মিয়ানমারের দায়, গাম্বিয়ার দাওয়াই, বাংলাদেশের দায়িত্ব

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শেখ রোকন

দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে, আগস্টের শেষ সপ্তাহ যদি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রদোষকাল হয়, তাহলে চলতি নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ তাদের জন্য হতে পারে ঊষাকাল। রোহিঙ্গাদের জীবনে রাঙা প্রভাত অবিলম্বে আসবে কিনা জানা নেই, কিন্তু পুবের আকাশে যেন খানিকটা আলোর ঝিলিক। এই সপ্তাহে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অন্তত চারটি উদ্যোগ দেখা গেছে, যেগুলো রাখাইনের নিপীড়িত নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে আশার আলো দেখাতেই পারে।

গত সোমবার, ১১ নভেম্বর ২০১৯, আফ্রিকার অন্যতম ক্ষুদ্রতম দেশ গাম্বিয়া জাতিসংঘ পরিচালিত সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইজেএস) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ ও গোটা সম্প্রদায়কে নিশানা করে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালানোর অভিযোগ করে। এর দু'দিনের মাথায় বুধবার কিছু মানবাধিকার গোষ্ঠী আর্জেন্টিনার একটি আদালতে মিয়ানমারের খোদ নেতা অং সান সু চি ও দেশটির কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সামরিক-বেসামরিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। পরদিন, বৃহস্পতিবার, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট (আইসিসি) মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত অপরাধের পূর্ণ তদন্তে ওই আদালতের প্রধান তদন্ত কর্মকর্তাকে সবুজ সংকেত দেয়। একই দিনে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের 'থার্ড কমিটি' মিয়ানমারের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করে। এই কমিটির প্রস্তাব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর চাপ বৃদ্ধি করবে। মূলত চীন ও রাশিয়ার বিরোধিতার কারণে নিরাপত্তা পরিষদ এখনও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

লক্ষণীয়ভাবে ইহুদিবাদী সংবাদমাধ্যম 'জুয়িশ ওয়ার্ল্ড ওয়াচ' এই সময়কে আখ্যা দিয়েছে 'রোহিঙ্গাদের জন্য বড় সপ্তাহ' হিসেবে। সবধরনের গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এই সংবাদমাধ্যমকে রোহিঙ্গাদের ওপর পরিচালিত 'গণহত্যা' বিশেষভাবে আকর্ষণ করে থাকতে পারে। মত-পথ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে; কিন্তু তাদের ভাষ্য নিঃসন্দেহে আমলযোগ্য। একই আভাস আমরা দেখি মিয়ানমারের বহুল প্রচারিত সংবাদমাধ্যম ইরাবতীতেও। মিয়ানমার সরকারের মুখপাত্র উ জ্য তাইকে উদ্ধৃত করে ইরাবতী বলছে, এক সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার ও তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে 'ধারাবাহিক' অভিযোগ দেশটির ভাবমূর্তি 'আন্তর্জাতিকভাবে নিদারুণ ক্ষতিগ্রস্ত' করেছে। মিয়ানমারের যদি আদৌ 'ভাবমূর্তি' থাকে এবং তা আদতেই কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা সেই ক্ষতি দেশটি কতটা পরোয়া করে, তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, রোহিঙ্গা সংকটের দায় এড়াতে মুখরক্ষার মতো অজুহাতও আর তাদের হাতে নেই।

