ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাক্ষাৎকার: মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌

দুর্নীতিবাজ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না

দুর্নীতিবাজ কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না
×

সাক্ষাৎকার গ্রহণ: হকিকত জাহান হকি

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২১ | ১২:৪৫

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌ ১৯৮৩ সালে জনপ্রশাসনে যোগ দেন। বিগত সময়ে তিনি ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর ২০১৯ সালের জুলাই মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত উন্নয়ন সংস্থা পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তার জন্ম ১৯৫৯ সালে কুমিল্লায়।

সমকাল: দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় সমকালের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন। দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল করতে আপনি কীভাবে কাজ শুরু করতে চান?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনি ম্যান্ডেট এবং সবার সার্বিক সহযোগিতা নিয়ে আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে চাই। সমাজের সবার সহযোগিতা এবং বিদ্যমান আইনের নিখুঁত প্রয়োগই হবে আমাদের পথচলার ভিত্তি। কারণ, দুর্নীতি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে সহযোগিতা প্রয়োজন। সবার দায়িত্ব যদি স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিপালিত হয়, তাহলে দুদকের কাজ অনেকাংশে কমে যাবে।

সমকাল: গত ১০ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর আপনি বলেছিলেন, শুধু আইন দ্বারা দুর্নীতি দমন করা দুরূহ ব্যাপার। এ জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে আপনি কাদের সহযাত্রী হিসেবে চান এবং কীভাবে চান?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: যে কোনো পরিবর্তন কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে পুরোপুরি অর্জন করা সত্যিই দুরূহ। আমাদের অনুধাবন করতে হবে, সামাজিকভাবে আমরা দুর্নীতিকে কতটা প্রতিরোধ করতে পেরেছি। সামাজিকভাবে দুর্নীতিপরায়ণদের কতটা প্রত্যাখ্যান করতে পেরেছি- এ প্রশ্ন সবার। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে আশাবাদী মানুষ। আমি বিশ্বাস করি, জাতি মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছে। তারা দুর্নীতির মতো অপরাধকে সমাজ থেকে তীব্র সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। মূলত সমাজের শক্তিগুলো যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেবে, তখনই দুর্নীতিপরায়ণরা পরাভূত হবে। মানুষ যত সচেতন হবে, দুর্নীতিপরায়ণরা ততই দুর্বল হবে। এ জন্য কৃষক থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মচারীসহ সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।

সমকাল: সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত সর্বত্র দুর্নীতি। সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে হয়রানি-দুর্নীতির শিকার হচ্ছে। জনগণ যাতে দুর্নীতিমুক্ত সেবা পায়, তার জন্য আপনি কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: বাংলাদেশের সংবিধানের ২১(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত ব্যক্তির কর্তব্য।' অর্থাৎ সাধারণ মানুষকে হয়রানি বা দুর্নীতিমুক্তভাবে সেবা প্রদান করা সরকারি কর্মচারীদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সেবা গ্রহণকারীকেও সচেতন হতে হবে। কেউ ঘুষ চাইলেই ঘুষ দেবেন না। ঘুষ দেওয়া, ঘুষ নেওয়া- দুটিই ফৌজদারি অপরাধ। যিনি ঘুষ চান তার বিরুদ্ধে তারই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে। ঘুষ চাওয়ার বিষয়টি দুদককে অবহিত করার সুযোগ রয়েছে। দুদক প্রয়োজনে ফাঁদ পেতে ওইসব অপরাধীকে গ্রেপ্তার করবে।

সমকাল: একটি কথা প্রচলিত- বড় দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়ছে না। সে ক্ষেত্রে আপনি কতটুকু শক্ত হবেন?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: দুর্নীতি ছোট বা বড় বলে কোনো বিষয় নয়। দুর্নীতি দুর্নীতিই। সেটা ছোট হোক আর বড় হোক। দুদকের জালে যেমন ছোট দুর্নীতিবাজ ধরা পড়ছে, আবার অনেক বড় দুর্নীতিবাজও ধরা পড়েছে। অনেক কথিত বড় দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। অনেকের শাস্তি হয়েছে, অনেকে কারাগারে আছেন। অনেকের মামলা আদালতে বিচারাধীন। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি- কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে দুর্নীতির তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে দালিলিক প্রমাণাদির ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমরা এ দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ।

সমকাল: বিদেশে অর্থ পাচার রোধ ও পাচার অর্থ ফেরত আনতে আপনার কার্যকর পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাই।

