পরিবেশ-প্রতিবেশ
হালদা নদীর উৎসস্থল এবং নিজস্বতা রক্ষা জরুরি
পাহাড়ি গ্রাম সালদার জলধারা থেকে উৎপত্তি বলে এর নামকরণ করা হয়েছে হালদা।
মো. বেলায়েত হোসেন
প্রকাশ: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৮:৪৪
নদীর উৎপত্তিস্থল সাধারণত পাহাড়ি জলধারা যেমন– ঝরনা, ছড়া কিংবা হিমবাহ থেকে হয়ে থাকে। ঝিরি থেকে উৎপন্ন হয়ে পাহাড়ি বাঁকে বাঁকে বয়ে গেছে হালদা নদী। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খাগড়াছড়ি জেলার মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নে এর উৎপত্তিস্থল। পাহাড়ি গ্রাম সালদার জলধারা থেকে উৎপত্তি বলে এর নামকরণ করা হয়েছে হালদা। ১০৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের নদীটি ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজানের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম শহরের চান্দগাঁও-বাকলিয়া দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কালুরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
অন্যান্য নদী থেকে হালদা অনন্য। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র। বাংলাদেশে উৎপত্তি এবং বাংলাদেশে শেষ এ নদীতে জোয়ার-ভাটা হওয়ায় বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নদী এবং নদীর পানির এমন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে মাছ এখানে ডিম পাড়তে আসে; বৈশিষ্ট্যে বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। রুই জাতীয় মাছের ‘জিনগত প্যাটার্ন’ সম্পূর্ণ অবিকৃত থাকায় এটি বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে রুই জাতীয় (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিগনি) মাছের একমাত্র প্রজনন স্থান। এ নদীর মাছের নিষিক্ত ডিম অনেক উন্নত মানের হওয়ায় বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও প্রবল। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে হালদা শুধু প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্য নয়, এটি ইউনেস্কোর শর্ত অনুযায়ী বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের যোগ্যতাও রাখে।
দলিল-দস্তাবেজে এ নদীর উৎপত্তি মানিকছড়িতে বললেও অনেকের মুখে ভিন্ন কথা শোনা যায়। তাই এ রহস্য উদ্ঘাটনে কৌতূহলী মন নিয়ে হালদার উৎপত্তিস্থলে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা দীর্ঘদিনের। দুর্গম এলাকা হওয়ায় একা যাওয়ার বিষয়টি বলতে গেলে অসম্ভব। এ ছাড়া স্থানীয় একজন মানুষ সঙ্গে না থাকলে এ ধরনের দুর্গম ট্র্যাকিং মোটেই নিরাপদ নয়। অনেক আগে থেকে শুনে আসছি এ নদীর উৎপত্তিস্থল রামগড় উপজেলার পাতাছড়া ইউনিয়নের দুর্গম হাসুকপাড়া এলাকায়। রামগড় থেকে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় ছোট বেলছড়ি পাড়া কেন্দ্রের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। কেন্দ্রের পাশে দুটি বসতি রয়েছে। কুমার ত্রিপুরা এখানকার একজন। হালদা নদীর পাশের মানুষ। জীবন ও জীবিকার অংশ হওয়ায় তিনি পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এ নদী নিয়ে অনেক গল্প শুনেছেন। কথা হয় তাঁর সঙ্গে এ নদী নিয়ে। বেদনার সঙ্গে হালদার দুঃখ জানান। তাঁর ভাষায়, গাছ আর বন কেটে পাহাড় মরুভূমি বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।
