ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

টুকা কাহিনীর বুলবুল চৌধুরী

টুকা কাহিনীর বুলবুল চৌধুরী
×

বুলবুল চৌধুরী (১৯৪৮-২০২১)

আহমেদ মাওলা

প্রকাশ: ৩০ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২১ | ১৪:৪১

দীর্ঘদিন মরণঘাতী ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে বিদায় নিলেন সত্তরের উজ্জ্বলতম কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরী। আজন্ম বোহিমিয়ান, বৈষয়িক উদাসীন, আড্ডাবাজ, আসক্তিপ্রবণ বুলবুল চৌধুরী খুব সাদামাঠা জীবনযাপন করতেন। প্রথম জীবনে সিনেমার পরিচালক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এফডিসিতে ঘুরেছেন। সিনে পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন; পরে কবি আবুল হাসান, মাসুদ রানাখ্যাত আবদুল হাকিম, কবি নির্মলেন্দু গুণ, কায়েস আহমেদ প্রমুখের সঙ্গে বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডায় মিশে লেখক হতে গিয়ে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন। তিরিশের অধিক চাকরি বদল করেছেন, ব্যবসা করেছেন কিছুদিন। না, কিছুতেই তিনি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। লেখালেখির জমিনই তার অস্থির জীবনের স্থায়ী হলো। কপট ভাষা কিংবা বানিয়ে তোলা গল্প নয়, গ্রামীণ, লোকায়ত অভিজ্ঞতা, সহজাত খোলা চোখে প্রবহমান জীবনকে দেখা চালচিত্র নিয়েই বুলবুল চৌধুরী গল্প লেখেন।

তার 'টুকা কাহিনী' (১৯৭৭) প্রকাশের পর সবার দৃষ্টি পড়েছিল এই নতুন লেখকের ওপর। বিশেষত, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজধানী ঢাকার নগরকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির জীবনের গল্প প্রধান হয়ে ওঠার পটভূমিতে বুলবুল চৌধুরীর গ্রামজীবননির্ভর গল্প পাঠক রুচিতে ভিন্ন এক আবহের সৃষ্টি করে। 'টুকা কাহিনী' বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্যের চমক সৃষ্টিকারী একটি গ্রন্থ। সবগুলো গল্পের পটভূমি গ্রামীণ, লোকজ শব্দ-অনুষঙ্গ নিয়ে তার ভাষাভঙ্গি বিস্ময়কর। তার পর্যবেক্ষণে গ্রামীণ সমাজের যে সারল্য ধরা পড়ে, তা অকৃত্রিম। তার গল্পে বাংলাদেশের লোকায়ত জীবনের সৌরভ পাওয়া যায়। কবি জসীমউদ্‌দীন যেমন কবিতায় নতুন করে গ্রাম-জীবন ও লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরেছিলেন, তেমনি বুলবুল চৌধুরী স্বাধীনতা-পরবর্তী গল্পে গ্রাম-জীবনকে নতুন করে উপস্থাপন করে ভিন্ন ঘরানার লেখক হয়ে ওঠেন। কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন 'তিয়াসের লেখন' প্রকাশনা উৎসবে বক্তৃতা দিতে গিয়ে বলেছেন- 'আমি একসময় লেখালেখি করে বুলবুল চৌধুরী হতে চেয়েছিলাম। গ্রাম্যজীবন বর্ণনার ক্ষেত্রে আমাদের লেখকদের মধ্যে তার ধারেকাছে কেউ নেই। আমি তার কাছে অনেক কিছু শিখেছি।'

একেবারে নতুন আদলে, লোকজ শব্দনির্ভর আধুনিক ভাষায় গাঁথুনিতে তার গল্প-উপন্যাস হয়ে ওঠে অসাধারণ। আবহমান বাংলার নিসর্গ, ব্রাত্য জীবনকে বুলবুল চৌধুরী তার গল্প-উপন্যাসে খুলে-মেলে ধরেন। পাঠকের কাছে, তার লেখা পাঠ মানে ভিন্ন এক ভূগোলে পরিভ্রমণ। প্রান্তবাসী, মাটিবর্তী নর-নারীর প্রেম, অনুরাগের ছবি তিনি আঁকেন আন্তরিক দরদ দিয়ে। তার সৃষ্ট চরিত্ররা ক্ষেতেখোলায় গতর খাটে, মাছ ধরে, কামলা দেয়। বিচিত্র পেশার এবং নেশায় পতিত, স্খলিত, উন্মূল মানুষ বুলবুল চৌধুরীর লেখায় এসে ভিড় জমিয়েছে।

কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর জন্ম গাজীপুর জেলার দক্ষিণবাগ গ্রামে। কে.এম. জুবলী হাইস্কুল, ঢাকা থেকে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক পাস করেন জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৭০ সালে। লেখালেখির শুরু ছাত্রজীবনে। তার অসামান্য গল্পগ্রন্থ 'টুকা কাহিনী' দিয়ে পাঠকদের মনে জায়গা দখল করে নিলেও সত্তরের পর দীর্ঘ সময় তাকে সাহিত্যের মাঠে দেখা যায়নি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন- ''পেশাগত কারণে আমি কোথাও স্থির হতে পারিনি। আমার জীবনে ৩০টিরও বেশি চাকরি বদল করেছি। 'জোনাকী', 'ঝিনুক', 'নিপুণ', 'রোমাঞ্চ', 'চিত্রকল্প'- এসব বিনোদন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছি। সিনেমার পরিচালক হওয়ার স্বপ্নে ১৯৭৪ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।'' বুলবুল চৌধুরীর মতো কোনো লেখক ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে এত নিরীক্ষা করেছেন বলে আমার জানা নেই। ষাটের দশকে ঢাকার বাংলাবাজারের বিউটি বোর্ডিং কেন্দ্রিক সাহিত্য আড্ডায় তার বন্ধু ছিলেন কায়েস আহমেদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, শেখ আবদুল হাকিম প্রমুখ। তার বিচিত্র ও বোহিমিয়ান জীবনে কিছু হদিস পাওয়া যায় তার 'অতলের কথকতা', (২০১৪) গ্রন্থের 'আমার প্রথম বন্ধু', 'প্রথম পলায়ন', 'সাধু হে আনন্দ পেতে দাও', 'ডেকে ফিরি', 'আমার সংসার', 'এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে' ইত্যাদি লেখায়। দীর্ঘ বিরতির পর নব্বই দশকের শেষ দিকে তিনি আবার লেখালেখিতে স্বকীয় এবং নিয়মিত হয়ে ওঠেন।

শক্তিমান কথাশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর ব্যক্তিজীবন কিছুটা 'আউপাতালি' শব্দের অর্থ এলোমেলো, আউলা ধরনের। শব্দটা প্রচ্ছদ শিল্পী ধ্রুব এষের দেওয়া। বাউলস্বভাবী বুলবুল চৌধুরী ব্যক্তি হিসেবে নির্লিপ্ত, প্রচারবিমুখ, নিজেকে লুকিয়ে রাখতে, আড়াল করতে বেশি পছন্দ করেন। এ জন্য তাকে কখনও মিডিয়াতে দেখা যায়নি। তার প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ : টুকা কাহিনী (১৯৭৭), পর মানুষ (১৯৯৭), নির্বাচিত গল্প (১৯৯৭), গল্পসমগ্র (২০১৬)। বুলবুল চৌধুরীর গল্পের ভুবনে প্রবেশ করলে দেখা যায়, তার বর্ণনাভূমি গ্রাম হলেও গ্রাম শেষ পর্যন্ত কেবল পটভূমি হিসেবে থাকে না। জল, মাটি, ঘাস, বৃক্ষলতার সঙ্গে নর-নারীর প্রেম-বিচ্ছেদ, দুঃখ-দারিদ্র্য, দহন-যন্ত্রণায় একাকার হয়ে যায়। সেখানে তার গ্রামীণ অভিজ্ঞতাই প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে তার গল্পের বিষয়বস্তুই কেবল ভিন্ন হয়ে ওঠে না, স্বকীয় ভাষাভঙ্গি ও লোকজ শব্দের যুতসই প্রয়োগে স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে। 'টুকা কাহিনী'র আটটি গল্পে সেই স্বাতন্ত্র্যের পরিচয় স্পষ্ট হয়।

'নিড়ান দেও কেরে', 'বাদাইল্লা', 'হেজা', 'কড়ূল', 'চেডে জানে', 'কান্দা জামিন', 'ঠেহা' এসব লোক-উচ্চারিত শব্দের সঙ্গে বর্ণিত পরিবেশ অবিচ্ছেদ্য। আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগে, বাক্যবন্ধনের মধ্যে বুলবুল চৌধুরীর নিজস্বতা প্রণিধানযোগ্য। ব্যাঙের প্রতীকে টুকার জীবন বর্ণনায় বুলবুল চৌধুরীর শিল্পচৈতন্যের পরিচয় পাওয়া যায়। নায়েবের লাথি খেয়ে কনুইয়ে শরীরে ভর দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা টুকা যেন সেই কুনো ব্যাঙসদৃশ। এই প্রতীকায়নই গল্পটিকে শিল্পোত্তীর্ণ করেছে।

