করোনা-দুর্যোগ
সংক্রমণ ঠেকাতে জরুরি সর্বাত্মক পদক্ষেপ
ডা. মুশতাক হোসেন
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২১ | ১২:০০
আমাদের সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই স্বস্তির জায়গায় চলে এসেছিল। কিন্তু এখন সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে সংক্রমণ ও মৃত্যুহার ঊর্ধ্বমুখী। সাতক্ষীরা, নওগাঁ, নাটোর, যশোর, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, খুলনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নতুন করে কিছু ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করে। কিন্তু এর পরও সংক্রমণের বিস্তার ঠেকানো যাচ্ছে না। ঢাকায়ও এক সপ্তাহে রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। গত মাসে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে করোনা সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার ফলে আমাদের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো নিয়ে আশঙ্কা বাড়ছিল। আমরা তখনই উদ্বিগ্ন ছিলাম ভারতে সংক্রমণ বৃদ্ধির ঢেউ আমাদের দিকে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। গত মাসের দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০টিরও বেশি জেলায় নতুন রোগী বাড়ার হার কোথাও শতভাগ, কোথাও এরও বেশি।
সীমান্তবর্তী জেলায় শনাক্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা জরুরি হয়ে পড়েছে বাস্তবতার নিরিখে। জানা উৎস থেকে অর্থাৎ শনাক্তকরণের মধ্য দিয়ে যেসব রোগীর সন্ধান মিলছে, তাদের চিকিৎসার পরিসর বাড়াতে ফিল্ড হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ফের সামনে এসেছে। এ ব্যাপারে আমাদের আগের যেসব পরিকল্পনা ছিল তা নিয়ে ভাবতে হবে। ফিল্ড হাসপাতালের মাধ্যমে যেমন চিকিৎসা দেওয়া সহজ হবে, তেমনি আইসোলেশন ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা যাবে। একই সঙ্গে বাড়াতে হবে পরীক্ষাও। অনেকেই রয়ে গেছেন কিংবা যাচ্ছেন চিকিৎসা পরামর্শের বাইরে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তির সচেতনতা-সতর্কতার ক্ষেত্রে বরাবরই যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যাদের হাসপাতালে যেতে হচ্ছে না, তাদের সরাসরি চিকিৎসা পরামর্শের আওতায় আনতেই হবে। ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা কোনোভাবেই আমলযোগ্য নয়। সংক্রমণ ঠেকানোর সব উপায় নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। আবারও বলি, আইসোলেশন ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা শনাক্ত হচ্ছেন তাদের কারও কারও বাড়িতে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়ার খবরটি স্বস্তির নয়। এর ফলে একদিকে ভীতির সঞ্চার হবে, অন্যদিকে সামাজিক নেতিবাচক প্রভাবও পড়বে। অন্য কোনোভাবে আক্রান্ত ব্যক্তি বা পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে কোনোরকম ভীতি না ছড়ায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে সামাজিক শক্তির সহযোগিতা দরকার।
