ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ঈদুল ফিতর

উৎসব হোক রাজনৈতিক সমঝোতার উপলক্ষ

উৎসব হোক রাজনৈতিক সমঝোতার উপলক্ষ
×

নূরুননবী শান্ত

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৩ | ১৮:০০

ঈদের মিলন-দর্শন বিবেচনায় নিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশে কমপক্ষে তিন দিন রাষ্ট্রীয় ছুটি থাকে। এর সঙ্গে অন্য কোনো ছুটি যুক্ত হলে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্মিলনের এই উৎসবের মেয়াদ বৃদ্ধি পায় স্বাভাবিকভাবেই। ঈদের ছুটি অমুসলমানদের জন্যও প্রযোজ্য। তাই ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে সব নাগরিকের সুযোগ হয় ঈদ উৎসবে অংশীদার হওয়ার।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরাও বুক মেলান, মনে যা-ই থাক। কিন্তু সারাবছর পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের কঠোর চর্চা চালিয়ে আচমকা এক দিন হৃদয়ে হৃদয়ে ধর্ম-সুতোর বন্ধন সহজ নয়। বিশেষ করে সর্বসাধারণ যখন অব্যাহত বিভেদের রাজনীতি ও ক্রমিক অর্থনৈতিক সংকটের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে অবদমিত জীবন-যাপন করতে থাকে; তখন ঈদের সম্মিলনেও বিভেদের ভয় কমে না। মানুষে মানুষে উন্মত্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন বৈষম্য সৃষ্টি করে; রাজনৈতিক হিংসা থেকে তেমনি জন্ম নিতে পারে জাতিগত বিশৃঙ্খলা।

এমনিতেই আমাদের বৈষম্য বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক খানা আয় ও ব্যয় জরিপ বাংলাদেশে বৈষম্য বৃদ্ধির তথ্য দিয়েছে। কভিডের সংকট কটিয়ে দারিদ্র্যের হার কিছুটা কমলেও, আয় ও ভোগ উভয় ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এ রকম নানা বাস্তবতার মধ্যেই প্রতি বছর ঈদ আসে। এবারও আসছে। অধিকন্তু রাজনীতির টেবিলে ও মাঠে বিভিন্ন পক্ষের পরস্পরবিরোধী চেহারা চোখের সামনে নিয়ে জনগণ ঈদ উৎসব উদযাপন করতে যাচ্ছে।

ঈদের মতো সর্বজনীন সম্মিলনের সময়ে রাজনীতির বিরোধপূর্ণ ইস্যুগুলোও নিশ্চয় বিশেষভাবে মনোযোগ পেতে পারে। রাজনীতির পরস্পরবিরোধী পক্ষগুলো খোলা মনে অন্তত শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারে। অথচ রাজনীতি কেবল নিজের রাস্তা প্রশস্ত করতে চায়! তাই কেবল দলের মধ্যেই ভালোবাসা সীমাবদ্ধ রাখে। 

ঈদের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে ভিডিও কলে মতবিনিময় করেছেন। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন মাথায় রেখে তিনি দলীয় নেতাকর্মীকে সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি তাঁর দলের নেতাকর্মীকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে যেতে বলেছেন এবং সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের চিত্র আর বিএনপি আমলের অপশাসন ও দুর্নীতির চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরতে বলেছেন। তিনি দলের নেতাকর্মীকে নিজেদের মধ্যে দলাদলি বন্ধ করারও নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি ঈদ ঘিরে সরকারের পক্ষ থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে ঈদ উপহার পাঠানো হচ্ছে। এ ছাড়াও তারকা নেতারা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার দরিদ্র নেতাকর্মীসহ অনেককেই উপহার ও ঈদ সালামি দিচ্ছেন। অর্থও দিচ্ছেন সরাসরি। তবে এই উপহার দেওয়া ও অর্থ প্রদান করা রাজনৈতিক কারণেই সীমাবদ্ধ রয়েছে দল ও দলীয় সমর্থকদের মধ্যে। বিএনপিও ঈদ ঘিরে একই রকম উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। নিখোঁজ হওয়ার মতো অঘটনের শিকার নেতাকর্মীর পরিবারগুলোকে ঈদ উপহার দেওয়া এবং নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার মানুষের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় তাঁরাও করছেন এবং করবেন। নিশ্চয় তাঁরা গত ঈদের মতো এবারও সরকারি দলের ব্যর্থতা তুলে ধরবেন। এটাই রাজনীতি।

