জনস্বাস্থ্য
নগরে অসংক্রামক রোগ ও চিকিৎসা সুবিধা
মো. শামীম হায়দার তালুকদার
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮:৩৫
দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে মারা যান। পৃথিবীতে অসংক্রামক রোগে প্রতি বছর ৪১ মিলিয়ন মানুষ মৃত্যুবরণ করে, যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর ৭৪ শতাংশের সমান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, যেসব রোগ তীব্র সংক্রমণের ফলে ছড়ায় না বরং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক অসুস্থতা সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ও যত্নের প্রয়োজন হয় তাকে অসংক্রামক রোগ বলে। চারটি বিভাগের অসংক্রামক রোগ সব অকাল মৃত্যুর ৮০ শতাংশেরও বেশি ঘটায়। হৃদরোগজনিত রোগগুলোই বেশিরভাগ অসংক্রামক মৃত্যুর জন্য দায়ী। এ রোগগুলো বছরে ১৭.৯ মিলিয়ন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। তারপর আছে ক্যান্সার, যা বছরে ৯.৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী। দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ আছে তৃতীয় অবস্থানে। এ রোগে মারা যায় ৪.১ মিলিয়ন মানুষ এবং সর্বশেষে আছে ডায়াবেটিস। ডায়াবেটিসের কারণে আক্রান্ত কিডনি রোগের মৃত্যুসহ সর্বমোট ২.০ মিলিয়ন মানুষ মারা যায়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে ডায়রিয়া, বসন্ত, যক্ষ্ণা, হামের মতো বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি সহজেই চিকিৎসায় নিরাময় হচ্ছে এবং প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে। এর ঠিক উল্টো দিকে বেড়েছে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি। অসংক্রামক রোগের সঙ্গে মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস, ধূমপান, তামাক সেবন, শারীরিক ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম না করা, মাদক গ্রহণ এবং মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্ণতা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের কারণে ঝুঁকি আরও বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ঘরে তৈরি খাবার বা ফলমূল-সবজির চেয়ে বাজারের ফাস্টফুড বা প্রক্রিয়াজাত খাবার অথবা প্যাকেটজাত খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। শহরগুলোতে হাঁটার সুযোগ কমে যাওয়ায় সব বয়সী মানুষের শারীরিক পরিশ্রমের অভ্যাস কমে গেছে। স্কুল-কলেজে খেলার মাঠের অভাবের কারণে শরীরচর্চার ওপর গুরুত্ব কমে গেছে। এসব কারণে অসংক্রামক রোগের ব্যাপকতা বেড়েছে। বাংলাদেশের অসংক্রামক রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে- উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ক্যান্সার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগ, কিডনি রোগ, মানসিক রোগ ও দুর্ঘটনাজনিত আঘাত ইত্যাদি। এসব রোগের কারণে অকাল মৃত্যু বাড়ছে। মোট মৃত্যুর ১০ জনের মধ্যে সাতজনই অসংক্রামক ব্যাধিতে মারা যাচ্ছেন। অর্থাৎ উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সারসহ আরও কয়েকটি রোগে ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ মারা যান।
বাংলাদেশে শহরে বসবাসকারী জনসংখ্যার প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ বস্তিতে বসবাস করে। বস্তিবাসীর অসংক্রামক রোগের তেমন তথ্য পাওয়া না গেলেও পুরুষদের মধ্যে তামাকের ব্যবহার, অতিরিক্ত ওজন এবং মহিলাদের মধ্যে কোলেস্টেরল বৃদ্ধি দেখা যায়। পাশাপাশি ডায়াবেটিসের হার জাতীয় গড় থেকে বেশি। অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা ব্যয় চালানো সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন। কারণ একদিকে এসব রোগে ব্যবহূত ওষুধের উচ্চ মূল্য, অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল বা ডাক্তারের ব্যক্তিগত চেম্বারের উচ্চ চিকিৎসা খরচ। সরকারি হাসপাতালগুলো দূরে থাকার কারণে এবং অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে প্রায়ই লোকেরা সেখানে যেতে চান না। বস্তির জনসাধারণ ওষুধের দোকানের ওপর বেশি নির্ভরশীল। কারণ হাতের কাছে পাওয়া যায়, সন্ধ্যায় খোলা পাওয়া যায় ও দ্রুত সমাধানের ওষুধও পাওয়া যায়।
অসংক্রামক রোগ হলো এক নীরব ঘাতক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বুঝে ওঠার আগেই রোগের বিস্তার অনেকদূর ছড়িয়ে পড়ে। এসব রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় অধিকাংশ মানুষের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে চিকিৎসা শুরু করার ফলে রোগীকে বাঁচানো বা পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা যায় না, উপরন্তু উচ্চ চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সর্বস্তরে ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি হতে পারে অসংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান হাতিয়ার। এ ব্যাপারে সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেন্দ্র বাড়াতে হবে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রাথমিক সেবা কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়িয়ে কাজে লাগানো দরকার। সেখান থেকে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষ স্বল্প মূল্যে অথবা বিনামূল্যে অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক চিকিৎসা পাবেন। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে উচ্চরক্তচাপ এবং ডায়াবেটিস পরিমাপের ব্যবস্থা থাকলে বস্তিতে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষগুলো সহজেই এসব রোগের ঝুঁকিতে আছেন কিনা জানতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে সুস্থ থাকতে পারবেন।
বিনামূল্যে বা নামমাত্র দামে ডায়াবেটিসের ওষুধ ও ইনসুলিন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ, অপুষ্টিকর খাদ্য বর্জন সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে সাহায্য করবে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো। পাবেন পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের পরামর্শ, সুশৃঙ্খল জীবনযাপনের নির্দেশনা। জানতে পারবেন ধূমপান ও মাদকের ভয়াবহতা সম্পর্কে। মানসিক স্বাস্থ্যের প্রাথমিক পরামর্শ দেওয়ার জন্য একজন পরামর্শক থাকাও জরুরি।
ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার: সিইও, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট
- বিষয় :
- জনস্বাস্থ্য
- মো. শামীম হায়দার তালুকদার