সড়ক দুর্ঘটনা

অপ্রতিরোধ্য মৃত্যুফাঁদ!

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

রোববার সমকালসহ অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ- শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০ জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ ঘণ্টায় ২৩টি প্রাণ ঝরে গেছে। করোনা দুর্যোগে এক দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় এত প্রাণহানির সংবাদ মর্মন্তুদত্তায় ভিন্নমাত্রা সংযোজন করেছে। প্রত্যেক ঘটনায়ই সেই পুরোনো কারণই দুর্ঘটনার মুখ্য বিষয় হিসেবে প্রতীয়মান হয়। ময়মনসিংহ, চুয়াডাঙ্গা, বগুড়া, পীরগঞ্জ ও অন্যান্য স্থানে এসব দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে দেখা গেছে- চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক আইন অমান্য করাই মূখ্যত দায়ী। সড়ক-মহাসড়ক যেন মৃত্যুফাঁদ। কোনো কিছুতেই এর রাশ টানা যাচ্ছে না, উপরন্তু দিন দিন বেড়েই চলেছে। করোনা মহামারিকালে এই মর্মন্তুদ ঘটনাগুলো যেন আরেক 'মহামারি' আকার ধারণ করেছে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি ঘটনা ঘটছে। প্রায় প্রতিদিন সংবাদ মাধ্যমে উঠে আসছে মর্মন্তুদতার এই ভয়াবহ চিত্র।
আমরা জানি, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু শুধু একটি পরিবারে গভীর শোক, ক্ষত সৃষ্টি করে না, আর্থিক পঙ্গুত্বও বরণ করে। গত বছরের শেষ দিকে এক সমীক্ষায় প্রকাশ- বিগত ১৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৫৫ হাজার মানুষ। আর দুর্ঘটনাজনিত মামলা হয়েছে ৭৭ হাজার। এরপর এতদিনে এই সংখ্যাটি আরও স্টম্ফীত হয়েছে। তাতে সন্দেহ কী? আর এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, সড়ক দুর্ঘটনার ফলে বছরে গড়ে বাংলাদেশের জিডিপির শতকরা দেড় ভাগ নষ্ট হয়, যার পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের অন্যতম জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। আমাদের স্মরণে আছে, নিকট অতীতে ঢাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী প্রাণ হারানোর পর দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। জনমনে আশার সঞ্চার ঘটেছিল যে, সড়ক-মহাসড়ক মৃত্যুফাঁদমুক্ত হবে। কিন্তু করোনা দুর্যোগে বিপর্যস্ত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতেও সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা ফের এই প্রশ্নই দাঁড় করিয়েছে- এ পথ কি এমন বিপদসংকুলই থেকে যাবে? নিরাপদ সড়কে মহাসড়ক গড়ে তোলা কিংবা দুর্ঘটনার হার কমিয়ে আনা কি এতই দুরূহ? লক্ষণীয় যে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে দেশব্যাপী যানবাহন চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হলেও লকডাউনের এক মাসে দুই শতাধিক সড়ক দুর্ঘটনায় অনেক হতাহতের মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটেছে। ক্রমবর্ধমান সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো অচিহ্নিত নয়; কিন্তু তার পরও এই মরণফাঁদ বন্ধ করা যাচ্ছে না! প্রায় প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত যেসব চিত্র উঠে আসছে তাতে যেকোনো শুভবোধসম্পন্ন মানুষের উদ্বিগ্ন না হয়ে উপায় নেই। ত্রুটিপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও এর জন্য কম দায়ী নয়। সড়ক-মহাসড়কে অনেক নিয়ম-বহির্ভূত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহন চলাচলও ক্রমবর্ধমান মর্মন্তুদতার আরও একটি কারণ।
সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেসব বিষয় অন্যতম অন্তরায়, সেগুলো দূর করার দায় যাদের, তাদের নির্বিকার কিংবা উদাসীনতা ও দায়িত্বহীনতারও নেই কোনো দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকার। আমাদের সড়ক যোগাযোগ অনেক বিস্তৃত হয়েছে, কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও সত্য- এক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতাও বেড়েছে। তবে এ কথাই চূড়ান্ত যে, অব্যাহত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যা-ই দায়ী হোক না কেন এর প্রতিরোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা সরকারকেই চালাতে হবে। আমাদের স্মরণে আছে- প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিকট অতীতে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিলেন সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভগকে। গাড়িচালক ও সহকারীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পাশাপাশি দূরপাল্লার যানবাহনে বিকল্প চালক রাখার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। সড়ক-মহাসড়কের পাশে বিশ্রামাগার গড়ার পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন অপসারণের কথাও বলেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি কতদূর আমাদের জানা নেই। আমরা সড়ক নিরাপত্তায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দেখতে চাই। আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি পরিবহন সংশ্নিষ্ট সবার উপলব্ধিতে আনতেই হবে। আমরা মনে করি, সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সবাই এক্ষেত্রে নিষ্ঠ হলে এই মর্মান্তিকতার হার কমিয়ে আনা মোটেও দুরূহ নয়। সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের যথাযথ আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল প্রত্যেকটি বিভাগের অসাধুদেরও চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।