সাধারণত গভীর শিকড় যেসব গাছের (বৈলাম, সিভিট, উদাল, চুন্দুল ইত্যাদি), সেগুলো বর্ষায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং নদীর উৎস ঝরনাও প্রাণবন্ত থাকে। শীত মৌসুমে এসব গাছের শিকড় থেকে পানি ঝরনায় আসে। এ পানি পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারীদের বেঁচে থাকার একমাত্র ভরসা। আবার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত, ইউক্যালিপটাসের মতো কিছু বিদেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে, যেগুলো শিকড়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত মাত্রায় পানি শুষে নেয়; যা পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। এমনিতেই পাহাড়ে ভয়াবহ পানি সংকট। তার মধ্যে এসব গাছ লাগানো কিংবা উৎসাহিত করা নিশ্চয় আত্মঘাতী। এর ফলে পাহাড়ের ঝরনা, ঝিরি এবং ছড়াগুলো দিনে দিনে প্রাণ হারাচ্ছে। জীবন সংকটে দুর্গম পাহাড়ে বসবাসকারী মানুষ, পরিবেশ ও প্রকৃতি।
পাহাড়ে গাছ কাটা, সনাতন পদ্ধতিতে জুম চাষ এবং কাসাভা চাষের ফলে মাটির উপরিভাগ উর্বর হয়ে যায়। পার্বত্য অঞ্চলে ব্যাপক হারে কাসাভা বা শিমুল আলুর চাষ হচ্ছে। প্রচুর শর্করাযুক্ত খাবার এটি। জানা যায়, এ অঞ্চলে বিস্কুট, কেক জাতীয় খাদ্য উৎপাদনের কয়েকটি কোম্পানি নিজেদের উদ্যোগে এবং কৃষকদের অগ্রিম অর্থ প্রদানের মাধ্যমে এ আলু চাষাবাদ করছে। সমস্যা অন্য জায়গায়। ফলন ভালো হওয়ায় বন উজাড় করে এর চাষাবাদ শুরু করে। এতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এ আলুর গাছগুলো যেমন বড়, তেমনি এর শিকড়ও অনেক গভীরে যায়। এতে এই কাসাভা উত্তোলনের ফলে মাটি উর্বর হয়ে যায়। প্রবল বৃষ্টিতে পাহাড়ের উর্বর মাটি পানির ঢলে নদীতে এসে এটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া শিকড় গভীরে যাওয়ায় কাসাভা প্রচুর পরিমাণে পানি শোষণ করে। এতে পাহাড়ে পানি সংকট দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে বৈজ্ঞানিকভাবে কাসাভা চাষে নিরুৎসাহিত করা হলেও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না।
যে ঝরনা থেকে এ নদীর উৎপত্তিস্থল, তার কোনো চিহ্ন নেই। রুই জাতীয় মাছ ছাড়াও বিভিন্ন জাতের প্রচুর মাছ পাওয়া যেত এ নদীতে। এ এলাকার আমিষের চাহিদার অন্যতম উৎস ছিল এটি। স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়, অতীতে নদী খননের নামে বরাদ্দ এনে কাজ করেনি। ফলে এটি উৎপত্তিস্থলে মৃতপ্রায়। প্রায় ২০ মিনিট হাঁটার পরে পৌঁছালাম রামগড় পাতাছড়া ইউনিয়নের হাসুকপাড়া এলাকায়। একটি ছোট দোকানে বসে আছেন ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর দুই নারী।
গিয়ে দেখা যায় জায়গাটিতে কেউ কেউ ছোট বাঁধ দিয়ে ব্যবহারের জন্য পানি সংরক্ষণ করেছে। গর্ত করা কুয়াও আছে। কুয়ায় সংরক্ষিত পানিতে একজন নারী পাতিল মাজছেন। জিজ্ঞেস করে জানা যায়, এ পানি তাদের প্রতিদিনের জীবন বাঁচানোর উৎস। আবার কেউ কেউ জায়গাটিতে ছোট ছোট খণ্ড করে তাতে ধান বুনেছেন। বীজতলা বানিয়েছেন। এর মূল কারণ হিসেবে জানা যায়, এ অঞ্চলের মানুষ অশিক্ষিত ও অসচেতন। যেখানে পেটে অন্ন জোগানো বড় দায় হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে শিক্ষা বিলাসিতার রূপকাঠি মাত্র। কৃষি তাদের একমাত্র পেশা। অনেকের জায়গা থাকলেও পানির অভাবে সঠিক সময়ে বীজ বুনতে পারেন না। যেহেতু এখানে কিছু পানি জমা থাকে, তাই অতি সহজে এ জায়গায় চাষাবাদ করা যায়।
আপাতপক্ষে দেখলে নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে শনাক্ত করতে কষ্ট হবে। এলাকার লোকজনের সহযোগিতা ছাড়া বাইরের কেউ সেভাবে চিনতে পারবে না। যে ঝরনা থেকে এ নদীর উৎপত্তি, একই ঝরনার বিপরীত পাশ থেকে সোনাই খালের উৎপত্তি। শ্রাবণ মাসেও ঝরনাটি প্রাণহীন। গাইড ঘুরে ঘুরে দেখাল, তবুও ঝোপঝাড়ের ভেতর শনাক্ত করা কষ্টসাধ্য।