'পরমানুষ' গল্পে ধনীখোলা হাটের নটীবাড়ির নটী কইতরীর প্রতি আরমানের দুর্নিবার আকর্ষণ। কিন্তু আরমান অন্য কাস্টমারের মতো 'বসে' না। পকেট থেকে সযতনে রাখা ঘড়িটা হাতে দিতেই কইতরী বলে 'না'। আরমান বলে, আমারে তুমি পর ভাবতে পার কিন্তু আমি তোমারে আপন করেই নিছি। চিৎকার করে উঠে কইতরী- 'আমারে ঘড়ি পিন্দানের কেডা তুমি?' ঘড়িটা ছুড়ে ফেলে দরজার খিল খুলে বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে কইতরী এগিয়ে এসে দু'হাত জড়িয়ে ধরে বলে- 'তুমি ক্যান বোজ না আমি পরমানুষ?'

গল্পের শেষটি বড়ই করুণ। কইতরী গোসলের সময় সাঁতরে নদী পার হয়ে নটীপাড়া থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে। পাইন্না হারামি তাকে বুকে ছুরি ঢুকিয়ে হত্যা করে। 'চৈতার বউ গো' গল্পেও দেখা যায়, জিয়া-কাজল নতুন বিয়ে করে ট্রেনে কমলাপুর স্টেশন থেকে ঘোড়াশাল নেমে নদী পেরিয়ে খলাপাড়া গ্রামে যায়। বাড়িতে চাচা সবুর আলী, চাচি তাদের খুব আদর-যত্ন করে। গ্রামে এক পাখির 'ফল পাকো' ডাক শুনে কাজল জিজ্ঞাসা করে, কী নাম পাখিটার? জিয়া তখন বলে, পাখিটার নাম 'চৈতার বউ' পাখি। পাখির এই নামকরণের পেছনে একটা মিথ আছে। অনেক আগে বোবা ছেলের জন্য গরিব ঘরের সুন্দরী মেয়েকে বউ করে আনা হয়েছিল। গ্রামে এলো একতারা হাতে এক গায়েন। ভারি মিষ্টি তার গলা। গান শুনে চৈতার বউ বশ মানে। গায়েনের সঙ্গে চৈতার বউ পালিয়ে যেতে চেয়েছিল। চৈতার মা তা টের পায়। সে তন্ত্রমন্ত্র জানত। বউ পালিয়ে গেলে বংশের কলঙ্ক হবে জেনে বুড়ি মন্ত্র পাঠ করে গায়েন আর ছেলে বউকে পক্ষী বানিয়ে আকাশে উড়িয়ে দেয়। চৈতার বউ পাখির বৃত্তান্ত শুনে কাজল আর জিয়া দু'জনের প্রেমের কথা স্মরণ হয়। দু'জনের অন্তরে অন্য মানুষ। কামে মত্ত হওয়ার পরও সেই স্মৃতি অন্তরে থেকে যায়। আঞ্চলিক জীবন, গ্রামীণ লোকায়ত সংস্কৃতি বুলবুল চৌধুরীর গল্পে এভাবে নতুন মাত্রা লাভ করে। 'মাছের রাত', 'মাছ', 'খরা', 'ঘর ছিল', 'সংসার', 'নিরবধিকাল', 'অচেনা নদীর ঢেউ', 'দ্বিতীয় বাসর' প্রভৃতি গল্পে বুলবুল চৌধুরীর বিষয়-ভাবনা, চরিত্র-চিত্রণ, লোকজ শব্দের যুতসই প্রয়োগ বেশ প্রশংসনীয়।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের গল্প-সাহিত্য বুলবুল চৌধুরী নতুনভাবে গ্রামীণ সমাজ ও লোকায়ত জীবনকে আন্তরিক দরদ দিয়ে এঁকেছেন। জীবনবোধ ও পর্যবেক্ষণের অন্তর্দৃষ্টির ভিন্নতা নিয়ে বুলবুল চৌধুরীর গল্পের শৈল্পিক রূপটি উজ্জ্বল হয়ে আছে।

অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×