মিয়ানমারের দায়

রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের দায় ত্রিবিধ, রাষ্ট্রীয়ভাবেই। প্রথমত, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কেবল সংখ্যালঘু হিসেবে বিভিন্ন চাপের মুখে নয়, ১৯৮২ সালের সংবিধানে তাদের নাগরিকত্ব খারিজ করে দিয়ে রাষ্ট্রহীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা হয়। দ্বিতীয়ত, নানা ছুতা ও বাহানা সৃষ্টি করে দফায় দফায় তাদের ওপর নির্যাতন ও নিপীড়ন চালিয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে কিংবা উগ্রবাদী সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীকে দিয়ে পরোক্ষভাবে তাদের হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ, ভিটামাটি ছিনতাই চালিয়ে গেছে। তৃতীয়ত, যখনই রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন ও প্রত্যাবাসনের কথা উঠেছে, দেশটি প্রতিবারই অভূতপূর্ব টালবাহানা করেছে। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে কেবল নয়, মিয়ানমারের সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে এই সংকটের সমাধানে সর্বোচ্চ সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। মিয়ানমার সেই সদিচ্ছার সামান্য মূল্যও দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

দৃশ্যত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আপত্তি উপেক্ষা করেই ২০১৭ সালের নভেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেছিল বাংলাদেশ। এই চুক্তির পেছনে ছিল মূলত চীন। ওই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন শুরু হওয়ার কথা ছিল গত বছরের নভেম্বর থেকে। সেই প্রক্রিয়া আর অগ্রসর হয়নি মূলত মিয়ানমারের দায়সারা সাড়া এবং রাখাইনের পরিস্থিতি উন্নয়নে আন্তরিক না হওয়ার কারণে। এই অঞ্চলে চীন ও ভারত বাংলাদেশের 'বন্ধু' এবং পরস্পরের 'বৈরী' হলেও দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা মিয়ানমারে গিয়ে এক পাতেই খায়। প্রশ্ন হচ্ছে, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অন্যায্য অবস্থান যখন গোটা দুনিয়ার কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট, তখন বেইজিং বা দিল্লির ছাতা কতদিন ছায়া দেবে? একটি জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার দায় কতদিন এড়িয়ে চলবে? একযোগে চার দিক থেকে চাপ কি সেই শেষের শুরু?

গাম্বিয়ার দাওয়াই

মিয়ানমারের ঘি যে সোজা আঙুলে উঠবে না, সেই বাস্তবতা সবার আগে বাংলাদেশের বোঝার কথা ছিল। বুঝতে বুঝতে যথারীতি দেরি করেছে। এই সেপ্টেম্বরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাওয়ার 'পরিকল্পনা' করছে। সেপ্টেম্বরের পর অক্টোবর গেছে, নভেম্বরেও কোনো সাড়াশব্দ ছিল না। তার আগে গাম্বিয়া অভিযোগ জানিয়ে দিল। গাম্বিয়া মানে শুধু গাম্বিয়া নয়। নথিপত্র দেখে যা বোঝা যাচ্ছে, দেশটি অভিযোগ করেছে ৫৭ মুসলিম দেশের সংগঠন ওআইসির পক্ষে। সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদসহ মুসলিম বিশ্বের নেতারা রোহিঙ্গা প্রশ্নে যেসব কড়া বার্তা দিয়ে আসছিলেন, তাতে করে ওআইসির এমন ভূমিকার খবর আঁচ করা যাচ্ছিল বটে।

গাম্বিয়ার পক্ষে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার একটি কৌতুককর দিক রয়েছে। মিয়ানমার বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গে তার সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি দেখিয়ে এসেছে। গাম্বিয়া সেদিক থেকে নগণ্যই বটে। বাংলাদেশের আয়তনের ১৪ ভাগের এক ভাগ, জনসংখ্যায়ও প্রায় শতভাগের এক ভাগ। সেই দেশই যেন মিয়ানমারের বিচারের জন্য 'হুইসেলব্লোয়ার' হয়ে দাঁড়াল!