সংক্রমণের প্রত্যক্ষ উৎস থেকে প্রতিরক্ষা কিংবা সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সবার দায়িত্ববোধ জরুরি। অজানা উৎস থেকে সংক্রমণ ঠেকাতে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিকল্প নেই। স্বাস্থ্যবিধির লঙ্ঘন ঘটছে বিধায়ই সংক্রমণের ফের বিস্ম্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। মাস্ক ব্যবহারে এখনও অনেকের অনীহার বিষয়টি বিস্মিত করে। যারা সীমান্ত অতিক্রম করে এসেছেন, তাদের বিশেষ তদারকি অত্যন্ত জরুরি। তাদের কোয়ারেন্টাইন ও পরীক্ষা এবং একই সঙ্গে নিয়মের যাতে কোনো ব্যত্যয় না ঘটে সে ক্ষেত্রে নজর বাড়াতে হবে। আমরা দেখছি, অধিক আক্রান্ত সীমান্তবর্তী কোনো জেলায় সংক্রমণের হার একটু কমছে কিন্তু পার্শ্ববর্তী জেলায় আবার বেড়ে যাচ্ছে। চলাচল বা যাতায়াতে নিয়মবিধির যথাযথ অনুসরণ না করার এ হলো বিরূপ ফল। তাই বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ব্যবস্থা নিতে হবে রিংয়ের মতো করে। ১৪ দিন লকডাউন ঘোষণাই যথেষ্ট নয়, এর বাস্তবায়নই হলো মূল কথা। অধিক সংক্রমিত অঞ্চল বা এলাকায় লকডাউন পুরোপুরি কার্যকরের লক্ষ্যে সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো রকম ঝুঁকি নেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে নিকট অতীতে আমরা লকডাউন যথাযথভাবে কার্যকরের সুফল পেয়েছিলাম। এটি আমাদের সামনে দৃষ্টান্ত।
যেসব জেলায় সংক্রমণের হার এখনও অধিক কিংবা বাড়তির দিকে, সেসব জেলার ক্ষেত্রে সংক্রমণের বিস্তার ঠেকাতে অধিকতর কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে। করোনা মহামারি কিংবা চলমান দুর্যোগে এলাকাভিত্তিক বিধিনিষেধ পরিস্থিতি বিবেচনায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে অতি সংক্রামক এই ব্যাধির বিস্তার ঠেকানোর দিকে মনোযোগ আরও নিবিড় করতে হবে। এই আলোকে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের দিকে বাড়তি নজর দরকার। সবাই এখন করোনার সংক্রমণ রোধে করণীয় কী তা জানেন, কিন্তু অনেকেই মানেন না। যারা মানেন না তারা সমগ্র সমাজে ঝুঁকির মাত্রা বাড়াচ্ছেন। সীমান্তে নজরদারি ও সতর্কতামূলক সব ব্যবস্থা নিশ্চিত করার তাগিদ বরাবরই দেওয়া হচ্ছে। অবস্থার যেহেতু অবনতি ঘটছে, সেহেতু কোনো ক্ষেত্রেই ঢিলেঢালার অবকাশ আর নেই। এখন সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি শুধু সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেই সীমাবদ্ধ নয়। উচ্চ ঝুঁকির ক্যাটাগরি নির্ণয় করা হয়েছে। দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জেলা করোনা সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়িয়েও সুফল মিলবে না যদি সংক্রমণ রোধ করা না যায়।
সংক্রমণ রোধে সাধারণ মানুষের দায়দায়িত্বও কম নয়। ব্যক্তি সুরক্ষিত থাকলে সমাজও সুরক্ষিত থাকবে। ব্যক্তির ভুল বা উদাসীনতার মাশুল গুনতে হয়েছে, হচ্ছে সমাজের অন্যদের। আমরা বারবারই বলছি, ভয় বা আতঙ্ক নয়; জরুরি হলো সচেতনতা-সতর্কতা। করোনা প্রতিরোধের পন্থাগুলো যেহেতু এখন কমবেশি সবারই জানা, সেহেতু এর অনুসরণে কোনোরকম গাফিলতি নিজের পরিবার তো বটেই, সমাজের অন্যদের জন্য তা অধিকতর বিপজ্জনক হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, আমাদের দেশের মানুষ ভ্যাকসিনবান্ধব। প্রতিদিন আড়াই লাখ ভ্যাকসিন প্রদানের সক্ষমতা আমাদের রয়েছে। চাহিদার নিরিখে ভ্যাকসিন সংগ্রহে সব উৎসের সঙ্গেই সংগ্রহ কিংবা প্রাপ্তির প্রক্রিয়া গতিশীল করাও অতি জরুরি। ভ্যাকসিনের আওতায় সবাইকে নিয়ে আসতেই হবে। দেশেও যাতে ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয় সেই লক্ষ্যে জোরদার প্রচেষ্টা দরকার। এসব ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই এগিয়েছি। তবে এখনও যে প্রতিবন্ধকতা-প্রতিকূলতা রয়েছে তা দূর করতে সময়ক্ষেপণ বাঞ্ছনীয় নয়। আমাদের সক্ষমতা যেন আমরা জরুরি ভিত্তিতে কাজে লাগাতে পারি, এই প্রচেষ্টা নিবিড় করা চাই।
