কূটনীতি
নতুন সমীকরণ তৈরি করবে মাখোঁর সফর
দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সফরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-প্যারিস সম্পর্ক আরও জোরদার হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের নভেম্বরে প্যারিসে দ্বিপক্ষীয় সফরে গিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি ইমানুয়েল মাখোঁকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর ফ্রান্স সফরের সময় দুই দেশ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদারের জন্য ব্যবসা, বিনিয়োগ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় জোর দিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্যারিসের এলিসি প্রাসাদে দুই শীর্ষ নেতার বৈঠকের পর উভয় দেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্মতিপত্রে সই করে।
এতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা বাড়ানোর জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রযুক্তি বিনিময়ের মতো বিষয় যুক্ত রয়েছে। আগামীকাল ঢাকায় আসছেন ইমানুয়েল মাখোঁ। তাঁর এ সফর দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক, আন্তর্জাতিক, ভূরাজনৈতিক সব মিলিয়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
ফ্রান্সের সঙ্গে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর থেকেই উষ্ণ হয়েছে। এবারের সফরে সেই উষ্ণতা আরও বাড়বে বলে আশা করা যায়। আমাদের তৈরি পোশাকের অন্যতম বাজার ফ্রান্স। তাই কীভাবে এ খাতকে আরও শক্তিশালী করা যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যায়।
দিল্লিতে জি২০ শীর্ষ সম্মেলন শেষে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফর নানা দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯০ সালে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর পর অর্থাৎ তিন দশক পর ফরাসি কোনো প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে অংশীদারিত্ব বহুমুখী করার সুযোগ হিসেবে দেখছে উভয় দেশ।
ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরটি মূলত ২০২১ সালে প্রধানমন্ত্রীর প্যারিস সফরের ফলোআপ। ওই সময় নেওয়া দুই শীর্ষ নেতার সিদ্ধান্তের আলোকে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ঢাকায় আলোচনা হবে। ১৯৯০ সালের বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশ এক নয়। এরই মধ্যে নানা বিষয়ে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি অর্জন করে বিশ্বদরবারে নিজেদের অবস্থান জানান দিতে পেরেছে বাংলাদেশ। এসব কারণে এশিয়া তো বটেই, সারাবিশ্ব বাংলাদেশকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়।
পশ্চিমা বিশ্ব অনুধাবন করতে পেরেছে, ছোট রাষ্ট্র বলে বাংলাদেশকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে পরিবেশ বিপর্যয় বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এ ব্যাপারে বিশ্বজনমত তৈরিতে দেশটির ভূমিকা প্রশংসনীয়। ফ্রান্স-বাংলাদেশের এ বিষয়ে মতৈক্য রয়েছে। উভয় দেশ জলবায়ুর ঝুঁকি মোকাবিলায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশের সঙ্গে ফ্রান্সের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭২ সালে ফ্রান্স বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোর বাংলাদেশের পাশে এগিয়ে আসার মূল কারণ বঙ্গবন্ধুর সফল পররাষ্ট্রনীতির বড় প্রতিফলন। ইমানুয়েল মাখোঁর ঢাকা সফরটি বহুমাত্রিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের মেরূকরণ নিয়ে যখন ভূরাজনীতি নানাভাবে ঘুরপাক খাচ্ছে, তখন মাখোঁর সফর বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশ কারও সঙ্গে বৈরিতা চায় না। সবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্রান্স নানা বিষয়ে কাজ করছে। এ ছাড়া দেশটি জাতিসংঘের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের অন্যতম। জাতিসংঘে তাদের ভেটো পাওয়ার রয়েছে। এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে বলেই এ সফর।
এ সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ফ্রান্সের কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি ফ্রান্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগেই করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু-২ স্যাটেলাইটও যৌথভাবে করা হবে। উভয় দেশ বিনিয়োগে আগ্রহী। সুতরাং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এ সফর নিঃসন্দেহে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা যায়। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতের প্রতিযোগিতার কারণে অন্য দেশের ভূমিকা আলোচনার বাইরে ছিল। কিন্তু এশিয়ায় ফ্রান্সের যে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে, তা আবারও প্রমাণিত হচ্ছে। বাংলাদেশে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নানামুখী বিদেশি তৎপরতা চলছে। বাংলাদেশ বিদেশি বন্ধুদের পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে– নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশ সাংবিধানিক ধারা বজায় রাখতে অঙ্গীকারবদ্ধ– এ বার্তা ফ্রান্সও পাবে। এ সফরে দ্বৈত ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় সরকারের সাফল্য ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সামনে তুলে ধরা হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গটি আলোচনায় অগ্রাধিকার পাবে। রোহিঙ্গাদের কীভাবে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে আলোচনা হতে পারে। জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য হিসেবে ফ্রান্স এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা নিতে পারে। বলা যায়, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের সফরটি খুবই ফলপ্রসূ হবে। প্রচলিত ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে মাখোঁর সফর।
বাংলাদেশের নির্বাচন ঘিরে কোনো কোনো রাষ্ট্রের চাপের বিষয়টি আপেক্ষিক। আগেই বলেছি, বাংলাদেশ তার অবস্থান পরিষ্কার করেছে এবং করছে। নির্বাচন, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিজেদের মতো করে সংবিধানের মধ্যে থেকে মোকাবিলা করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অনেক দেশ সংবেদনশীলভাবে বাস্তবতা অনুধাবন করেছে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার ব্যাপারে বন্ধু রাষ্ট্র তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে।
বিদেশি বন্ধুরা ঢাকা সফর করছেন। এটি ইতিবাচক দিক। ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব থাকার কারণেই তারা পর্যায়ক্রমে আসছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের পেন্ডিং সফরটিও হয়ে গেল। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে আলোচনা করেছেন। তাঁর এ সফর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা যায়। বাংলাদেশ সবসময় ভারসাম্য বজায় রাখার কূটনীতিতে বিশ্বাস করে। রাশিয়ার সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মহান মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার ভূমিকা বাঙালিরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করে। জ্বালানি ক্ষেত্রে রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের যে সম্পর্ক রয়েছে, তা আরও সম্প্রসারিত হবে।
রাশিয়াও জাতিসংঘের স্থায়ী সদস্য। তাই রোহিঙ্গার বিষয়ে তাদেরও ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। বাংলাদেশের বহুমুখী কূটনীতির প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি। সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়– এ নীতিতে বাংলাদেশ ভূরাজনৈতিকভাবে নিজেদের অবস্থান দিন দিন পাকা করছে।
ড. দেলোয়ার হোসেন: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রেষণে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) সদস্য হিসেবে নিয়োজিত
- বিষয় :
- কূটনীতি
- দেলোয়ার হোসেন
- মাখোঁ