সমকালীন প্রসঙ্গ
সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা?
×
ফয়জুল হাকিম
প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
সম্প্রতি সরকার দেশের সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এনজিওগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, 'স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে পাইলট প্রকল্প আকারে কতিপয় সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা যথাপদ্ধতিতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। হাসপাতালগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে।'
সরকার এমন এক সময় এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যখন গত দেড় বছরে আমলা-ব্যবসায়ীনির্ভর করোনা প্রতিরোধ নীতি, অদক্ষতা প্রকটভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সীমান্ত জেলাগুলোর সরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনা প্রতিরোধে গত দেড় বছরে প্রস্তুত করা হয়নি। এখন সেখানে প্রতিদিন যথাযথ চিকিৎসার ও অক্সিজেনের অভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে চলেছে। অনেক জেলায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। গ্রাম পর্যায়ে সংক্রমণ বিস্তার পরিস্থিতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।
এই অতিমারির দুর্যোগকালে সাধারণ মানুষ রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন, অবর্ণনীয় হয়রানি-কষ্টের শিকার হয়েছেন, প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতেই জনগণ চিকিৎসা পেয়েছেন, করপোরেট-প্রাইভেট হাসপাতালগুলো সে সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের এই সাহসী ও মানবিক ভূমিকা প্রচারমাধ্যমে সামনে আসেনি। বরং সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দুর্বলতা, ঘাটতি প্রভৃতির জন্য সৃষ্ট জন-অসন্তোষকে সরকার কৌশলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চালিত করেছে। 'গণশত্রু' হিসেবে সে সময় চিকিৎসকদের চিহ্নিত করার সরকারি কৌশল চিকিৎসকদের মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জনগণও সরকারের দিকে সেভাবে আঙুল তোলেনি। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও করোনা অতিমারিতে সরকারের নেওয়া আমলা-ব্যবসায়ীনির্ভর ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।
বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি 'স্বাস্থ্য' ও 'চিকিৎসা' দুটি বিষয়কে প্রথম থেকেই সুকৌশলে জনগণের কাছে সমার্থক করে দেখিয়ে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়গুলোর (খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, নিরাপদ পানি) উন্নতির চেষ্টা না করে চিকিৎসা
ব্যবস্থার ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করে
এসেছে। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত 'স্বাস্থ্যসেবা'র মানোন্নয়নের যে 'লক্ষ্য' নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আসলে 'চিকিৎসাসেবা'র মানোন্নয়নেরই লক্ষ্য, স্বাস্থ্যসেবার নয়।
এখন এই 'চিকিৎসাসেবা' উন্নয়নে সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা সরকার বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পরে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে, অনুন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নীতির পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে। কাঠামোগত সংস্কারের নামে সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের অব্যাহত চাপে বিভিন্ন দেশের সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত চিকিৎসাসেবা খাতকে সংকুচিত করতে শুরু করে। বাংলাদেশেও আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের সরকারি চিকিৎসাসেবা সংকোচনের এই সুযোগ পুরোপুরি লুফে নেয় করপোরেট পুঁজি। মানুষ উচ্চমূল্যে চিকিৎসা কিনতে বাধ্য হবে- এই ধারণার সঙ্গে একশ্রেণির চিকিৎসক চিকিৎসার বাজারীকরণকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার ও রাষ্ট্র হয়েছে এই বাজারীকরণের পৃষ্ঠপোষক। চিকিৎসাকে বাজারি-পণ্য হিসেবে এরা হাজির করেছে।