গাম্বিয়ার মামলার পেছনে যে কেবল ওআইসি, সেটা ভাবলে ভুল হবে। ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে যদিও 'মাস মার্ডার' বলা হয়েছে, সেটা বাংলায় যদিও 'গণহত্যা' বলা যায়, আদতে 'জেনোসাইড' নয়। ওই আদালতের গণহত্যা বিচারের এখতিয়ারও নেই। তাই দুই দিন পরেই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত থেকে পূর্ণ তদন্তের সংকেত। আইসিসি আসলে গণহত্যার বিচারের জন্যই বিশেষভাবে খ্যাতিমান। আইসিজের মামলা এবং আইসিসির তদন্ত মিয়ানমারের জন্য বেকায়দা তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। নিরাপত্তা পরিষদে চীন ও রাশিয়ার চাপ কমাতে পাল্টা চাপ হিসেবে কাজ করতে পারে সাধারণ পরিষদের 'থার্ড কমিটি' প্রস্তাব।

নদীর নামে এবং নদীর অববাহিকার মাপে মানচিত্রের এই দেশটির প্রতি আমার মতো অনেকের ভালোবাসা আগে থেকেই ছিল। রোহিঙ্গা ইস্যুতে গাম্বিয়া এখন আপামর বাংলাদেশির ভালোবাসা পেতে থাকবে। কিছুটা ঝুঁকিও আছে, স্বীকার করতে হবে। ওআইসির পক্ষেই যদি মামলা করতে হয়, আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে সেটা করা উচিত ছিল গাম্বিয়ার বদলে সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী কোনো মুসলিম দেশের পক্ষে। তাতে করে চীন-রাশিয়ার মতো দেশগুলোর চাপ এড়ানো সহজ হতো। আরও ভালো হতো রোহিঙ্গা সংকটে সরাসরি আক্রান্ত বাংলাদেশের পক্ষেই মামলাটি করলে। কিন্তু, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে!

বাংলাদেশের দায়িত্ব

কেবল এই দফার রোহিঙ্গা বিতাড়ন পর্বে নয়, আশির দশক থেকেই টালবাহানা করে আসছে দেশটি। মনে আছে, একবার মিয়ানমারের এক মেজমন্ত্রী ঢাকায় এ-সংক্রান্ত আলোচনায় এসে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় 'ভূতের ভয়' পেয়ে গোটা পরিবেশই নষ্ট করে দিয়েছিল। এবারও বুঝতে বুঝতে দেরি করে ফেলেছিল ঢাকা। সাম্প্রতিক সময়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলতে শুরু করেছিলেন যে, মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি রাখছে না। অতীতের ঘটনাবলি দেখে কি করে মনে হয় যে, প্রতিশ্রুতি রাখার কথা ছিল?

আন্তর্জাতিক এই 'ধারাবাহিক' ও সামষ্টিক পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশের ভূমিকা আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি যদি কোনো পরিণতির দিকে নিতে হয়, তাহলে আগামী দিনগুলোতে ঢাকার চাকা দেখেশুনে ঘোরাতে হবে। আমাদের দিক থেকে আবেদন ও ভারতের দিক থেকে আশ্বাস অনেকবারই এসেছে। বাস্তবে নয়াদিল্লি রোহিঙ্গা ইস্যুতে কী করতে পারে বা করতে চায়, তাও কয়েকবার দেখা শেষ। চীনও শেষ পর্যন্ত যে মিয়ানমারেরই গা ঘেঁষে দাঁড়াবে, সেটা মোটামুটি প্রমাণিত। এখন গাম্বিয়া যাতে কোনো চাপের মুখে না পড়ে, পড়লেও ওআইসির প্রভাবশালী দেশগুলো পাশে থাকে; সেই দূতিয়ালি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক দুই আদালতকে তথ্য, উপাত্ত, নথি দিয়ে সহায়তা করতে হবে তো বটেই; প্রয়োজনে সরাসরি পক্ষ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনজীবীও নিয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে গাঁটের পয়সা খরচ করে। এতেও যদি মিয়ানমারের শিক্ষা হয় এবং রোহিঙ্গা বোঝা আমাদের কাঁধ থেকে নেমে যায়- তাতেই মঙ্গল। পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় প্রত্যাবর্তনের পথ তো খোলা রইলই! আন্তর্জাতিক চাপ আরও প্রখর হওয়ার আগেই মিয়ানমারের সংবিৎ ফিরলে মন্দ কী?

লেখক ও গবেষক
[email protected]