মানসিক স্বাস্থ্য
মায়েদের প্রসবোত্তর বিষণ্নতার ঝুঁকি
মো. শামীম হায়দার তালুকদার
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৩ | ১৮:০০
পরিবারে সন্তান আসা মানে বাড়িতে আনন্দের বাতাস বইতে থাকা। নতুন শিশু সবার মনোযোগ কাড়ে। পরিবারের সবাই নতুন শিশুর যত্ন নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে এই সময়ে মায়ের স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া জরুরি। সন্তান হওয়ার পর মা যদি সঠিক খাবার খেতে না পারে তাহলে তা শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে। মাকে এই সময় নানা দিকে লক্ষ্য রাখতে হয়। কিন্তু প্রসূতি এ সময় শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল থাকে। বাড়ির সবাই তখন নতুন সদস্যকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই মায়ের স্বাস্থ্যের কথা ভুলে যায়। শুধু শরীর না; মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও এই সময় যথেষ্ট নজর দেওয়া প্রয়োজন। নানা কারণে এ সময়ে মায়ের মন ভালো থাকে না। আর মন ভালো না থাকলে তার শরীরও ভালো থাকবে না। এই মন খারাপ হওয়ার মূল কারণ প্রসবোত্তর অবসাদ, যাকে ইংরেজিতে পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (পিপিডি) বলা হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাচ্চা জন্মের দুই-তিন দিন পর থেকে হতাশা এবং উদ্বেগের অনুভূতি হওয়া খুবই সাধারণ। কেউ অকারণে কান্না অনুভব করতে পারে; ঘুমাতে সমস্যা হতে পারে বা নতুন শিশুর যত্ন নেওয়ার ক্ষমতা নিয়েও নিজের মধ্যে সংশয় তৈরি হতে পারে। এটি মূলত এক ধরনের হরমোনের মাত্রা পরিবর্তনের কারণে হয়। কিন্তু হরমোনের পরিবর্তনই একমাত্র কারণ নয়। এর বাইরে আরও কিছু কারণ রয়েছে। যার ফলে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা অবসাদ, বুকের দুধ খাওয়ানোর চ্যালেঞ্জ এবং প্রসবোত্তর অন্যান্য জটিলতা, আগের কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা, জৈবিক কারণ, পারিবারিক সমর্থনের অভাব, শৈশবের কোনো কঠিন অভিজ্ঞতা, লাঞ্ছিত হওয়ার অভিজ্ঞতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, জীবন পরিচালনায় চাপ ইত্যাদি অনুভূত হতে পারে। পরিবার, প্রিয়জন বা বন্ধুদের কাছ থেকে সহযোগিতা ও সমর্থন পেলে এসব অনুভূতি সাধারণত কোনো চিকিৎসা ছাড়াই দুই সপ্তাহের মধ্যে চলে যায়। এটাকে বলে বেবি ব্লুজ। তবে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা বেবি ব্লুজ থেকে আলাদা। এটি সাধারণত প্রসূতির শিশু জন্মদানের দুই থেকে আট সপ্তাহ পরে ঘটে। তবে শিশুর জন্মের এক বছর পর্যন্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রসবোত্তর বিষণ্নতা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু দুঃখবোধ নয়; তীব্র উদ্বেগের অনুভূতিও প্রসবোত্তর বিষণ্নতার একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেসব উপসর্গে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা প্রকাশ পায়, তার মধ্যে রয়েছে ক্রমাগত কান্নাকাটি, শিশুর সঙ্গে বন্ধনের অভাব এবং মায়ের নিজের ও শিশুর যত্ন নেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ। প্রসূতি ক্লান্ত থাকে বলে শুয়ে জেগে থাকে; ঘুমাতে পারে না।
গবেষণায় দেখা যায়, উন্নত দেশের নারীদের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশের নারীদের মধ্যে পিপিডির হার বেশি। ২৮টি উন্নত দেশের একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সেখানে মহিলাদের মধ্যে পিপিডি উপসর্গ ছিল ৬ থেকে ১৩ শতাংশ। আর এশিয়ান দেশগুলোতে প্রসূতির মধ্যে হতাশার প্রবণতার হার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বাংলাদেশে পরিচালিত বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ নারীদের মধ্যে পিপিডির প্রকোপ ১৮ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৬ নারীর মধ্যে ১৭ জন পিপিডিতে ভুগছিল। এই সমীক্ষায় মহিলারা জানায়, আর্থিক সংকট, জীবনের প্রতিকূল ঘটনা, সঙ্গীর দ্বারা সহিংসতা, সামাজিক আনুকূল্যের অভাব, প্রসবোত্তরকালে বিষণ্নতাই এর কারণ। অপর এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯ সালে সন্তান প্রসবের পর প্রথম ১২ মাসের মধ্যে বাংলাদেশি মায়েদের মধ্যে পিপিডির হার ছিল ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রসবের পর প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে চার জন নারী পিপিডিতে আক্রান্ত হয় এবং সাধারণত ১০ দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে যায়। কভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন সন্তান জন্ম দেওয়া মায়েদের মধ্যে পিপিডির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। ঢাকার নিম্ন আয়ের মায়েরা প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় খুব বেশি আক্রান্ত। নিরক্ষরতা, দুর্বল দাম্পত্য সম্পর্ক, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, জোরপূর্বক যৌনতা, পূর্ববর্তী বিষণ্নতা– সবই বাংলাদেশে প্রসবোত্তর বিষণ্নতার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, সন্তান জন্মদান দারিদ্র্যের কারণ বিদ্যমান সমস্যাগুলোকে আরও খারাপ অবস্থায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ঘরে সঙ্গী কর্তৃক সহিংসতার শিকার নারীদের মধ্যে শারীরিকভাবে ৫২ শতাংশ, যৌনতা সংক্রান্ত কারণে ৬৫ শতাংশ এবং মানসিক নির্যাতনের জন্য ৮৪ শতাংশ নরী বিষণ্নতায় ভোগে।
মায়ের প্রসবোত্তর অবসাদ শিশুদের শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এসব মা শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়ে উদাসীন থাকার ফলে শিশু অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয় এবং তার শারীরিক বৃদ্ধি হ্রাস পায়। এর প্রভাব শুধু শিশুর শারীরিক উপসর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তার মানসিক স্বাস্থ্যকেও প্রভাবিত করতে পারে। প্রসবোত্তর অবসাদ মা ও শিশুর মধ্যে বন্ধন শিথিল করে, যা শিশুকে অপর্যাপ্ত সামাজিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের দিকে নিয়ে যায়। বিষয়টি অবহেলা করা চলবে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল চিকিৎসা হলো পরিবারের আদর-যত্ন। পরিবার যদি সমর্থন করে এবং ভালোবাসে তাহলে দ্রুত এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা যায়। স্বামীকে এই সময়ে স্ত্রীর পাশে থাকতে হবে; তাকে বুঝতে হবে। খাবার আর ওষুধের পাশাপাশি স্ত্রীর ছোটখাটো আনন্দের দিকেও নজর দিতে হবে।
ডা. মো. শামীম হায়দার তালুকদার : প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট