ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

সমাজের অসংগতি ও ইসলাম

সমাজের অসংগতি ও ইসলাম
×

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

আমরা বলে থাকি ইসলাম মানে শান্তি। সম্প্রীতি, শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলাম। ইসলাম সম্পর্কে এ ধরনের বক্তব্য শুধু বলার জন্যই নয়; বাস্তবেও ইসলাম এসব গুণের সমারোহে গুণান্বিত। আজ আমাদের মাঝে ইসলাম আছে, কিন্তু তার নীতিবিধানের প্রতি কারও তোয়াক্কা নেই, ইসলামের সংবিধিবদ্ধ হুকুম-আহকাম রয়েছে, কিন্তু ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সেগুলোর ওপর আমল বা চর্চা করার প্রতি কোনো আগ্রহ পরিলক্ষিত হয় না। নামে বা আদমশুমারিতে আমরা যারা মুসলিম পরিচয়ে পরিচিত, তাদের মধ্যে অধিকাংশই ইসলামের এসব কালজয়ী ও কল্যাণময় বিধিবিধান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে উদাসীন; যার ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশে মানবতাবাদী ও চিরকল্যাণকর জীবনবিধান ইসলামের কাঙ্ক্ষিত সুফল দৃশ্যমান হয় না। কখনও ব্যক্তি পর্যায়ে, কখনও সমাজজীবনে, কখনও-বা রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য যার যার সুবিধা ও মতলব অনুযায়ী ইসলামের খণ্ডিত বা আংশিক কিছু বিষয়ের আমল বা চর্চার বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়; তাতে প্রকৃতপক্ষে মানবসমাজে বড় আকারে কোনো পরিবর্তন বা প্রত্যাশিত মাত্রায় ধর্মীয় মূল্যবোধের বিকাশ ঘটে না। এ ক্ষেত্রে ইসলামের চিরন্তন আবেদন ও শাশ্বত বিধানের সর্বব্যাপী কল্যাণজনক বিষয়টি অনুপস্থিতই থেকে যায়।
একটি সমাজের পরিপূর্ণতা ও সত্যিকার অর্থে মানবিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য যতগুলো নিয়ামক প্রয়োজন, তার সবকিছুই ইসলামের মধ্যে বিরাজমান রয়েছে। ইসলামকে বলা হয়েছে- 'আদ্‌দিনু ওয়ান নাসিহা' অর্থাৎ এটি এমন জীবন ব্যবস্থা, যাতে সবার কল্যাণ কামনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে ইসলামের অনুসারী হয়েও আমরা অনেকেই সবার কল্যাণ কামনার স্থলে কখনও কখনও কারও 'কল্লা' কামনা করি; তাহলে ইসলাম সেই ব্যক্তি ও সমাজমানসে কি ফায়দা রাখতে পারবে! ইসলামের বিধান হলো, 'তুমি নিজের জন্য যা পছন্দ করবে, ভালোবাসবে, তা অন্য ব্যক্তির জন্যও পছন্দ করবে বা ভালোবাসবে'। কিন্তু আমরা তার ঠিক উল্টোটাই করি অর্থাৎ যা কিছু ভালো, যা কিছু কল্যাণকর, সব নিজের জন্য পছন্দ করি, নিজে পেতে ভালোবাসি আর যা কিছু মন্দ, যা কিছু অমঙ্গলকর, সেসব অন্যের জন্য পছন্দ করি বা অন্যদের ভাগে সেগুলো যাক- মনেপ্রাণে সেটাই কামনা করি। এই যদি হয় অবস্থা, তবে ইসলামের নাম নিয়ে শুধু পানি পড়া খেলে সেই সমাজ কীভাবে বিশুদ্ধ ও মানবিক হতে পারে! ইসলাম বলেছে, পরস্পর পরস্পরের সঙ্গে তোমরা প্রতিযোগিতা কর সৎ-পুণ্য বিষয়াদি নিয়ে এবং মহান আল্লাহকে ভয় করার নীতি অবলম্বনের ক্ষেত্রে কিন্তু কখনোই তোমরা পাপাচার ও সীমা লঙ্ঘনের বিষয়াদি নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইও না। আমাদের জীবনে যত প্রয়াস তার অধিকাংশই আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থকেন্দ্রিক, গোত্র-সম্প্রদায়-গোষ্ঠীকেন্দ্রিক; আমাদের সব প্রয়াস কখনোই সকল মানুষ ও মানবতাকেন্দ্রিক নয়; সে জন্যই সমাজে ইসলামের কল্যাণকামী জীবনবিধানের ইতিবাচক সুফল অনুপস্থিত।
সমাজে নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ইসলামের বিধান হলো, যোগ্যতর ও দায়িত্বশীল মানুষের হাতে প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব অর্পণ করা। সে ক্ষেত্রে ব্যক্তিমানসের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিরূপণের নিয়ামকগুলো ঠিক করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্বশীল পদে বসানোই ইসলামের অমোঘ বিধান। কিন্তু আমাদের সমাজের বাস্তবতা এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীত; তদবিরকারক, পদলেহনকারী ও চাটুকারদের দৌরাত্ম্য প্রাতিষ্ঠানিক ঐতিহ্য ও সুনামকে এতটাই ক্ষুণ্ণ করেছে যে, এখন অধিকতর যোগ্য ব্যক্তিরা নিজেদের আর কোনো পদে আসীন দেখতে চান না। ইসলাম বলে, তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল আর সবাইকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু আমাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের মধ্যে পরকালীন জবাবদিহির বিষয়টি দূরে থাক, পার্থিব বিষয়েই তারা লাজ-লজ্জার তোয়াক্কা না করে তাদের চতুষ্পার্শ্বে অহর্নিশ অযোগ্য চাটুকার আর তল্পিবাহকদের প্রশংসাবাণী ও জয়ধ্বনি শুনতেই বেশি অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এতে করে প্রাতিষ্ঠানিক উপযোগিতা, ন্যায্যতা ও সমৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার বিপরীতে শুধু গদিনশিন ব্যক্তির নিজের আসনটি হয়তো সীমিত সময়ের জন্য পাকাপোক্ত হয় এবং স্বার্থ-বলয়ের পরিকল্পিত কু-মতলবসমূহ চরিতার্থ হওয়াকেই এই প্রজাতির মানুষরা যথেষ্ট মনে করেন; যদিও প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ, গৌরব ও মর্যাদা এদের দ্বারা শুধু ভূলুণ্ঠিতই হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে ইসলামের বিধান হলো, 'আমরা তাকে পদায়ন করি না, যে কিনা পদের জন্য লালায়িত থাকে বা পদের জন্য নিজের আগ্রহ ব্যক্ত করে।' ইসলামের এই কল্যাণকামী নির্দেশনা মোতাবেক চলতে পারলে সমাজ-সংশ্নিষ্ট ও সমাজ-ঘনিষ্ঠ নানা প্রতিষ্ঠান উপযুক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পেত এবং অগণিত মানুষ এর সুফল পেত।

চেয়ারম্যান ও অধ্যাপক, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×