ঢাকা সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আদিবাসী দিবস

টেকসই উন্নয়ন অর্জনে দরকার সবার অংশগ্রহণ

টেকসই উন্নয়ন অর্জনে দরকার সবার অংশগ্রহণ
×

সরকার আদিবাসীদের ভাষা, সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্ব আরোপ করেছে -সংগৃহীত

মোহাম্মদ আতিক রহমান

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

জাতিসংঘের তথ্যমতে, বিশ্বে শ-খানেক দেশে প্রায় ৫০ কোটি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী রয়েছে। তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি, ইনডিজেনিয়াস পিপল, ট্রাইবাল অথবা নেটিভ পিপল ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। অবশ্য এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে প্রায় প্রতিটি দেশে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ প্রান্তিক জনগোষ্ঠী হিসেবে দিনাতিপাত করছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের সমাজে  তাদের উপেক্ষা করা হয়। প্রতিনিয়ত তারা বঞ্চনা ও অবিচারের শিকার। এমনকি অনেক দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষা করা হয় তাদের নাগরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার। এ চিত্র উন্নত বিশ্ব বলে পরিচিত পশ্চিমা দেশ, এশিয়া, আমেরিকাসহ আফ্রিকায়ও একই রকম।

সারাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং তাদের অধিকারের বিষয় বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত হয়। ১৯৮২ সালের ৯ আগস্ট জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত আদিবাসী জনগোষ্ঠীবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভায় তারিখটিকে সর্বপ্রথম প্রস্তাব করা হয়। এক যুগ পর ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪৯/২১৪ প্রস্তাবনা অনুযায়ী ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
প্রতি বছরই জাতিসংঘ দিনটি সামনে রেখে প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। এ বছরের প্রতিপাদ্য– ‘আদিবাসী তারুণ্যই তাদের আত্মসংকল্পের কর্তা’ জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজায়নের পক্ষে লড়াই, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং আন্তঃপ্রজন্মীয় সংযোগে আদিবাসী তরুণ-তরুণীদের ভূমিকাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে এবারের প্রতিপাদ্যে।

বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা লাভের পরপরই দেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষসহ সবার নাগরিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকারকে পবিত্র সংবিধানের মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে‌। উপরন্তু দেশের পাহাড় ও সমতলে বসবাসরত সব জাতিসত্তা, নৃগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণের কথা সংবিধানের ২৩(ক) ধারায় উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে এটা বলা যেতে পারে, অনেক উন্নত দেশে যেখানে তাদের নাগরিক মর্যাদা ও অধিকার পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে; বাংলাদেশ সেদিক দিয়ে অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি ছাড়া অন্য দেশীয় জাতিগোষ্ঠীর মানুষও লড়াই করেছিল। তারাও আত্মত্যাগে পিছপা হয়নি। স্বাধীন বাংলাদেশ সে স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্যও করেনি।

বর্তমানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণ, গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশ, কৃষিবিপ্লব ও শিল্পায়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্ববাসী একে ‘ডেভেলপমেন্ট মিরাকল’ নামে ইতোমধ্যে অভিহিত করেছে। বাংলাদেশ বর্তমানে সাফল্যের সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার তাদের আত্মমর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখাসহ আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শিক্ষাক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার ব্যাপক কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। এ ক্ষেত্রে শিশুদের জন্য নৃগোষ্ঠীর ভাষায় প্রাক-প্রাইমারি বই প্রকাশ এবং স্কুলগুলোতে ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। সেই সঙ্গে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি খাতের উন্নয়নসহ পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজারের মতো। তারা মূলত পাহাড় ও সমতলে বসবাস করে। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থা, দারিদ্র্যের মাত্রা, শিক্ষার হার, পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলার প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তাই পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এলাকা ও গোষ্ঠীভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

দেশের সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীকে বঞ্চিত করলে কোনোক্রমেই টেকসই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ সরকার তাগিদ দিয়ে আসছে অপরাপর জাতিগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে। জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারে তাদের নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে; বিশ্ব পরিবেশ দিবসে র‍্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করছে; টেকসই উন্নয়নের ব্যাপারে মানুষকে বোঝাচ্ছে। সর্বোপরি সবুজায়নের দিকে মনোযোগী হতে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
এটি বলা সমীচীন, এসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ধরিত্রীর এক অপূর্ব সংযোগ রয়েছে। তাদের বিশ্বাস– এই ভূমি, পানি, বায়ুই অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। তাই তারা ধরিত্রী মাতাকে রক্ষায় বদ্ধপরিকর। এই বিশ্বাস সামনে রেখে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং উন্নত বাংলাদেশ গঠনে নিজেদের মধ্যে মতভেদ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন।

ড. মোহাম্মদ আতিক রহমান: সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×