গাইড নিঅংগ্য মার্মা জানান, সরকারিভাবে নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে বাটনাতলীর ছদুরখিলকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে একটি পিলার স্থাপন করা হয়েছে। এ স্থান অনেকটা দুর্গম হওয়ায় কর্তৃপক্ষের কেউ এখানে এসে পৌঁছাতে পারেন না। ছদুরখিলে বাটনাতলী কিংবা মানিকছড়ি থেকে খুব সহজে যোগাযোগ করা যায়। অন্যদিকে স্থানটি রামগড়ে হলেও উপজেলা সদর থেকে দুর্গম এলাকায়। ফলে মূল উৎপত্তিস্থলটি অন্ধকারেই রয়ে গেলে। মানুষ হালদা নদীর উৎপত্তি সম্পর্কে সঠিক ইতিহাস থেকে বঞ্চিত হলো। অবশ্য হালদার উৎপত্তিস্থল নিয়ে বিতর্ক নিরসনে ২০২০ সালে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্য়ায়ের একটি প্রতিনিধি দল হাসুকপাড়া পরিদর্শন করে এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করে। পরে এ নিয়ে অগ্রগতি আর জানা যায়নি। যেহেতু এ এলাকার মানুষের প্রধান পেশা কৃষি, তাই মানুষকে যদি অন্য কোনো পেশায় সম্পৃক্ত করা যায় এবং নদীর গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে তারা এ উৎপত্তিস্থল রক্ষায় সহযোগিতা করবে। এতে নদীর উৎসস্থল পুনরায় প্রাণবন্ত করা সম্ভব। এ ছাড়া সরকারিভাবে উৎপত্তির সঠিক জায়গা নির্ধারণপূর্বক তা খননের ব্যবস্থা করলে হালদা আবার প্রাণ ফিরে পাবে।
এরপর দাপ্তরিকভাবে হালদা নদীর উৎপত্তিস্থল হিসেবে গণ্য স্থানটি পরিদর্শনে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। দুপাশে পাহাড় আর মাঝখান দিয়ে নদীর গঠন থাকলেও প্রকৃতিক ঘাস জাতীয় বনে পরিপূর্ণ এটি। সামান্য পানি একপাশ দিয়ে ড্রেনের মতো স্থান দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আরও সামনে গিয়ে দেখা যায়, এখানে নদীর গঠন আরও স্পষ্ট এবং পানি প্রবাহিত হচ্ছে। হালদার সঙ্গে আরও একটি ছড়া যুক্ত হয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বেগবান করেছে কিছুটা। অতীতে হালদা খননের নামে একটি বড় ধরনের বরাদ্দ এসেছিল। তবে সে বরাদ্দ দিয়ে হালদার পরিবর্তে সালদা নামে ছড়া খনন করা হয়। কারণ সালদা ছড়াটিও মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নে অবস্থিত। কাজও পেয়েছেন এ এলাকার বাসিন্দা। অন্যদিকে হালদার উৎসস্থল রামগড় উপজেলার হাসুক পাড়ায়। যারা কাজ পেয়েছেন, সালদা ছড়া তাদের বাড়ির আশপাশে হওয়ায় ব্যক্তিগত সুবিধার্থে এটি খনন করা হয়। তারা হাসতে হাসতে মজার ছলে কথাগুলো বললেন এবং বয়ে চলা চিকন সালদা ছড়াটি দেখালেন।
সব শেষে ছদুরখিল অংশে দেখা যায়, এটি নতুন খনন করা। অতিবৃষ্টিতে খালের পার ভাঙছে। অন্যদিকে খনন করে যে মাটি পারে রাখা হয়েছে, তা বৃষ্টিতে এবং স্রোতে নদীতে চলে গেছে। এ মাটি প্রবল স্রোতে হালদা হয়ে কর্ণফুলী নদীতে চলে যাবে। ফলে নদীর গভীরতা হ্রাস পাবে। এতে পানির উচ্চতা হ্রাস পাবে এবং নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হবে। ফলে সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে হালদা নদীর এ অংশে পাঁচ কিলোমিটার খনন করল, তাতে কতটা সরকারের উদ্দেশ্য, জনসাধারণের কল্যাণ এবং ফলপ্রসূ হয়েছে– এ শিক্ষকসহ সুধীজন ভাবছেন। বিষয়টি দেখে মনে হয় ঋণগ্রস্ত পিতার অপাত্রে কন্যাদানে দায়মুক্ত হওয়ার পাঁয়তারা। যদিও সারাজীবন তার দায় গোচরে-অগোচরে পিতাকেই বহন করতে হয়।
মো. বেলায়েত হোসেন: তথ্য অফিসার, জেলা তথ্য অফিস, খাগড়াছড়ি
belayethussain42@gmail.com