ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

করোনার টিকা

আমাদের সক্ষমতা কাজে লাগুক

আমাদের সক্ষমতা কাজে লাগুক
×

ড. মাহবুব হাসান

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২১ | ১২:০০

দেশে করোনা মহামারি জেঁকে বসেছে। প্রতিদিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। মৃত্যু প্রতিদিনই রেকর্ড গড়ছে। আমাদের বলা উচিত, বাংলাদেশ করোনা মহামারির উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো রকম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নেই। কেন তারা নিরুদ্বিগ্ন? গত দেড় বছরে সরকার তো বহুভাবে চেষ্টা করেছে জনগণের মধ্যে মৃত্যুঝুঁকি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির। সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক ব্যবহার এবং সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, স্যানিটাইজার ব্যবহার করে সংক্রমণ প্রতিরোধে প্রচারণা চালিয়ে। কিন্তু শিক্ষিত-নিরক্ষর অনেকেই এ বিষয়ে অবহেলাই দেখিয়ে চলেছেন। গত ঈদুল ফিতর কিংবা লকডাউনের সময় 'অগণন মানুষ'কে গ্রামে যেতে দেখা গেছে। সরকার দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ করে দিয়ে তাদের যাত্রাই কেবল থামাতে চায়নি, তারা যাতে ঘরে ও নিরাপদে থাকে, গণজমায়েতে না যায় এবং করোনা সংক্রমণ না করতে পারে, সে উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু সরকারের সে প্রচেষ্টাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে গরিব-খেটে খাওয়া মানুষ অনেক বেশি ভাড়া গুনে নানা রকম পরিবহনের মাধ্যমে গ্রামে গেছেন। আসন্ন ঈদুল আজহায় বোধ হয় এমনটাই দেখা যাবে।
আমরা যে আত্মসচেতন জাতি নই- এসব ঘটনাই তার প্রমাণ দেয়। নিজে বাঁচ এবং অন্যকেও বাঁচতে দাও- করোনার বিরুদ্ধে ছিল এবং আছে এই চেতনা। কিন্তু অনেকেই স্বাস্থ্যবিধির প্রতি উপেক্ষা দেখিয়ে কঠোর লকডাউনেও বাইরে বের হয়েছেন। ব্যক্তিগত গাড়িওয়ালাদের ভিড় আর রিকশা-স্কুটারের চাপে মহানগরের সড়কগুলোতে নিয়মিত জ্যামের সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থার জন্য দায়ী কে? গণপরিবহন বন্ধ করে অফিস খোলা রাখা যায় না- এটা বোঝা উচিত কর্তৃপক্ষের।
করোনার টিকা পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে যে উদ্বেগ দেখেছি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের মানুষ আর সাংবাদিকদের মধ্যে; সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মধ্যে তেমনটা দেখিনি। আমাদের প্রয়োজন ১৪ কোটি টিকা। দিতে হবে গণহারে। কারণ যদি গণহারে টিকা দেওয়া না যায়, তাহলে করোনার ডেলটা ভ্যারিয়েন্ট আমাদের জন্য আরও কতটা হুমকি হয়ে উঠবে, বলা মুশকিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে টিকা দিতে হবে। সে হিসাবে ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। লাখ লাখ টিকা দিয়ে কোটি কোটি মানুষকে করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচানো যাবে না। জাতীয় পার্টিপ্রধান জিএম কাদের এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকারিভাবে বলা হয়েছে, প্রতি মাসে ২৫ লাখ মানুষকে টিকা দেওয়া হবে। তাতে প্রয়োজনীয় জনগোষ্ঠীকে এক ডোজ করে টিকা দিতে ৪-৫ বছর সময় লেগে যাবে। তবে তাও সম্ভব, যদি সময়মতো বাকি টিকা পাওয়া যায়।
পরিস্থিতি যদি এমনটাই হয়, মানে টিকা পাওয়ার বিষয়টি যদি অনিশ্চিতই থেকে যায়, তাহলে যে ভয়ের সমুদ্রে আমরা বাস করছি, তার উত্তাল ঢেউ এসে লাগতে বেশি সময় লাগবে না। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, দুই ডোজ টিকা যারা পেয়েছেন, তাদের সংক্রমণ ঝুঁকি সামান্য। তার মানে, দুই ডোজ টিকা দিতে পারলেই কেবল আমরা ভাবতে পারব, দেশ এখন করোনা মহামারি থেকে মুক্ত হতে যাচ্ছে।
সরকার অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা কিনেছিল। কিন্তু তারা এক কোটি তিন লাখ ডোজ সরবরাহের পর ভারত সরকারের নির্দেশে রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। কোম্পানিটি ব্রিটিশ হলেও এর উৎপাদন ইউনিট ভারতে। প্রতিষ্ঠানের নাম সেরাম। এটা মনে রাখা জরুরি ছিল, টিকার মূল্য যেহেতু পরিশোধিত হয়েছে, তাই সে টিকা অবশ্যই সরবরাহ করা উচিত। দ্বিতীয়ত, এটি একটি জীবন রক্ষাকারী মেডিসিন। তার সরবরাহ বন্ধ করা মানে একটা দেশকে অধিকতর ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া।
সরকারের ভাবনায় কেবল অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকাই ছিল। অন্য কোনো টিকা আনার ব্যাপারে সরকার ছিল অনিচ্ছুক। চীন সবার আগে বাংলাদেশকে টিকা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু সে সময় সাড়া দেয়নি সরকার। তখন চীনও আর চাপাচাপি করেনি। সেই টিকা কেবল বিনামূল্যেই দেওয়ার কথা বলেনি চীন, আরও নানাভাবে তারা সাহায্য করতে চেয়েছে। এ-দেশে টিকা উৎপাদনের ব্যপারেও তারা প্রস্তাব করেছিল। এখন সেই চীনা টিকাই কিনে আনতে হচ্ছে সরকারকে। আসছে রাশিয়া থেকেও টিকা। বিভিন্ন দেশের টিকার মান ও কার্যকারিতা ভিন্ন। যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা নিয়েছেন কিন্তু দ্বিতীয় ডোজ পাননি, তারা অন্য কোম্পানির টিকা নিতে পারবেন কিনা, তার কোনো সমাধান এখনও মেলেনি। ইনসেপ্‌টা ফার্মাকে চীনা কোম্পানি টিকা উৎপাদনে সহায়তা দেবে বলে জানা গেছে। বঙ্গভ্যাক্স নামে বাংলাদেশি এক বিজ্ঞানীর আবিস্কার আজও সব রকম ট্রায়ালের মাধ্যমে উপযুক্ত করার ক্ষেত্রে সরকারের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। আমরা যেমন বিদেশি পণ্য দেখলেই আবেগে উথলে উঠি, দেশি পণ্যে নাক সিটকাই! আবিস্কারকে উৎসাহিত করে যাবে, যাতে দেশের বিজ্ঞানীরা গবেষণায় জোর পায়, প্রাণ পায়। আমরা তো আমাদের উদ্ভাবনাকেই সবকিছুর আগে মূল্যায়ন করব। তারপর বিদেশি টিকার ওপর নির্ভর করব।
আমরা চাই আগামী ৬-৮ মাসের মধ্যে ১৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ [৮০ শতাংশ] টিকার আওতায় আসুক। তাহলেই কেবল সংক্রমণ-মৃত্যুর হার কমবে এবং আমরা করোনাযুদ্ধে জয়ী হতে পারব।
কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×