জ্বালানি তেলের দাম এখনই কমানোর উপযুক্ত সময়
সমকাল সংলাপে বিশেষজ্ঞরা
মঙ্গলবার সমকাল কার্যালয়ে আয়োজিত 'বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও বাংলাদেশ' শীর্ষক সংলাপে অতিথি ও অংশগ্রহণকারীরা সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ | ১৩:৪৬
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম এখনই কমানোর উপযুক্ত সময়। এতে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে। পরে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশেও দাম বাড়ানো যেতে পারে। তখন সেটি সবাই মেনে নেবে। তাদের মতে, সরকারের কাজ দাম নিয়ন্ত্রণ করা, ব্যবসা করা নয়।
সমকাল আয়োজিত 'বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য ও বাংলাদেশ' শীর্ষক এক সংলাপ অনুষ্ঠানে বক্তারা এ কথা বলেন। মঙ্গলবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম বিভাগের
বিভাগীয় প্রধান ড. ম তামিম, ক্যাবের উপদেষ্টা শামসুল আলম, ঢাকা চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এনার্জিপ্যাকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আলোচনায় অংশ নেন। সমকালের নির্বাহী পরিচালক এস এম শাহাব উদ্দিন, সমকালের উপসম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন, সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত, সহযোগী সম্পাদক সবুজ ইউনুস, সমকালের জিএম (মার্কেটিং) আবুল খায়ের চৌধুরী, সমকালের বাণিজ্য সম্পাদক জাকির হোসেন, সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বক্তারা বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমানো বা বাড়ানোর বিষযটির নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকবে, নাকি এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হাতে থাকবে সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তারা বলেন, জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে এখন বৈষম্য আছে। এই বৈষম্য দূর করতে হবে। যৌক্তিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই দুই খাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
অধ্যাপক ম তামিম বলেন, সামগ্রিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর এখনই ভালো সময়। এখন দাম কমালে সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আসবে। পরে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে তখন আবার বাড়ানো যাবে। তিনি বলেন, অকটেন ও পেট্রোল সব সময় আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যে বিক্রি হওয়া উচিত। কারণ এ তেলটি ব্যবহার করে মধ্যবিত্ত। যাদের ব্যক্তিগত গাড়ি আছে। ফার্নেসের দামও কমিয়ে দেওয়া উচিত। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমে যাবে। তবে ডিজেলের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে। কারণ ডিজেল সাধারণ মানুষ ব্যবহার করে। দাম কমালে ভোক্তা সুবিধাটা পাবে কি-না তা বিবেচনায় আনতে হবে। পরিবহন ভাড়াসহ অন্যান্য খাতে সাধারণ মানুষের যাতে ব্যয় কমে সে ব্যবস্থা সরকারকে নিতে হবে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম অবশ্যই বিশ্ববাজার মূল্যের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত। বেসরকারিভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গড়ে প্রতি ইউনিট ছয় টাকা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর খরচ পড়ছে ১২ থেকে ১৪ টাকা। এর কারণ বেসরকারি খাতে তেল আমদানিতে কোনো শুল্ক দেওয়া লাগে না। সরকারি খাতে আমদানি করতে বিভিন্ন শুল্ক দেওয়া লাগে।
ম তামিম বলেন, সরকারের সন্দেহ, জ্বালানি তেলের দাম কমালে তার সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না। যেমন পরিবহন মালিকরা ভাড়া কমাবেন না। অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের ওপর সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটি সরকারের সীমাবদ্ধতা। বাজার নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের।
তিনি বলেন, দাম না কমানোর জন্য সরকার এখন যুক্তি দিচ্ছে বিপিসির পুঞ্জীভূত ঋণ রয়েছে কোটি কোটি টাকা। এত যদি ঋণ থাকে তবে কেন বাজেটে ভর্কুকি শব্দ ব্যবহার করা হয়। ভর্তুকি আর ঋণ, এক নয়। তিনি বলেন, বিপিসিকে এতদিন ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। ভর্তুকি কখনও লোকসান হতে পারে না। আগে বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির জন্য যে টাকা প্রয়োজন হয়েছে তা সরকার ভর্তুকি হিসেবেই দিয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখন ৩০ ডলারের নিচে। ভারতের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের জন্য একটি ফর্মুলা করা যেতে পারে।
শামসুল আলম বলেন, বিপিসির আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার প্রয়োজন। বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তেল আমদানির জন্য যে সুযোগ পাচ্ছে সরকারি কোম্পানিগুলো তা পাচ্ছে না। এতে বাজারে বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এই বৈষম্য চলতে থাকলে সরকারি খাত একেবারে শেষ হয়ে যাবে। সুষম প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বেসরকারি ও সরকারি খাতকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে তেলের দাম না কমিয়ে বিদ্যুতের দাম কমিয়ে দিতে পারে। তেল বিক্রির লাভের টাকা দিয়ে বিশেষ বিশেষ শিল্পে জ্বালানি তেল আমদানি করতে ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে। তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা বিইআরসির কাছে পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভোক্তাদের কথা ভেবে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা উচিত। তেলের বর্তমান বাজার দাম বেশ কয়েক বছর স্থির থাকতে পারে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা। এ অবস্থায় তেলের দাম কমানো ভালো হবে। এখন জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার জন্য স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি আছে। জ্বালানি তেলের দাম কমালে বিনিয়োগ, রফতানিসহ অর্থনীতির প্রায় সকল ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেন।
হুমায়ুন রশীদ বলেন, জ্বালানি তেলের মান নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মান নিয়ন্ত্রণ না হলে শিল্প সমস্যায় পড়বে। বাজারে যদি প্রতিযোগিতা থাকে তবে নিরাপত্তা এবং মান দুটোই নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি দিতে হবে। এখনও অনেক স্থানে দিনে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এটা তো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি হতে পারে না। বিনিয়োগের পূর্বশর্তই হচ্ছে নির্ভরযোগ্য মানসম্মত জ্বালানি সরবরাহ। তিনি বলেন, সরকারের কাজ ব্যবসা করা নয়। কিন্তু সরকার তাই করছে। বেসরকারিভাবে তেল আমদানির সুযোগ অবারিত হলে বাজারে তেলের দাম এমনিতেই কমে যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।