ঢাকা বুধবার, ২২ মে ২০২৪

বাজেট

স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা ও বরাদ্দের অসামঞ্জস্য

স্বাস্থ্য খাতের বাস্তবতা ও বরাদ্দের অসামঞ্জস্য

ড. আবদুর রশিদ সরকার

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২১ | ১২:০০

সম্প্রতি সরকার দেশের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) গ্রহণ করেছে, যার ছয়টি মূল প্রতিপাদ্যের প্রথমটি হচ্ছে- 'করোনা অতিমারি থেকে দ্রুত পরিত্রাণ লাভ করা'। বৈশ্বিক এই অতিমারির কবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার বিষয়টি বাস্তবতার নিরিখে নতুন পরিকল্পনায় সবার ওপর স্থান পেয়েছে। কাজেই ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও স্বাস্থ্য খাত সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে প্রত্যাশা ছিল। জীবন তথা স্বাস্থ্যের প্রাধান্য বাজেটের মূল প্রতিপাদ্যে আবেগ জড়িত ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে, স্বীকার করতে হবে। সে লক্ষ্যেই বাজেটে ৮০ শতাংশ মানুষকে পর্যায়ক্রমে বিনামূল্যে টিকার আওতায় নিয়ে আসা, টিকার উৎস ও সম্ভাব্য অর্থায়নের যে কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে তা সময়োপযোগী। কিন্তু বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী প্রতি মাসে ২৫ লাখ করে টিকা দিলে প্রায় ১৭ কোটি নাগরিকের ৮০ ভাগ তথা কমবেশি সাড়ে ১৩ কোটি মানুষের টিকা দিতে সময় লাগবে কমবেশি সাড়ে চার বছর। প্রতিটি টিকা গড়ে ১০ মার্কিন ডলারে কিনতে হলে বার্ষিক খরচ পড়বে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।
আমাদের স্বাস্থ্য খাতের প্রস্তাবিত অর্থ বরাদ্দের গতানুগতিক পরিমাণ করোনাকালীন বাস্তবতায় টিকা ক্রয় ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভগ্নদশার কতটা উন্নয়ন ঘটাতে পারবে সেটিই ভাবনার বিষয়। করোনা অতিমারি মোকাবিলা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের জন্য জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদদের তরফ থেকে দাবি উঠেছিল এবারের বাজেটে যেন জিডিপির কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ শতাংশ অথবা বাজেটের ৭ থেকে ৮ ভাগ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হয়। এই খাতে বরাদ্দ আগামী অর্থবছরের প্রাক্কলিত জিডিপির মাত্র ১ শতাংশ আর মোট বাজেটের মাত্র ৫ দশমিক ৪২ শতাংশ। অথচ ২০২০-২১ এর সংশোধিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের শেয়ার মোট বাজেট ব্যয়ের ৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ। তার মানে চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়েও প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য ব্যয়ের হিস্যা কম।
বরাবরের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে জনপ্রশাসন খাত- বাজেটের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। খাতওয়ারি বরাদ্দে স্বাস্থ্যের অবস্থান অনেক নিচে। তবে উদ্ভূত যে কোনো জরুরি চাহিদা মেটানোর জন্য ১০ হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ গতবারের মতো এবারও অব্যাহত রাখার প্রস্তাব আছে, যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। এই অঙ্ক মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করলেও বাজেটে স্বাস্থ্য ব্যয়ের শেয়ার শতকরা হিসাবে ৭ ভাগে দাঁড়ায়। তার পরও জিডিপির অনুপাতে শতকরা ২ ভাগের নিচে।
মনে রাখতে হবে, কোনো খাতের গুরুত্বের দিকটা শুধু টাকার অঙ্কে নয়, বরাদ্দের আপেক্ষিক শেয়ারে প্রতিফলিত হয়। গতানুগতিকভাবেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় কম। গত এক দশক ধরে বাংলাদেশ গড়ে জিডিপির শতকরা মাত্র দুই ভাগ বা তারও কম আর বাজেটের মাত্র ৫ শতাংশ ব্যয় করছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। উন্নত দেশগুলোতে এই হার শতকরা ১০ থেকে প্রায় ২০ ভাগ। মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয়ের ক্ষেত্রেও দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার গড় মাথাপিছু স্বাস্থ্য ব্যয় আমাদের থেকে ৪ গুণেরও বেশি। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের বিরাজমান অবকাঠামোগত অপ্রতুলতা ও বিশেষজ্ঞ লোকবলের স্বল্পতা বিবেচনায় খাতটিকে ঢেলে সাজানোর জন্য ঐতিহ্য ভেঙে একটা নির্দেশনা, পরিকল্পনা ও অর্থ বরাদ্দ এবারের বাজেটে প্রত্যাশিত ছিল। এ সময়ে প্রয়োজনে অন্যসব খাতের অনুন্নয়ন ব্যয় কিছুটা কমিয়ে হলেও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল।
করোনা পরিস্থিতিজনিত অর্থনৈতিক মন্দা থেকে পরিত্রাণ পেতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন ও গণ-টিকাকরণের কোনো বিকল্প নেই। কারণ, করোনাভাইরাসের প্রভাব থেকে দেশকে মুক্ত করতে না পারলে বিদেশি বিনিয়োগ নতুন করে আসার সম্ভাবনা কম। দেশীয় বিনিয়োগও বাড়বে তেমন লক্ষণও কম। কারণ জনসংখ্যার বিরাট অংশ কাজ ও আয় হারিয়ে বাজারে জিনিসপত্র কিনতে পারছে না বা কম কিনছে। ফলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের কর্মী ছাঁটাই করতে হচ্ছে। কাজেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী নতুন বাজেটের প্রধান লক্ষ্যই হওয়া উচিত দ্রুততম সময়ে জনগণের কমপক্ষে ৭০ ভাগের টিকাকরণের কৌশল নির্ধারণ করা।

বাজেটে বলা হয়েছে, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কাজ চলমান আছে। এক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালগুলোতেও যতটা সম্ভব আধুনিক স্বাস্থ্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বাড়াতে হবে। যাতে বড় বড় শহরের হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ কম পড়ে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সব জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সুবিধা প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়নি গত এক বছরে। কারণ, এর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জনবলের অপর্যাপ্ততা। স্বল্পমেয়াদে এটি করা সম্ভব না হলেও মধ্যম মেয়াদে কাজটি অবশ্যই করতে হবে। আসলে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ, যা করোনাকালে স্পষ্ট হয়েছে।
বিদায়ী অর্থবছরে দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্য খাতের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ৫০ শতাংশেরও কম। এটি কেন কম, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে কেন হচ্ছে- মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, সর্বোপরি অপচয় ও দুর্নীতি, এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা নিরূপণ ও সমাধানের পন্থা বের করা দরকার। ব্যয়ের সক্ষমতা নেই বলে বরাদ্দ কম না রেখে সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো যায় সেই উপায় বের করতে হবে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের শেয়ার অনেক কম। তাই স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ব্যয় বাড়াতে হবে। এ দেশের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামাঞ্চলে বাস করে বিধায় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দে নগর-গ্রামের অনুপাতও ন্যায্য হওয়া দরকার। সর্বোপরি অর্থের বরাদ্দ বাড়িয়ে এবং বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসন নিশ্চিত করতে পারলে করোনা মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে দ্রুত করোনা-পূর্ব অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে সরকারের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের লক্ষ্যকে বেগবান করবে।
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×