নতুন মাইলফলকে পৌঁছাল উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থ ছাড়। গত ২০২১-২২ অর্থবছর বিদেশি ঋণ ও অনুদান প্রথমবারের মতো ১০ বিলিয়ন বা এক হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশকে ৭ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন বা ৭৯৬ কোটি ডলারের ঋণ ও অনুদান দিয়েছিল উন্নয়ন সহযোগীরা। গতকাল বুধবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইআরডির ফরেন এইড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস (ফাবা) উইংয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, কভিডের পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন সহযোগীরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ছাড় করেছে। পাশাপাশি বড় উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ছাড় বেড়েছে। অন্য অনেক প্রকল্পেও ভালো অর্থ এসেছে। সব মিলিয়ে নানা কারণে আগের তুলনায় বেড়েছে অর্থ ছাড়। চলমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে এটি দেশের জন্য ইতিবাচক একটি দিক।
বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিয়ে থাকে সরকার। অভ্যন্তরীণভাবে প্রধানত ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়া হয়। আর বৈদেশিক উৎস থেকে বহুপক্ষীয় ও দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেয় সরকার। বিদেশি সংস্থা ও দেশগুলো কিছু অনুদানও দেয়।
অর্থ মন্ত্রণালয় প্রকাশিত মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিৃবতিতে দেয়া তথ্য অনুসারে, ঘাটতি অর্থায়নের গড়ে ২৬ শতাংশ আসে বৈদেশিক উৎস থেকে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও কর্মসূচির জন্য এবং বাজেট সহায়তা হিসেবে এই অর্থ দিয়ে থাকে উন্নয়ন সহযোগীরা।

ইআরডির তথ্য বিশ্নেষণে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে আসা অর্থের মধ্যে ৯৮১ কোটি ডলারের বেশি ঋণ। আর বাকিটা অনুদান। সবচেয়ে বেশি অর্থ ছাড় করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রায় ২৫৭ কোটি ডলার দিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩১ কোটি ডলারের মতো ছাড় করে এডিবি।

গত অর্থবছরে অর্থ ছাড়ে দ্বিতীয় অবস্থানে জাপান। ২২১ কোটি ডলারের মতো দিয়েছে দেশটি। তৃতীয় অবস্থানে আছে আইডিএ। তবে গত অর্থবছরে সংস্থাটির অর্থ ছাড় আগের অর্থবছরের তুলনায় কমে গেছে। সফট লোন উইনডো নামে পরিচিত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংস্থাটি গত অর্থবছর দিয়েছে ১৬৭ কোটি ডলার। তার আগের অর্থবছরে সংস্থাটি ছাড় করেছিল ১৮২ কোটি ডলারের মতো।

গত অর্থবছরে অর্থ ছাড়ে চতুর্থ অবস্থানে আছে রাশিয়া। দেশটি ১২২ কোটি ডলারের বেশি দিয়েছে। এর পরের অবস্থানে থাকা চীন দিয়েছে ১০০ কোটি ডলারের বেশি। এ ছাড়া এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (এআইআইবি) প্রায় ৩০ কোটি ডলার ও ভারত ৩২ কোটি ডলারের মতো ছাড় করেছে। অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে এসেছে ৭১ কোটি ডলারের মতো।

তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কমে গেছে। ৮২০ কোটি ডলারের কিছু বেশি ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি এসেছে গত অর্থবছর, যা তার আগের অর্থবছরে ছিল ৯৪৪ কোটি ডলার। এদিকে, গত অর্থবছরে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধে ব্যয় ২০১ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। আগের অর্থবছরে যা ছিল ১৯১ কোটি ডলার।

বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই স্বল্প সুদহারে নমনীয় শর্তে বৈদেশিক ঋণের সুবিধা পেয়ে আসছিল। তবে ২০১৫ সালে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পর বাংলাদেশ 'ব্লেন্ডেড' শর্তে বেশিরভাগ ঋণ গ্রহণ করছে। এতে ঋণের সুদহার ও অন্যান্য শর্ত নমনীয় ঋণের চেয়ে কিছুটা বেশি। ফলে বৈদেশিক ঋণের ব্যয় গত কয়েক বছরে কিছুটা বেড়েছে।

মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণের গড় অন্তর্নিহিত সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ, যা গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১ দশমিক ১ শতাংশ। তারপরও অভ্যন্তরীণ ঋণের তুলনায় বৈদেশিক অর্থায়নে খরচ কম হওয়ায় মধ্যমেয়াদে ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক অর্থের পরিমাণ বাড়াতে চাইছে সরকার। আগামী ২০২৪-২৫ অর্থবছর নগাদ মোট ঘাটতি অর্থায়নের ৪৫ শতাংশ বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বাকি ৫৫ শতাংশ পূরণ হবে অভ্যন্তরীণ ঋণ থেকে।