ডেমোক্র্যাটদের এবারও কি আশাভঙ্গ হবে?
আহমেদ সুমন
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২০ | ০৯:০২ | আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২০ | ০৯:০৬
আগামী ৩ নভেম্বর ২০২০ তারিখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি জয়ী হয়ে আরও এক মেয়াদ হোয়াইট হাউসে থেকে যাবেন, নাকি জো বাইডেন আবারও ফিরে আসবেন? জো বাইডেন ফিরে আসবেন এ জন্য বলা হচ্ছে যে, তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়কালে ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নির্বাচনী স্লোগান হিসেবে 'আমেরিকা ফার্স্ট' নির্ধারণ করেছেন। এই স্লোগানের মধ্য দিয়ে তিনি সবকিছুতে আমেরিকা অগ্রাধিকার পাবার কথা বলতে চেয়েছেন। এটি তাঁর পূর্ববর্তী নির্বাচনী স্লোগান 'মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন'-এর সংস্করণ। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি এই স্লোগানে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়েছিলেন। ট্রাম্প তার নির্বাচনী স্লোগানের ব্যাখ্যায় জানাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং প্রত্যেকটি দেশের যার যার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। ট্রাম্প নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির বিষয়ে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ট্রাম্প আমেরিকা ফার্স্ট বলে প্রচার করছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের নির্বাচনী স্লোগান 'বিল্ড ব্যাক বেটার'। এটি বারাক ওবামার 'চেঞ্জ উই নিড' স্লোগানের সংস্করণ। বারাক ওবামার এই নির্বাচনী স্লোগানটি সেই সময়ে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদেরই নয়; অন্যদেশেও এটি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের 'দিন বদলের অঙ্গীকার' নির্বাচনী স্লোগানটি অনেকেই মনে করেন সেই আদলেই তৈরি। বলা প্রয়োজন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন, তা দিয়ে কমই সে দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হয়। রিপাবলিকান-ডেমোকক্র্যাটদের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি থাকে প্রায় অভিন্ন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশসহ কোনো কোনো দেশের রাজনীতিক, যাদের ভেতর খুশি-অখুশি কাজ করে তা নিছক নিষ্ফম্ফলে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে আঞ্চলিক শক্তি বরং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কম-বেশি প্রভাবিত করতে পারে এবং করছে।
আমরা লক্ষ্য করছি, আসন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রায় সব জনমত জরিপেই জো বাইডেন এগিয়ে থাকলেও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, জো বাইডেনই শেষ হাসি হাসবেন। এর আগের নির্বাচনে জনমত জরিপে এগিয়ে থাকলেও ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। হিলারির পরিচিতি ও অন্যসব ঔজ্জ্বল্যের কাছে পিছিয়ে থাকা ট্রাম্পই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিছুটা অস্থিরমতি ও পাগলাটে স্বভাবের ব্যবসায়ী ট্রাম্প আমেরিকার মতো দেশের প্রেসিডেন্ট হবেন- এটা অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার এবং নির্বাচন ব্যবস্থা এই অনুজ্জ্বল ব্যক্তির হাতেই 'ভি' চিহ্ন তুলে দিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প গত চার বছরে এমন আহামরি কিছু করেননি, যাতে মার্কিনিরা তার দিকে আবার ঝুঁকে পড়বে। বরং অনেকেই তার মেয়াদপূর্তি নিয়ে দ্বিধা-সংকোচে ছিলেন। নানা ঘটনার মধ্যদিয়ে হলেও ট্রাম্প অবশ্য তার মেয়াদ শেষ করার দ্বারপ্রান্তে। ট্রাম্পের বিরোধী শিবির থেকে অনেকের ভেতর প্রশ্ন জাগে- ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখার ভরসা মানুষ পায় কোথা থেকে? এতদ্সত্ত্বেও ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন পেয়েছেন। দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য তার মনোনয়ন পাওয়া অনেকের কাছে বিস্ময়ের হলেও নির্বাচনে ট্রাম্প জয়লাভের আশা করছেন। এক্ষেত্রে ট্রাম্প যদি পুনর্নির্বাচিত হন, তাতেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। অনেক মার্কিন জনসাধারণ যে ট্রাম্পের পাগলাটে স্বভাব পছন্দ করেন, সেটা তার প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে। ট্রাম্প অবশ্য নির্বাচনে হেরে গেলে ক্ষমতা ছাড়তে গড়িমসি করতে পারেন বলে আভাস দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি আদালতেও যেতে পারেন।