১৯৯০ সালে এরশাদের সংসদীয় সামরিক সরকার জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির নামে এক গণবিরোধী নীতি ঘোষণা করেছিল। যার মূল দিকগুলো ছিল- ১. স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি না করে কিছু প্রশাসনিক নিয়মকানুন চালু করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার 'উন্নতি' সাধনের কথা বলা, ২. ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জনগণের কাছে জবাবদিহির নামে স্থানীয় ইউনিয়ন ও উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের অধীন করে সমগ্র চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতির বিস্তার ঘটানো এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, ৩. সরকারি হাসপাতাল এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সেগুলোতে জনসংখ্যা হিসেবে ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধির ব্যবস্থা না করা, ৪. চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও নার্স ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা প্রয়োজন অনুযায়ী বৃদ্ধির কোনো ব্যবস্থা না রাখা এবং ৫. প্রায় সমগ্র চিকিৎসাব্যবস্থাকে ব্যক্তি খাতের অধীনস্থ করা।
এরশাদ সরকার স্বাস্থ্যনীতির নামে স্বাস্থ্য খাতে উপরোক্ত গণবিরোধী ব্যবস্থা চালু করতে যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তা ছিল রোগী বা জনগণের সঙ্গে চিকিৎসকদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে তাদের (সামরিক সরকারের) স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর গণবিরোধী চরিত্র জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়াল করা। কিছু সংখ্যক চিকিৎসকের অর্থ লোভ, রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নানা দায়িত্বহীন আচরণ এবং সর্বোপরি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদির অভাবজনিত অব্যবস্থার ফলে জনগণের মধ্যে চিকিৎসকদের একাংশের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ দেখা যায় তাকে এ ক্ষেত্রে এরশাদ সরকারের পক্ষ থেকে ভালোভাবেই ব্যবহার করার এক হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বর্তমানে সরকারও একই প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মূল সমস্যাকে আড়াল করার কাজে লিপ্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো সরকার কর্তৃক জনগণের স্বার্থে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন না করা ও বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না করা। গত বছর করোনাকালে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে করোনা প্রতিরোধে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তেমনি অতিমারি প্রতিরোধে সরকারি পরিকল্পনাও ব্যক্ত হয়নি। একই অবস্থা চলতি প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে চিকিৎসকদের পেশাদার সংগঠনগুলোকে আজ মাঠে নামতে হবে। স্বাস্থ্য কোনো পণ্য নয়, এটা মৌলিক অধিকার- এই স্লোগান চিকিৎসকদের নেতৃত্বে সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদেরই তুলতে হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি। এসব জনসাধারণের সম্পত্তি। এর ব্যবস্থাপনা 'যথাপদ্ধতিতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থায় হস্তান্তরের ব্যবস্থা'- এটি বেসরকারীকরণেরই নামান্তর। সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এভাবে বেসরকারীকরণের উদ্যোগকে প্রতিহত করার দায়িত্ব জনগণেরও। কেননা স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবা সম্পর্কিত আন্দোলন শুধু চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদেরই আন্দোলন নয়, সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত থাকলেও এ আন্দোলন মূলত জনগণের আন্দোলন। কারণ স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও রোগ নিরোধক ব্যবস্থা জনগণেরই দরকার। রোগীর যেমন চিকিৎসা অবশ্যই দরকার, তেমনি রোগী ব্যতীত চিকিৎসকদের কোনো অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
করোনা অতিমারিতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরিত্র ইতোমধ্যে উলঙ্গ হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কতটা অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত তা দৃশ্যমান হয়েছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবাকে অধিকার হিসেবে কায়েম করতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। এটি রাজনৈতিক কাজ। এই রাজনৈতিক কাজে ভূমিকা নিতে চিকিৎসকসহ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে চিকিৎসা পদ্ধতি বিকাশের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই সামনে আনতে হবে। মানবজাতির যেমন, পৃথিবী নামক গ্রহেরও সেখানেই ভবিষ্যৎ।