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: বিশ্ব চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। এ যুগে অর্থ পাচার, ট্যাক্স ফাঁকি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। পাচার অর্থ ফেরত আনতে আন্তর্জাতিক যে আইন রয়েছে; কমিশন তার সর্বোচ্চ ব্যবহারের চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ দুর্নীতিবিরোধী সনদে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স এগমন্ড গ্রুপের সদস্য। অর্থ পাচার দমন ও প্রতিরোধে আন্তর্জাতিকভাবে যে আইনি পরিকাঠামো রয়েছে, তার সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত। অর্থ পাচার রোধ ও পাচার অর্থ ফেরত আনতে যেসব কৌশল ও আইনি পরিকাঠামো রয়েছে, সেগুলোর সঠিক ব্যবহারের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে কমিশন।

সমকাল: দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটুকু জরুরি বলে আপনি মনে করেন?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: দেখুন, দুর্নীতি দমনে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার তো আমাদের সংবিধানেই রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবে, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।' এটাই তো সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। আমার জানামতে, দেশের প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের ম্যানিফেস্টোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থানের কথা বলেছে। এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই- যারা দুর্নীতিকে সমর্থন করে। আরেকটা বিষয় আমাদের অনুধাবন করতে হবে, প্রায় সব ধর্মগ্রন্থেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃঢ় বাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। আমাদের সমাজে ধর্মের ব্যাপক চর্চাও রয়েছে। এর পরও কেন দুর্নীতি হচ্ছে- ধর্মীয় নেতাদেরও এ প্রশ্নের জবাব নিয়ে ভাবতে হবে।

সমকাল: আগের কমিশন দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দপ্তরে নানা সুপারিশ পেশ করেছিল। সেগুলো বাস্তবায়নে আপনারা কীভাবে কাজ করবেন?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: বিজেনস প্রসেস রি-ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। তাদেরও সময় দিতে হবে। আমরা উপযুক্ত সময়েই পদক্ষেপ নেব। এ নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় প্রয়োজন। সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে যথাসময়ে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

সমকাল: দুর্নীতি দমন কাজে প্রভাবশালী মহল তাদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। কমিশনকে এসবের ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: আপনি প্রশ্নেই বলেছেন- প্রভাবশালী মহল। এসব মহলের কেউ কেউ প্রভাব বিস্তার করতে চাইতে পারে- এটা হয়তো ধারণাগতভাবে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো- তাদের প্রভাবে দুদক প্রভাবিত হবে কিনা। এর উত্তর পরিস্কার- দুদক কোনো মহলের প্রভাবেই প্রভাবিত হবে না। দুদক আইন অনুসারে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগের কোনো আইনি সুযোগ নেই। কোনো প্রকার প্রভাব, আবেগ, সামাজিক বা রাজনৈতিক বা পেশাগত কিংবা ধর্মীয় কোনো পরিচয়ই দুদকের কাছে মুখ্য বিষয় নয়। দুদক চলে আইন নির্ধারিত পথে।

সমকাল: বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি একটি আলোচিত বিষয়। ব্যাংকটির অর্থ আত্মসাতের ৫৬ মামলার চার্জশিট গত সাড়ে পাঁচ বছরেও দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে আপনি কী পদক্ষেপ নেবেন?

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: এ বিষয়ে আমি দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই বলেছিলাম, আমার জানামতে পূর্ববর্তী কমিশনগুলো এসব মামলা করেছে। মামলাগুলোর তদন্ত জটিল প্রক্রিয়ার। তদন্ত কর্মকর্তারা নিরলসভাবে কাজ করছেন। তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুততর সময়ের মধ্যে এসব তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।

সমকাল: দুর্নীতি দমনে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আপনার বক্তব্য জানতে চাই।

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: জনগণের প্রত্যাশাকে আমরা সব সময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কারণ জনগণই প্রজাতন্ত্রের মালিক। আমি সবাইকে প্রথমে আহ্বান জানাব- আসুন, আমি, আমার পরিবার ও আমার প্রতিষ্ঠানকে দুর্নীতিমুক্ত করি। নিজে দুর্নীতিমুক্ত না থাকলে কীভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করবেন? তাই প্রথমে নিজেকেই শুদ্ধাচারী হতে হবে। তবেই আপনি অন্যের দিকে আঙুল তুলতে পারবেন। দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তরুণদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনাদের পিতামাতা দুর্নীতিগ্রস্ত কিনা- এটা আপনারাই সবচেয়ে ভালো জানেন। এটা আপনারাই অনুসন্ধান করতে পারেন। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সংগতি না থাকলেই তো নৈতিক মানদণ্ডের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়। যদি দেখেন, আপনার পিতামাতাই দুর্নীতিগ্রস্ত, তাহলে কী করণীয়? এই নিষ্পাপ তারুণ্যই পরিবারের ভেতরের ওই অনৈতিকতা প্রতিরোধ করতে পারে। এই তরুণ সমাজই আগামী দিনে দুর্নীতিমুক্ত একটি পরিশুদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তুলবে বলে আমি বিশ্বাস করি।

সমকাল: সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্‌: আপনাকেও ধন্যবাদ। সমকালের জন্য শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×