ভ্যাকসিন প্রদানে যে টার্গেট আমরা নির্ধারণ করেছিলাম, এখন পরিস্থিতি বিবেচনায় তা দ্বিগুণ করা দরকার। ১৯ জুন থেকে ফের গণটিকাদানের পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য দরকার পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের মজুদ ও প্রদান ব্যবস্থার পরিসর আরও বিস্তৃত করা। মূল কথা হলো, যারা এরই মধ্যে সংক্রমিত হয়েছেন তাদের চিকিৎসার পাশাপাশি নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধে সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া। সীমান্তবর্তী কোনো কোনো জেলায় স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে ভ্রাম্যমাণ পরীক্ষার বিষয়টি প্রশংসনীয়। জানা-অজানা সব উৎসের দিকেই সতর্ক দৃষ্টির বিকল্প নেই সংক্রমণ রোধ করতে। এক কথায়, সংক্রমণের বিস্তার যাতে কোনোভাবেই না ঘটতে পারে লক্ষ্য হতে হবে তা। টেলিমেডিসিন সেবা নিতে অনেকের মধ্যে নতুন করে যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে তাও আশাব্যঞ্জক। করোনা আক্রান্ত যে বা যারা বাড়িতে থেকে স্বাস্থ্যসেবা নেবেন তাদের জন্য টেলিমেডিসিন সেবা উত্তম। মানুষের মধ্যে এভাবেই সচেতনতা বাড়াতে হবে। সচেতনতা-সতর্কতাই এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে মুক্তির অন্যতম পথ।
ইতোমধ্যে হাসপাতালে শয্যা, আইসিইউ ও অক্সিজেন সরবরাহও বেড়েছে। কিন্তু সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি যদি রোধ করা না যায়, তাহলে সংগতই এসব কিছুরই ফের অপ্রতুলতা দেখা দেবে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আগেই সর্বাত্মক ও বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। তিন সপ্তাহ ধরে রোগী শনাক্তের হার কেন ঊর্ধ্বমুখী এর কারণগুলো অচিহ্নিত নয়। যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার তুলনামূলক কম, সেসব এলাকা আগে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে পারলে সংক্রমণ ছড়ানোর পথ অনেকটা রুদ্ধ করা যাবে। আমাদের দেশে প্রথম ঢেউ স্ম্ফীত হয়ে উঠেছিল ইতালিসহ আক্রান্ত কয়েকটি দেশ থেকে প্রত্যাগতদের কারণে। শঙ্কা হচ্ছে সংক্রমণের বিস্তার; লক্ষ্য হোক প্রতিরোধমূলক সব ব্যবস্থার নিশ্চিতকরণ।
লক্ষ্য হতে হবে দেশের কোনো ঘনবসতি এলাকায় কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাঝে যেন সংক্রমণের বিস্ম্ফোরণ না ঘটে। ওই সব এলাকার বাসিন্দাদের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রাখতে হবে। আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন দুটিই অন্য সুস্থ মানুষ থেকে পৃথককরণকে বোঝায়। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সক্রিয় পন্থায় রোগী শনাক্তকরণ, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও পৃথককরণ, তার চিকিৎসা, ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করে কোয়ারেন্টাইন ও নাগরিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় নিশ্চিত করতে সব হাত একত্র করাও জরুরি। এ ব্যাপারে জনসম্পৃক্ততা ও স্বেচ্ছাসেবার উদাহরণ আমাদের সামনে আছে। এর পুনর্জাগরণে সংক্রমণ নিম্নগামী করা যেতে পারে। কীভাবে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ বন্ধ করা যাবে, এই পদ্ধতিও আমাদের অজানা নয়। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে করোনার বিস্তার ঠেকাতে হবে।
রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আইইডিসিআর
- বিষয় :
- করোনা
- ডা. মুশতাক হোসেন