সমকালীন প্রসঙ্গ
শিশুর নিরাপত্তা কোনো ছেলেখেলা নয়
প্রতিটি শিশু ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের একই ফ্রেম, কেবল ভিকটিম আলাদা
শারীফ অনির্বাণ
প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২০:৪২
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ড আমরা দেখেছি। নিখোঁজ হওয়ার পর যেভাবে তার লাশ পাওয়া গেছে, তা আমাদের হতবাক করেছে। তার ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শিশুর নিরাপত্তা কতটা নাজুক। একই সঙ্গে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার পাবনার দশ বছরের শিশুটির ঘটনাটাও বলা যাক। গত ৯ সেপ্টেম্বর, সন্ধ্যার ঠিক মুখে পাবনার একটি গ্রামে ১০ বছরের ছোট্ট মেয়েটি বাড়ি থেকে বের হয়েছিল মাত্র ৫০০ গজ দূরের একটি দোকানে আইসক্রিম কিনতে। স্থানীয় কিন্ডারগার্টেনে চতুর্থ শ্রেণির প্রাণবন্ত মেয়েটি আর বাড়ি ফেরেনি। এর পরের সাত দিন পরিবারটি পার করেছে এক দুঃসহ নরক-যন্ত্রণা। মেয়েকে ফিরে পেতে স্বজন আর সহপাঠীদের নিয়ে রাজপথে মানববন্ধন করতে হয়েছে। সেই মানববন্ধনে কলির জন্য বিচারের দাবি তুলে মেয়েটির বাবার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তাদেরই প্রতিবেশী মোস্তফা কামাল।
সংবাদপত্রের তথ্য অনুসারে, সাত দিন পর, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে উদ্ধার হয় মেয়েটির বস্তাবন্দি মরদেহ। পুলিশের তদন্ত ও ঘাতকের স্বীকারোক্তিতে উন্মোচিত হয় এক রোমহর্ষক সত্য। ফ্রিজ থেকে আইসক্রিম দেওয়ার কথা বলে প্রতিবেশী মোস্তফা ও তাদের ভাড়াটিয়া ইয়াছিন শিশুটিকে বাড়ির ভেতর নিয়ে পালাক্রমে পাশবিক নির্যাতন চালায়; নিস্তেজ হয়ে পড়লে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় এবং প্লাস্টিকের বস্তায় দেহ না আঁটায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার দুটি পা কেটে ফেলা হয়। আর ঘরের ভেতর সেই খণ্ডিত নিথর দেহ রেখে বাইরে কলিকে ‘খোঁজার’ নাটক ও মানববন্ধনে শামিল হয়েছিল অভিযুক্তরা।
পাবনার ১০ বছরের শিশুর এই রক্তভেজা পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম প্রতিফলন। প্রতিটি শিশু ধর্ষণ পরবর্তী হত্যাকাণ্ডের একই ফ্রেম, কেবল ভিকটিম আলাদা। একটি শিশু ধর্ষণের শিকার হলে কিংবা লাশ হয়ে ফিরলে আমরা কয়েক দিন ক্ষোভে ফেটে পড়ি, সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তারপর নতুন কোনো ট্রেন্ড কিংবা ট্র্যাজেডি পুরোনোটিকে আড়াল করে দেয়। কিন্তু যে মেয়েটি আর কোনো দিন ক্লাসে ফিরবে না, যে পরিবারটি আজীবন এক অপূরণীয় ক্ষতের বোঝা বয়ে বেড়াবে, তাদের কাছে এই ঘটনা কখনও পুরোনো হয় না।
অন্যদিকে আমাদের সমাজে শিশু নির্যাতনের আলোচনায় আরেকটি অন্ধকার দিক প্রায়ই উহ্য থেকে যায়, তা হলো ছেলেশিশুদের যৌন নির্যাতন। সমাজে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে শুধু মেয়েশিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়। বাস্তবতা হলো, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে আবাসিক মাদ্রাসা, এতিমখানা, ছাত্রাবাস এবং ক্রীড়া একাডেমিতে প্রতিনিয়ত বহু ছেলেশিশুও পাশবিক যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। যা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন আকারে এসেছে। সামাজিক লোকলজ্জা, পরিবারের সম্মানহানির ভয় এবং ‘ছেলেরা নির্যাতনের শিকার হয় না’ এমন পুরুষতান্ত্রিক অন্ধবিশ্বাসের কারণে এসব ঘটনার সিংহভাগ প্রকাশ পায় না। ভুক্তভোগী ছেলেশিশুরা দিনের পর দিন মানসিক ট্রমা নিয়ে বেড়ে ওঠে।