চিকিৎসক; আহ্বায়ক, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ
সরকার এমন এক সময় এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে, যখন গত দেড় বছরে আমলা-ব্যবসায়ীনির্ভর করোনা প্রতিরোধ নীতি, অদক্ষতা প্রকটভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে। সীমান্ত জেলাগুলোর সরকারি হাসপাতালগুলোকে করোনা প্রতিরোধে গত দেড় বছরে প্রস্তুত করা হয়নি। এখন সেখানে প্রতিদিন যথাযথ চিকিৎসার ও অক্সিজেনের অভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে চলেছে। অনেক জেলায় সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। গ্রাম পর্যায়ে সংক্রমণ বিস্তার পরিস্থিতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।
এই অতিমারির দুর্যোগকালে সাধারণ মানুষ রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন, অবর্ণনীয় হয়রানি-কষ্টের শিকার হয়েছেন, প্রিয়জনকে হারিয়েছেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতেই জনগণ চিকিৎসা পেয়েছেন, করপোরেট-প্রাইভেট হাসপাতালগুলো সে সময় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের এই সাহসী ও মানবিক ভূমিকা প্রচারমাধ্যমে সামনে আসেনি। বরং সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা, দুর্বলতা, ঘাটতি প্রভৃতির জন্য সৃষ্ট জন-অসন্তোষকে সরকার কৌশলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে চালিত করেছে। 'গণশত্রু' হিসেবে সে সময় চিকিৎসকদের চিহ্নিত করার সরকারি কৌশল চিকিৎসকদের মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। জনগণও সরকারের দিকে সেভাবে আঙুল তোলেনি। দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোও করোনা অতিমারিতে সরকারের নেওয়া আমলা-ব্যবসায়ীনির্ভর ভ্রান্ত নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কোনো রাজনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি।
বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি 'স্বাস্থ্য' ও 'চিকিৎসা' দুটি বিষয়কে প্রথম থেকেই সুকৌশলে জনগণের কাছে সমার্থক করে দেখিয়ে স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত মৌলিক বিষয়গুলোর (খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান, নিরাপদ পানি) উন্নতির চেষ্টা না করে চিকিৎসা
ব্যবস্থার ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করে
এসেছে। মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত 'স্বাস্থ্যসেবা'র মানোন্নয়নের যে 'লক্ষ্য' নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আসলে 'চিকিৎসাসেবা'র মানোন্নয়নেরই লক্ষ্য, স্বাস্থ্যসেবার নয়।
এখন এই 'চিকিৎসাসেবা' উন্নয়নে সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা সরকার বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত নতুন কিছু নয়। নব্বইয়ের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের পরে পুঁজিবাদী দেশগুলোতে, অনুন্নত দেশগুলোতে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নীতির পরিবর্তন ঘটাতে শুরু করে। কাঠামোগত সংস্কারের নামে সাম্রাজ্যবাদী সংস্থা বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের অব্যাহত চাপে বিভিন্ন দেশের সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত চিকিৎসাসেবা খাতকে সংকুচিত করতে শুরু করে। বাংলাদেশেও আশির দশকে সামরিক শাসক এরশাদ সরকারের সরকারি চিকিৎসাসেবা সংকোচনের এই সুযোগ পুরোপুরি লুফে নেয় করপোরেট পুঁজি। মানুষ উচ্চমূল্যে চিকিৎসা কিনতে বাধ্য হবে- এই ধারণার সঙ্গে একশ্রেণির চিকিৎসক চিকিৎসার বাজারীকরণকে স্বাগত জানিয়েছে। অন্যদিকে সরকার ও রাষ্ট্র হয়েছে এই বাজারীকরণের পৃষ্ঠপোষক। চিকিৎসাকে বাজারি-পণ্য হিসেবে এরা হাজির করেছে।
