ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মূল্যস্ফীতি

উন্নয়নের লাভ-লোকসান হিসাবের এখনই সময়

উন্নয়নের লাভ-লোকসান হিসাবের এখনই সময়
×

নূরুননবী শান্ত

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৩ | ১৯:২৩

নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছি আমরা ২০১৫ সালেই। এলডিসি অর্থাৎ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আগামী চার-পাঁচ বছরের মধ্যেই আমরা দাঁড়াব উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ভাবতে ভালোই লাগে। দুর্নীতি, দুর্যোগ, দূষিত রাজনৈতিক-সামাজিক-প্রাকৃতিক পরিবেশের বহুমুখী চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশের এই উন্নতি। কিন্তু দেশের মোট আয়ের ৪১ শতাংশই যখন মাত্র ১০ শতাংশ ধনিক শ্রেণির হাতে, তখন এ উন্নতির লাভ-লোকসান নিয়ে কথা বলা দরকার।

দেশের বৃদ্ধিপ্রাপ্ত আয় এত কম জায়গায় পুঞ্জীভূত হয়েছে যে, তার ঝলকে ঝলসে যেতে শুরু করেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির চৈতন্য। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিপরীতে উচ্চ বৈষম্যের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হওয়ার পরিস্থিতিকে মাথাভারী, পেট মোটা, সরু হাত-পাওয়ালা, হাড্ডিসার মানুষের ছবির মতো মনে হয়। এই ছবি জানিয়ে দেয়, দেশের মোট আয়ে গরিবের তো বটেই, এমনকি মধ্যবিত্তেরও ভাগ সামান্য।

এ দেশে ২২ হাজার টাকায় একটি শার্ট বিক্রি হয়; ২০ হাজার টাকা কেজি দরের জিলাপি চলে; ৮৫ হাজার টাকার লেহেঙ্গা দোকানে পড়ে থাকে না; ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় আইসক্রিম খাওয়ার মানুষের অভাব নেই। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ কখনও পেঁয়াজ কেনা বন্ধ করে; কখনও কাঁচামরিচ খাওয়া ছাড়তে বাধ্য হয়; মাংস খাওয়ার কথা ভুলে যায়; মাছের বাজারে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসে। বাস ভাড়ার ভয়ে ঘর থেকে বের হয় না হাজারো গ্রাম-নগরের মানুষ!

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেছেন, ‘আগে সম্পদ সৃষ্টি করছি, তারপর সেই সম্পদের সুফল গড়িয়ে গড়িয়ে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব জায়গায় পৌঁছে যাবে। গরিব মানুষের আয় বাড়বে। এতে বৈষম্য কমবে, দারিদ্র্য কমবে। আমরা এখন সেই কৌশলেই এগিয়ে যাচ্ছি।’ মন্ত্রীর কথা থেকে পরিষ্কার– এমন অর্থনৈতিক পরিকল্পনাই সরকার বাস্তবায়ন করছে, যাতে সম্পদ এক জায়গায় জড়ো হতে হতে একসময় উপচে উচ্ছিষ্টরূপে গরিবের ঘরে গিয়ে হাজির হয়! মন্ত্রী অবশ্য এ কথা বলেন না, তাদের পরিকল্পনা অনুসারে গরিবের আয় ১০০ টাকা বাড়লে, ধনির আয় বাড়বে ১ কোটি টাকা! এভাবে গরিবের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করা নিশ্চয় যাবে; বৈষম্য কমানো যাবে না।

বড়ই পরিতাপের বিষয়, যে বৈষম্য থেকে মুক্তি পেতে বাঙালি সাম্যের স্বপ্নময় স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিল, ৫০ বছর না যেতেই সেই বাংলাদেশ উচ্চ বৈষম্যেরও দ্বারপ্রান্তে। পাকিস্তান আমলে সব সম্পদ জড়ো হতো পশ্চিম পাকিস্তানের পাঞ্জাবি শাসক ও তাদের সুবিধাপ্রাপ্ত কয়েক পরিবারে। আজ তা জড়ো হচ্ছে দেশের ১০ শতাংশ ধনীর ঘরে। বৈষম্যমূলক শাসনপ্রণালি শুধু অর্থনৈতিক বৈষম্যেরই জন্ম দেয় না; বাড়িয়ে তোলো নারী-পুরুষ বৈষম্য; মালিক-শ্রমিক বৈষম্য; প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের বৈষম্য; সরকারি ও বেসরকারি বৈষম্য। বৈষম্যমূলক শাসনপ্রণালি ধনীদের কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়। ঋণখেলাপিদের আরও ঋণ সুবিধা দেয়। দেশের টাকা বিদেশে পাচার করার সুযোগ দেয়। প্রত্যক্ষ কর ব্যবস্থা প্রগ্রেসিভ না করে বরং ধনী-গরিব-নিঃস্ব সবার ওপর আরোপ করে বর্ধিত মূল্য সংযোজন কর। মালিক শ্রেণিকে এমনভাবে প্রণোদনা সুবিধা দেওয়া হয়, যার সামান্যও গড়িয়ে পড়ে না শ্রমিকের হাতে। কর আরোপের চেষ্টা করা হয় এমনকি আয়হীন মানুষের ওপরে, অথচ ধনীকে দেওয়া হয় বহুমাত্রিক কর রেয়াত সুবিধা। দুর্নীতি করে রাতারাতি ধনী হয়ে যাওয়া কেউ ধরা পড়লেও বিচার হয় না, বরং দুর্নীতি নিরোধে কঠোর অবস্থান নেওয়া সরকারি কর্মকর্তাকে বরখাস্ত হতে হয়।

মুষ্টিমেয় ধনীকে বাদ দিলে সারাদেশের মানুষ যখন মূল্যস্ফীতির চাপে হাঁসফাঁস করে, তখন সর্বস্তরের জনগণের করের টাকায় শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়ে বৈষম্যকে প্রকট করে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ধনী হওয়ার শত শত গল্প প্রকাশ পেলেও ধনীরা ভিআইপি মর্যাদায় বুক ফুলিয়ে পথ চলতে পারে এই ব্যবস্থার সমর্থনে। ধনিক শ্রেণির প্রতি স্পষ্ট পক্ষপাতমূলক শাসনপ্রণালিই প্রধানত দায়ী এই উচ্চ বৈষম্যের জন্য। এই প্রণালি ধনিদের অস্বাভাবিক আয় বৃদ্ধিকে ইউনিট ধরে দেশের উন্নতি হিসাব করতে পারে, আর গরিবের উন্নতি হিসাব করে ধনীর ঘর থেকে করুণা আকারে গড়িয়ে পড়া আয়ের উচ্ছিষ্ট দিয়ে। এই চুইয়ে পড়া অর্থনৈতিক পরিকল্পনা চাহিদাকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করলেও সমাজকে নিয়ে যাবে ভারসাম্যহীনতার চূড়ান্ত পর্যায়ে। বৈষম্য দূরীকরণ তাই হতে হবে উন্নয়ন পরিকল্পনার মৌলিক এজেন্ডা। পরিকল্পনা করে বৈষম্য সৃষ্টি করাকে সংবিধান লঙ্ঘন করার ঘটনা হিসেবে দেখতে হবে।

নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক

আরও পড়ুন

×