়া গেছে। তাতে কিছু ভেজা টিস্যু ছিল। সেগুলোয় ক্লোরোফর্ম বা চেতনানাশক কিছু মেশানো ছিল কি-না তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের আগে গৃহকর্মী দিতির কাছেও একই রকম একটি ব্যাগ ছিল, যা সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে। এ ছাড়া ঘটনাস্থলের অদূরে নজরুল ইনস্টিটিউটের কাছে মেয়েদের এক জোড়া স্যান্ডেল পড়ে ছিল। রক্তমাখা স্যান্ডেলগুলো পলাতক গৃহকর্মীর সন্দেহে জব্দ করা হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ মিলিয়ে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয় পুলিশ। সব মিলিয়ে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্বজনরা বলছেন, খুনির টার্গেট পরিবারের অন্য কেউও হয়ে থাকতে পারে। কারণ শুধু মালপত্র লুটের উদ্দেশ্যে এলে ওই গৃহকর্মী অন্তত দু-একদিন বাসায় থেকে সব দিক ভালো করে বুঝে তারপর ঘটনা ঘটাত।

এসব বিষয়ে নিশ্চিত হতে পুলিশ ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। তাদের মধ্যে বাচ্চু ছাড়াও রয়েছেন নিরাপত্তাকর্মী নুরুজ্জামান, শাফিন, রুমান, ইলেকট্রিশিয়ান বেলায়েত ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মনু।

সিসিটিভির ফুটেজে দেখা যায়, সন্দেহভাজন ওই গৃহকর্মীর পরনে ছিল জিন্স প্যান্ট, কামিজ ও ওড়না। তার হাতে ছিল মোবাইল ফোনসেট। বাসায় ঢোকার আগ মুহূর্তে তিনি কাউকে কল করছিলেন।

শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত: আফরোজা বেগম ও দিতির লাশের ময়নাতদন্ত গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সম্পন্ন হয়। এ বিষয়ে ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রভাষক ডা. কবির সোহেল জানান, তিন সদস্যের একটি বোর্ড গঠন করে ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। দুটি লাশেরই গলাকাটাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

মর্গ সূত্র জানায়, মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে ভিসেরা পরীক্ষার জন্য মৃতদেহ দুটি থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি হত্যার আগে গৃহকর্মী দিতি ধর্ষণের শিকার হন কি-না তা পরীক্ষার জন্যও প্রয়োজনীয় নমুনা নেওয়া হয়েছে। এর আগে পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই মৃতদেহের গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় জখম রয়েছে।