১৯৯০ সালে এরশাদের সংসদীয় সামরিক সরকার জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির নামে এক গণবিরোধী নীতি ঘোষণা করেছিল। যার মূল দিকগুলো ছিল- ১. স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি না করে কিছু প্রশাসনিক নিয়মকানুন চালু করে স্বাস্থ্যব্যবস্থার 'উন্নতি' সাধনের কথা বলা, ২. ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জনগণের কাছে জবাবদিহির নামে স্থানীয় ইউনিয়ন ও উপজেলা চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণের অধীন করে সমগ্র চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে দুর্নীতির বিস্তার ঘটানো এবং বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা, ৩. সরকারি হাসপাতাল এবং ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সেগুলোতে জনসংখ্যা হিসেবে ওষুধপত্র, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধির ব্যবস্থা না করা, ৪. চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও নার্স ট্রেনিং সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দ্রুত চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা প্রয়োজন অনুযায়ী বৃদ্ধির কোনো ব্যবস্থা না রাখা এবং ৫. প্রায় সমগ্র চিকিৎসাব্যবস্থাকে ব্যক্তি খাতের অধীনস্থ করা।
এরশাদ সরকার স্বাস্থ্যনীতির নামে স্বাস্থ্য খাতে উপরোক্ত গণবিরোধী ব্যবস্থা চালু করতে যে কৌশল অবলম্বন করেছিল, তা ছিল রোগী বা জনগণের সঙ্গে চিকিৎসকদের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে তাদের (সামরিক সরকারের) স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রস্তাবগুলোর গণবিরোধী চরিত্র জনগণের দৃষ্টি থেকে আড়াল করা। কিছু সংখ্যক চিকিৎসকের অর্থ লোভ, রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও নানা দায়িত্বহীন আচরণ এবং সর্বোপরি সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধপত্র, চিকিৎসা সরঞ্জাম ইত্যাদির অভাবজনিত অব্যবস্থার ফলে জনগণের মধ্যে চিকিৎসকদের একাংশের বিরুদ্ধে যে বিক্ষোভ দেখা যায় তাকে এ ক্ষেত্রে এরশাদ সরকারের পক্ষ থেকে ভালোভাবেই ব্যবহার করার এক হীন প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। বর্তমানে সরকারও একই প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মূল সমস্যাকে আড়াল করার কাজে লিপ্ত রয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো সরকার কর্তৃক জনগণের স্বার্থে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন না করা ও বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না করা। গত বছর করোনাকালে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে করোনা প্রতিরোধে বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি, তেমনি অতিমারি প্রতিরোধে সরকারি পরিকল্পনাও ব্যক্ত হয়নি। একই অবস্থা চলতি প্রস্তাবিত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটেও দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে চিকিৎসকদের পেশাদার সংগঠনগুলোকে আজ মাঠে নামতে হবে। স্বাস্থ্য কোনো পণ্য নয়, এটা মৌলিক অধিকার- এই স্লোগান চিকিৎসকদের নেতৃত্বে সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদেরই তুলতে হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তৈরি। এসব জনসাধারণের সম্পত্তি। এর ব্যবস্থাপনা 'যথাপদ্ধতিতে সক্ষম ও অভিজ্ঞ বেসরকারি সংস্থায় হস্তান্তরের ব্যবস্থা'- এটি বেসরকারীকরণেরই নামান্তর। সরকারি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এভাবে বেসরকারীকরণের উদ্যোগকে প্রতিহত করার দায়িত্ব জনগণেরও। কেননা স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসাসেবা সম্পর্কিত আন্দোলন শুধু চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীদেরই আন্দোলন নয়, সর্বস্তরের স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বার্থ এর সঙ্গে জড়িত থাকলেও এ আন্দোলন মূলত জনগণের আন্দোলন। কারণ স্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও রোগ নিরোধক ব্যবস্থা জনগণেরই দরকার। রোগীর যেমন চিকিৎসা অবশ্যই দরকার, তেমনি রোগী ব্যতীত চিকিৎসকদের কোনো অস্তিত্ব সম্ভব নয়।
করোনা অতিমারিতে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরিত্র ইতোমধ্যে উলঙ্গ হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ কতটা অবহেলিত, উপেক্ষিত ও বঞ্চিত তা দৃশ্যমান হয়েছে। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবাকে অধিকার হিসেবে কায়েম করতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। এটি রাজনৈতিক কাজ। এই রাজনৈতিক কাজে ভূমিকা নিতে চিকিৎসকসহ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশে চিকিৎসা পদ্ধতি বিকাশের পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ আর সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকেই সামনে আনতে হবে। মানবজাতির যেমন, পৃথিবী নামক গ্রহেরও সেখানেই ভবিষ্যৎ।
চিকিৎসক; আহ্বায়ক, জনস্বাস্থ্য সংগ্রাম পরিষদ