ট্রাম্পের বিশেষ দিক হলো তিনি নিজে যা ভালো মনে করেন, তা করতে পিছপা হন না। নিন্দা-সমালোচনা তিনি গায়ে মাখেন না। যখন-তখন তিনি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্প গতবারের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটার 'আশা' করছেন। জনপ্রিয় ভোটে তিনি বাইডেনের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও ইলেকটোরাল ভোটে তিনি নির্বাচিত হওয়ার আশা করছেন।
আমরা জানি যে, জনপ্রিয় ভোট আর ইলেকটোরাল ভোট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জনগণের সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ভোটে নয়, তিনি নির্বাচিত হন ইলেকটোরাল কলেজের প্রত্যক্ষ ভোটে। ইলেকটোরাল কলেজের মোট ভোটের সংখ্যা ৫৩৮। যে প্রার্থী ২৭০টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোট পান, তিনিই নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরবর্তী চার বছরের জন্য দেশ পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করেন। ভোটারদের কাছ থেকে একজন প্রার্থী যে ভোট পান, তাকে 'পপুলার ভোট' বলা হয়। আর ইলেকটোরাল কলেজের ভোটকে বলা হয় 'ইলেকটোরাল ভোট'। ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটন পপুলার ভোট ৩০ লাখ বেশি পেয়েও ইলেকটোরাল ভোট ২৭০টি না পাওয়ায় পরাজিত হন। কোন রাজ্যে কতজন ইলেকটোরাল নির্বাচক থাকবেন, সেটা নির্ধারিত হয় রাজ্যের জনসংখ্যার ভিত্তিতে।
২০১৬ সালে ট্রাম্পের বিজয় পুরো পৃথিবীকে না হলেও পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে অবাক ও বিস্মিত করেছে, তাতে সন্দেহ নেই। সেই সময়ে ট্রাম্পের বিজয়ে অনেক মানুষের মূল্যবোধে আঘাত এসেছে- এ ধারণাও অসত্য নয়। ট্রাম্পের কথাবার্তায় রাজনৈতিক শিষ্টাচার, সৌজন্যতার অভাব স্পষ্ট লক্ষণীয়। 'দায়িত্ব' যে ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল ও সংযত হতে বাধ্য করে, তার অনেক উদাহরণ আছে। ভারতে ক্ষমতায় গেলে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে রামমন্দির করবেন বলে বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি ঘোষণা দিয়েছিলেন। ১৯৯৮ সালের ১৯ মার্চ বাজপেয়ি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অধিষ্ঠিত হওয়ার পর কিন্তু তিনি সেখান থেকে সরে এসেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর উল্টো তিনি বলেছিলেন 'রাষ্ট্রের সকল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সকল ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।'
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিন এখন যতই কাছে আসছে, সম্ভাব্য ফলাফলের হিসাব-নিকাশ নিয়ে ততো বেশি আলোচনা হচ্ছে। পর্যবেক্ষকরা আসন্ন নির্বাচনে অভূতপূর্ব ও অভাবনীয় ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন। ট্রাম্প হেরে গেলে নির্বাচনোত্তর ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি করার যে সংস্কৃতি কোনো কোনো দেশে লক্ষ্য করা যায়, সেটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা দিতে পারে। ট্রাম্প পোস্টাল ভোটের প্রশ্ন উত্থাপন করে নির্বাচনকে বৈধ-অবৈধ বির্তকের মধ্যে ফেলতে পারেন। এক্ষেত্রে তিনি আদালতে যেতে পারেন। ইতোমধ্যে তিনি সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসেবে আরও একজন আইনজীবীকে মনোনয়ন দিয়েছেন। এর ফলে সুপ্রিম কোর্টে তার অনুসারী বিচারপতির সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রাম্পের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, তাতে নির্বাচনোত্তর তিনি কোন পরিস্থিতিতে কী করেন, তার হাইপোথিসিস বা পূর্বানুমান সঠিক নাও হতে পারে। বিপরীতে এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপে জো বাইডেন এগিয়ে থাকার পরিসংখ্যান জানান দিলেও ডেমোক্র্যাট শিবিরে স্বস্তি নেই। কেননা ২০১৬ সালের আশাভঙ্গের ভূত এখনও তাদের তাড়া করে।
- বিষয় :
- যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন