ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

সমকালীন প্রসঙ্গ

ইভিএম গেলেও রাজনৈতিক সংকট থাকল

ইভিএম গেলেও রাজনৈতিক সংকট থাকল

মহিউদ্দিন খান মোহন

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২৩ | ০৪:৩২

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে নির্বাচন কমিশনের সরে আসার সিদ্ধান্ত কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে? এর আগে প্রথমে শতভাগ, পরে অন্তত অর্ধেকসংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহারে নির্বাচন কমিশন যে দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিল, তা থেকে হঠাৎ পিছিয়ে আসার কারণ কী? গত ৩ এপ্রিল নির্বাচন কমিশনে এ সংক্রান্ত বৈঠকের পর ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম জানান, তিনিটি কারণে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে তাঁরা পশ্চাদপসরণ করেছেন। সেগুলো হলো– আর্থিক সংকট, সময়স্বল্পতা এবং রাজনৈতিক দলের মতবিরোধ।

ইসি সচিব যা-ই বলুন, সরকার যদি নতুন ইভিএম কেনা বা পুরোনোগুলো মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিত, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতকে তারা আমলে নিতেন? মূলত বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সময়ে ভোটযন্ত্রের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করা সরকার সমীচীন মনে করেনি। সরকারের সে সিদ্ধান্তের ওপর ইসির সিদ্ধান্তের লেবেল লাগিয়ে দেওয়া হলো মাত্র। যেহেতু ইভিএম মেশিন জোগাড় হচ্ছে না, তাই কাগজের ব্যালটের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর কী?

নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রচারিত হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ইভিএমের পক্ষে সবচেয়ে সোচ্চার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ইভিএম নিয়ে এখন দলগুলোর আপত্তি থাকলেও ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিতে যেতেই হবে।

আওয়ামী লীগ নেতারা যখন ভবিষ্যতে ইভিএম ব্যবহারের আশা করছেন, তখন বিএনপি ইসির এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহ নেই বলে জানিয়েছে। দলটির কোনো কোনো নেতা অবশ্য মনে করছেন, আন্দোলনের মুখেই নির্বাচন কমিশন বাধ্য হয়েছে ইভিএম থেকে ব্যালটে আসতে। এটা জনগণের আন্দোলনের ফসল। অন্যদিকে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, আগামী নির্বাচনের অনেক সমস্যার একটি ছিল ইভিএম। এটা দূর হয়েছে। মূল সমস্যা নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে। বিগত নির্বাচনটি হয়েছিল ইসি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীনদের অশুভ আঁতাতের মধ্য দিয়ে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে নির্বাচনের সময় নিরপেক্ষ সরকার দরকার।

ইভিএম বিষয়ে ইসির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত দেশের নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানে তেমন ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। কেননা, নির্বাচনের প্রধান অংশী বিএনপি পরিষ্কার করেই বলে দিয়েছে, তাদের প্রধান বিবেচ্য নির্বাচনকালীন সরকার। তাই ইভিএম নিয়ে ইসি কী সিদ্ধান্ত নিল, তাতে তাদের কোনো আগ্রহ নেই। ফলে ইসির এ সিদ্ধান্তে বিএনপির আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই। বিএনপির আন্দোলনের চাপে নয়, বরং সরকার টাকা বরাদ্দ করেনি বলেই ইসি ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। সরকার যদি ইভিএম বাবদ ইসিকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিত তাহলে বিএনপি মাথা কুটে মরে গেলেও ইসি ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসত না। অন্তত অতীতে ইভিএম নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের কথাবার্তা সেটাই প্রমাণ করে।

তা ছাড়া ইভিএমের মোহ থেকে নির্বাচন কমিশন যে এখনও মুক্ত হতে পারেনি, তার প্রমাণ আসন্ন পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএমে ভোট গ্রহণের সিদ্ধান্ত। সুতরাং এটা পরিষ্কার– সুযোগ থাকলে ইসি ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বদলাত না। আর্থিক সংকটের কারণে বাধ্য হয়েই তারা এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইসির এ সিদ্ধান্তকে বিক্রমপুরের আঞ্চলিক প্রবাদ ‘বিপদে পড়লে বিড়াল মান্দার গাছে চড়ে’র সঙ্গে তুলনা করা যায়।

আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে জনমনে যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে, তার অবসান কীভাবে হবে কেউ বলতে পারে না। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবিতে বিএনপিসহ আন্দোলনরত দলগুলো এখন পর্যন্ত যে রকম অনমনীয়তা প্রদর্শন করে চলেছে, তাতে পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যায় কিনা– সে আশঙ্কা করছেন অনেকে। নির্বাচন কমিশন এর মধ্যে আলোচনার জন্য বিএনপিকে আমন্ত্রণ জানালেও তারা তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, এই কমিশনের সঙ্গে সংলাপ বা আলোচনা অর্থহীন। তাদের একমাত্র লক্ষ্য সরকারের পদত্যাগ ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার। সে সরকার ছাড়া অন্য কারও সঙ্গে তারা আলোচনায় আগ্রহী নয়।

এদিকে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে অনুষ্ঠিত দলীয় এক বৈঠকে আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে বলে উল্লেখ করে নেতাদের বলেছেন, ‘এবার নিজের নির্বাচন নিজেকেই করতে হবে। এবার আমার দিকে তাকিয়ে থেকে কোনো লাভ নেই।’ (৩১ মার্চ)।

প্রধানমন্ত্রীর এ উক্তিকে অনেকেই একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের আভাস বলে মনে করছেন। কেননা, বিগত দুটি সাধারণ নির্বাচন নিয়ে দেশ-বিদেশে যে প্রশ্ন উঠেছে, তিনি হয়তো চান না পুনরায় ওই ধরনের প্রশ্ন উঠুক। তবে সে ধরনের নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব দলের অংশগ্রহণ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। বিএনপিকে আস্থায় না আনা গেলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশা হয়তো সুদূরপরাহত হয়েই থাকবে। 

এদিকে গত ৩১ মার্চ সমকালের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রশ্নে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সহায়তা চেয়ে বিএনপি শিগগিরই জাতিসংঘকে চিঠি দেবে। তাতে অতীতের দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার হরণ এবং আগামী নির্বাচনও একতরফাভাবে করতে সরকারের ‘ষড়যন্ত্রের’ বিষয়টি তুলে ধরা হবে। দলটি ইউরোপীয় কমিশন এবং কমনওয়েলথকে একই ধরনের চিঠি দেবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিএনপির এসব তৎপরতা থেকে এটা অনুমান করা যায়, তারা তাদের নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি থেকে এখন পর্যন্ত এতটুকু সরে যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার ইসির সিদ্ধান্ত উদ্ভূত সংকট নিরসনে কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না।

মহিউদ্দিন খান মোহন: সাংবাদিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

আরও পড়ুন

×