তবে এই শুভেচ্ছা বিনিময় ও ভালোবাসা প্রদর্শনের মহিমাময় দিনে এমন তো হতেই পারত– পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন এবং উপহার বিনিময় করছেন। সবচেয়ে ভালো হতো যদি সরকারপ্রধান নিজেই সব দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ গ্রহণ করতেন। সব দল প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিত কিনা, তা নিয়ে নিশ্চয় সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে ঈদ ঘিরে এ রকম মিলনের উদ্যোগ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের চিরায়ত বিভেদ ও বিদ্বেষ দূর করার একটি শুভ সূচনা নিশ্চয় হতে পারত। ডিজিটাল বাংলাদেশে অন্তত ভার্চুয়ালি পরস্পর কথা বলার সুযোগ সব দলের রাজনৈতিক নেতারা কাজে লাগাতে পারেন।

সাধারণ মানুষের পর্যবেক্ষণ হলো, দোষারোপ ও গালাগালির রাজনীতির প্রতি দেশের সিংহভাগ মানুষ বীতশ্রদ্ধ। মানুষ বিরোধী দলের কাছে যেমন সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা আশা করে, তেমনি সরকারি দলের কাছেও আশা করে সমালোচনা গ্রহণ করার রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা। কিন্তু সব পক্ষই কথায় ও কাজে অসহিষ্ণুতার স্বাক্ষর রাখছে।

আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকাকালীন দেশে অনেক দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবু মানুষের হতাশা আছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে; ক্ষোভ আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যায্য প্রয়োগ নিয়ে; বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে বাধা সৃষ্টি করা নিয়ে। এমনকি নির্বাচনে স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগ করার নিরঙ্কুশ অধিকার নিয়েও মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। একই সঙ্গে বিএনপি আমলের অপশাসনও মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। মানুষ তাই হতাশ। তাদের সামনে হয় টুই ডেল ডাম, অথবা টুই ডেল ডি।

বাস্তবতা এই, দেশে অনেক রাজনৈতিক দল থাকলেও সর্বসাধারণের চোখে এ দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপি– এ দুটি শিবিরে বিভক্ত। দেশের বয়স অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আর কোনো দল নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়নি। হয় তারা আওয়ামী লীগের লেজুড় হয়েছে; নয় তো বিএনপির। জনমনে এর দৃশ্যমান প্রভাব রয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতিবিমুখতা অস্বীকার করার জো নেই। পরিস্থিতি এতটাই জটিল, ধর্মনিরপেক্ষ হয়েও আওয়ামী লীগকে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়েছে। আবার সুস্পষ্ট স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে রাজনীতি করলেও বিএনপি পাশে পেয়েছে বেশ কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দলকে। এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই জটিল বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিকাশে এগিয়ে আসতে হবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোকেই।

ঈদের মতো বিভেদমুক্তির পরম উৎসবের সময়ে অন্তত চিরায়ত বিরোধী অবস্থানে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সাধারণ শুভেচ্ছা বিনিময়ের দৃশ্যমান সূচনা হতে পারে। ঈদ হয়তো পারে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সুযোগ করে দিয়ে আমাদের অস্থির রাজনীতিকে সুস্থিরতার দিকে নিয়ে যাওয়ার দ্বার উদ্ঘাটন করতে। বিরুদ্ধ রাজনীতিতে শান্তির প্রধান শর্তই হলো, পরমতসহিষ্ণুতার সংস্কৃতি গড়ে তোলা ও জারি রাখা। প্রতি মুহূর্তে পরস্পরকে পিঠ দেখিয়ে পরমতসহিষ্ণুতার চর্চা সম্ভব নয়। ঈদ আমাদের বলে আলিঙ্গন করতে। এত বড় উৎসব নিশ্চয় হয়ে উঠতে পারে ভিন্নমতের সমন্বয়ের সূত্র।

নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক

আরও পড়ুন

×