বাংলাদেশে আইন ও নির্দেশনার অভাব নেই এবং এসব সংকটের সমাধান শুধু আদালত বা পুলিশের লাঠির ডগায় সীমাবদ্ধ নয়। পাবনার দশ বছরের মেয়েটির নির্মম ঘটনা প্রমাণ করে, শিশু নির্যাতনের একটি বড় অংশ ঘটে এমন মানুষের মাধ্যমে, যাকে শিশুটি চেনে বা বিশ্বাস করে। ইউনিসেফও উল্লেখ করেছে যে শিশুরা অপরিচিতদের চেয়ে পরিচিত ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দ্বারা বেশি সহিংসতার ঝুঁকিতে পড়ে (ইউনিসেফ বিডি, ২০২৫)। তাই শিশুকে শুধু ‘অপরিচিতের ভয়’ দেখালে চলবে না; ছেলে কিংবা মেয়ে উভয় সন্তানকেই শরীর ও ব্যক্তিগত সীমানা (নিরাপদ ও খারাপ স্পর্শ) সম্পর্কে বোঝাতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাঙ্গনে এমন খোলামেলা আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণে শিশু যেন অপরাধবোধে না ভুগে তৎক্ষণাৎ মা-বাবাকে জানাতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকেও আমাদের নেওয়ার মতো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা রয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের ‘থুথুজেলা কেয়ার সেন্টার’ মডেলে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া ব্যক্তিকে একাধিক জায়গায় ঘুরতে হয় না; একই ছাদের নিচে চিকিৎসা, পুলিশি বয়ান, মানসিক কাউন্সেলিং ও প্রসিকিউশন সেবা সমন্বিতভাবে দেওয়া হয়। অন্যদিকে প্রতিবেশী ভারতে ‘পকসো’ আইনের আওতায় চার শতাধিক বিশেষ আদালত গঠন করে শিশুদের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা হচ্ছে (মিনিস্ট্রি অব ল অ্যান্ড জাস্টিস, ভারত সরকার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)। বাংলাদেশেও তদ্রূপ প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের সেবাকে আধুনিকীকরণ করে বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করা প্রয়োজন।
এ ছাড়া শিশুর সুরক্ষায় অবিলম্বে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়ন জরুরি:
এক. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাধীন শিশু সুরক্ষা সেল: স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা বা কোচিং সেন্টারে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিরপেক্ষ ‘চাইল্ড সেফগার্ডিং কমিটি’ সক্রিয় করতে হবে, যেখানে ছেলে বা মেয়ে যে কোনো শিক্ষার্থী কোনো ভয় বা লজ্জা ছাড়া গোপনীয়তার সঙ্গে অভিযোগ জানাতে পারবে।
দুই. থানায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ: নিখোঁজ হওয়ার তথ্যে কোনো ‘২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা’র সামাজিক ধারণা নয়; নিখোঁজ জিডি হওয়ার প্রথম কয়েক ঘণ্টাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বা ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বিবেচনা করে তাৎক্ষণিক অনুসন্ধান ও প্রযুক্তিগত ট্র্যাকিং শুরু করতে হবে।
তিন. ফরেনসিক সক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ: প্রতিটি বিভাগীয় মেডিকেল কলেজে স্বয়ংসম্পূর্ণ ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে, যাতে রিপোর্টের অভাবে বছরের পর বছর তদন্ত আটকে না থাকে।
চার. শিশু হেল্পলাইন ১০৯৮-এর সার্বিক বিস্তার: সমাজসেবা অধিদপ্তরের টোল-ফ্রি চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-কে তৃণমূল পর্যায়ের পুলিশ ও সমাজকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সমন্বিত করতে হবে, যাতে যে কোনো শিশু বা সচেতন নাগরিক এক কলেই তাৎক্ষণিক আইনি ও সামাজিক সাহায্য পায়।
পাঁচ. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: ‘লোক জানাজানি হলে পরিবারের সম্মান নষ্ট হবে’ এই ধরনের সামাজিক ভণ্ডামি ভাঙতে হবে। ছেলে হোক বা মেয়ে, শিশুর ওপর নির্যাতন ঘটলে সম্মান অপরাধীর যায়, ভুক্তভোগী শিশুর নয়।
পাবনার দশ বছরের মেয়েটির রক্তাক্ত পরিণতি শুধু একটি ফৌজদারি মামলার নথি নয়; এটি আমাদের পরিবার, সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার যৌথ ব্যর্থতার এক স্পষ্ট আয়না। একটি শিশু যখন নিজ বাড়ির সামনে কিংবা শ্রেণিকক্ষের চারদেয়ালে অনিরাপদ হয়ে পড়ে, তখন সেই দায়ভার এড়ানোর সুযোগ আমাদের কারও নেই।
আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তবে কাল হয়তো আমার-আপনার নিজের সন্তানকে হারিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে হবে। যে রাষ্ট্র ও সমাজ তার নিজের শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, সে দেশের ভবিষ্যৎ কখনোই নিরাপদ হতে পারে না।
শারীফ অনির্বাণ: শিক্ষক, গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
shariful.islam@ogr.deu.edu.tr
- বিষয় :
- শিশু ধর্ষণ ও হত্যা
- শিশু নির্যাতন