ডিজিটাইজেশন
সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে সংশয়
নূরুননবী শান্ত
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০
পরিভাষাগত দিক থেকে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ ও ‘সাইবার নিরাপত্তা’ আলাদা শোনালেও এ দুয়ের অর্থগত ভিন্নতা নিয়ে সাধারণ মানুষের সংশয় আছে। কেননা, আমরা ডিজিটাল ও সাইবার শব্দ দুটিকে একই অর্থে ও ভাবে বুঝি। তা ছাড়া সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশের বিপুল প্রচার ও কার্যক্রমের কারণে সাইবার শব্দটি আমাদের মাথায় কম কাজ করা স্বাভাবিক। তবে এখন হয়তো ডিজিটাল ও সাইবার উভয় পরিভাষা সমানে চালু থাকবে; যেহেতু একদিকে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ দ্রুতই বিপজ্জনক এক্সপ্রেসওয়েতে পরিণত হয়েছে, আরেকদিকে আমাদের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ নাম ধারণ করতে যাচ্ছে।
আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরিবর্তন করা হয়েছে, বাতিল করা হয়নি। নামটা নতুন করে দেওয়া হয়েছে, কিছু ধারা পরিবর্তন করা হয়েছে।’ তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, নামটা পরিবর্তন করা হয়েছে আইনের ‘ব্যাপ্তি বাড়ানোর জন্য’। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘পরিবর্তনটা এতটাই করা হয়েছে, সেখানে যাতে কোনো দ্বিধা তৈরি না হয়, সে জন্য ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট নাম রহিত করে তার পরিবর্তে সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট করা হয়েছে। ব্যাপারটা হচ্ছে, আইনের পরিবর্তন আনা হয়েছে, নামে পরিবর্তন আনা হয়েছে, অনেক জায়গায় সাজার পরিমাণ বেশি ছিল, সেটা কমানো হয়েছে, যেখানে উপধারা দিয়ে পুনরায় অপরাধ করলে সাজা দ্বিগুণ হয়ে যেত, সেটা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হয়েছে। কোনো সংশয় যাতে তৈরি না হয়, সেই কারণে রহিতকরণ ও হেফাজতকরণের বিধান রেখে সাইবার নিরাপত্তা আইন করছি।’ তাঁর এ বক্তব্যের পরও আমরা সংশয়মুক্ত, দ্বিধাহীন হতে পারছি না। প্রধান গণমাধ্যমগুলো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল’ বা ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায়’ ইত্যাদি শিরোনামে সংবাদ পরিবেশন করেছে। এসব সংবাদকে আইনমন্ত্রী ‘সত্য নয়’ বললেও, সমালোচিত আইনটি বাদ দেওয়ার জন্য টিআইবিসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো, এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
সোমবারই মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার ওয়াশিংটনে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, ‘সমালোচকদের গ্রেপ্তার, আটক ও মুখ বন্ধ রাখার জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হয়েছে।’ মিলার আরও মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা আইন সংস্কার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানাই।’ সমালোচিত আইনটি বাতিল বা বাদ না হওয়া সত্ত্বেও এসব সাধুবাদ ও স্বাগত জানানোও আমাদের সংশয়ের কারণ বৈকি।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী তাঁর ভাষায় আইনটি পরিবর্তন বা সংস্কার সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন আধুনিকীকরণের পাশপাশি এর অপব্যবহার বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ অর্থাৎ মন্ত্রী স্বীকার করেছেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার হয়েছে। কিন্তু এ আইনের অপব্যবহার করে দেশের আটটি সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মামলার প্রশ্নে মন্ত্রী জানাচ্ছেন, ‘যেসব মামলা পুরোনো আইনে হয়েছে, সেই পুরোনো আইনে যে শাস্তি, সেই শাস্তি অপরাধীকে দিতে আদালত বাধ্য।’ এ ক্ষেত্রে আইনের অপব্যবহারের বিচারাধীন আসামিদের আদালত খালাস দিতে বাধ্য কিনা, তা উহ্য রাখা হয়েছে।
আমরা সাধারণ মানুষ আইন বিষয়ে অজ্ঞ। তাই আইনের ঘাটে ঘাটে ধরা খাওয়ার ভয় আমাদের সব সময় থাকে। আজকাল কথা বলতে এমনিতেই সংশয়ে থাকি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচকদের মতামত না নিয়েই যে নতুন সাইবার নিরাপত্তা আইন পাস করার প্রক্রিয়া হাতে নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে তাই আমরা সংশয়শূন্য হতে পারছি না। ডিজিটাল বা সাইবার দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার উপায় আপাতত আমাদের হাতে নেই। ডিজিটাল বা সাইবার দুনিয়ার শয়তানি ও অপরাধ থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সুরক্ষার বিষয়টি যে গুরুত্বপূর্ণ– সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। আইন তাই দরকারি। কিন্তু যে আইন শুধু ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে নিরাপত্তা দেয় বলে মনে হয়, নাগরিককে ভীত করে; সে আইনের আবশ্যকতা নিয়ে নাগরিকদের মনে সংশয় হওয়া স্বাভাবিক। কেননা আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুসারে, নতুন আইনে পুরোনো আইনের কিছুই বাদ যায়নি। শুধু কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি কমেছে, বরং আইনের পরিসর বেড়েছে এবং নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। আমরা মনে করি, বিতর্কিত আইন সংস্কার করে বানানো নতুন আইনটি সংসদে তোলার আগে দেশের বিদ্বৎ সমাজের প্রতিনিধি, সাংবাদিক, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মীসহ নাগরিক সমাজের মতামত গ্রহণ করেই আইনটি চূড়ান্ত করা আবশ্যক। তাহলে জনসাধারণ হয়তো সংশয়মুক্ত হতে পারে। ভবিষ্যৎ বিতর্কের ঝুঁকি কমতে পারে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন শুরু থেকেই সমালোচিত। এই আইন বাক্স্বাধীনতাকে শুধু সীমিতই করেনি, সাইবার অপরাধ রোধ করতেও ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের সমালোচকরা এর ফলে নাজেহাল হয়েছে। ভয়ে কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু রিজার্ভ চুরির মতো ভয়াবহ ঘটনা ঠেকাতে পারেনি। ঠেকাতে পারেনি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের গুজব রটিয়ে মানুষ খুন করা অথবা সংখ্যালঘুদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া! প্রকৃত অপরাধীর সাজা নরম করার বিধান কাজের কথা নয়। মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতাকে সমুন্নত রেখে সাইবার অপরাধ দমনে আইনটি আসলেই কার্যকর হবে কিনা, তা যাচাই করার অধিকার নাগরিকদের আছে। সেটা না করে তাড়াহুড়ো করে আইন পাস করার মাধ্যমে নাগরিকদের নিঃসংশয় করা সম্ভব নয়।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মূলত ব্যবহার হয়েছিল ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে। সে আইন ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলেই সরকার আজ তা সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। যদিও সর্বমহলের দাবি ছিল আইনটি সম্পূর্ণ বাতিল করার। এ ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা গুণগত না হলে ইতিবাচক কিছু ঘটবে না বলে মনে হয়। নতুন আইনের প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাইবার অপরাধ থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া।
নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক