সমকালীন প্রসঙ্গ
অর্থনীতিতে মানুষের স্বস্তি ও উদ্যোক্তার আস্থা জরুরি
মাহমুদ শারাফাত
মাহমুদ শারাফাত
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪২ | আপডেট: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯:৪৬
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে আমরা সাধারণত জিডিপি, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট কিংবা রাজস্ব আয়ের পরিসংখ্যান সামনে নিয়ে আসি। কিন্তু একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমার কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে বাস্তব সূচক হলো-মানুষ কতটা স্বস্তিতে বাজারে যাচ্ছে, ব্যবসায়ী কতটা নিশ্চিন্তে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠান আগামী ছয় মাসের কাজ নিয়ে কতটা আত্মবিশ্বাসী। এই জায়গাতেই দেশের বর্তমান অর্থনীতির বাস্তব চিত্রটি একটু জটিল।
দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীলতার দিকে ফেরার চেষ্টা করছে, কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংকিং খাতের চাপ, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও ভোক্তা—দুই পক্ষের ওপরই চাপ তৈরি করছে। আইএমএফের সর্বশেষ জুলাই ২০২৬ মূল্যায়নেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রাজস্ব, ব্যাংকিং ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জের কথা বলা হয়েছে। ব্যবসার মাঠে এর প্রভাব খুব সরাসরি।
ক্রেতা যখন ফ্রিজ, টেলিভিশন, এয়ার কন্ডিশনার, কম্পিউটার কিংবা ল্যাপটপ কিনতে আসেন, তখন তার সিদ্ধান্ত শুধু পণ্যের প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে না। তিনি হিসাব করেন আজ কিনব, নাকি আরও কিছুদিন অপেক্ষা করব? ব্যবসায়ীও একইভাবে হিসাব করেন, নতুন পণ্য আমদানি করব কি না, কতটুকু স্টক রাখব, কত টাকা বিনিয়োগ করব এবং বাজারে চাহিদা কেমন থাকবে।
এখানেই অর্থনীতির বড় প্রশ্নটি দাঁড়ায়—মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যবসায়ীর বিনিয়োগ সক্ষমতা কীভাবে একসঙ্গে বাড়ানো যায়?
চলতি বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের উচ্চ লক্ষ্যও রাখা হয়েছে। কিন্তু শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই অর্থনীতির গতি বাড়বে না; লক্ষ্য অর্জনের জন্য ব্যবসার পরিবেশ, কর ব্যবস্থার পূর্বানুমেয়তা, ব্যাংকিং খাতের আস্থা এবং বিনিয়োগের পরিবেশকে একই সঙ্গে শক্তিশালী করতে হবে।
দেশের অর্থনীতির জন্য মানুষ এবং উদ্যোক্তা শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবাই অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখে। কিন্তু উদ্যোক্তা যদি মনে করেন, আগামীকাল তার খরচ কত হবে তিনি জানেন না, ব্যাংক থেকে অর্থায়ন পাওয়া কতটা সহজ হবে তা নিশ্চিত নন, আমদানি ব্যয় কত হবে তা অনুমান করা কঠিন কিংবা বাজারে ভোক্তার চাহিদা কমে যেতে পারে—তাহলে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই ধীর হয়ে যায়।
অর্থনীতি তাই শুধু সরকারের বিষয় নয়; এটি সরকার, ব্যাংক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক এবং ভোক্তা—সব পক্ষের সম্মিলিত বাস্তবতা।
দেশের আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থিতিশীলতা, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন। আমরা যদি শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বাড়ানোর দিকে তাকাই, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যদি মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত না হয়, তাহলে অর্থনীতির শক্তি পূর্ণতা পাবে না। অন্যদিকে, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদেরও শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ জনবল তৈরি, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বেসরকারি খাতকে দায়িত্ব নিতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন একটি পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার—দুটোকেই একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। আমরা যদি এই ভারসাম্য তৈরি করতে পারি, তাহলে বর্তমান চাপ ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কারণ, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখনো তার বাজারে নয়, শুধু তার রপ্তানিতে নয়—তার সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো তার মানুষ, উদ্যোক্তা এবং নতুন কিছু করার সক্ষমতায়।
মাহমুদ শারাফাত: উদ্যোক্তা
- বিষয় :
- অর্থনীতি