ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কূটনীতি

মাখোঁর সফরে আমজনতার কী লাভ হলো?

মাখোঁর সফরে আমজনতার কী লাভ হলো?
×

নূরুননবী শান্ত

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ০১:১৫

আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশের জনমনে অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কা রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার মাঝেমধ্যে যেসব কথা বলেন, তাতে প্রকারান্তরে স্বীকার করেন– সরকার যথাযথ পরিবেশ নিশ্চিত না করলে কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু নির্বাচনের নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। এর থেকে পরিষ্কার হয়, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতার কথা যত জোর গলায়ই প্রচার হোক, বর্তমান ব্যবস্থায় সরকারই নির্বাচনের সর্বোচ্চ প্রভাবশালী।

এমনকি দায়িত্বপ্রাপ্ত আমলারাও যে মাঠ পর্যায়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ ভূমিকা পালন করবেন– তার নিশ্চয়তা নেই। কেবল জামালপুরের ডিসি নন; বহু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পুলিশ কর্মকর্তার বিশেষ দলের প্রতি পক্ষপাতমূলক বক্তব্য জনসাধারণকে শুনতে হচ্ছে। অন্যদিকে যারাই যৌক্তিক, নিরপেক্ষ নির্বাচনের কথা বলছেন, তারা হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এ রকম পরিস্থিতিতে সব নাগরিকের স্বাধীন ভোটাধিকার নিশ্চিত করার প্রয়োজনে নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সংলাপই হতে পারত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সমুন্নত রাখার উপায়। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি।

নাগরিক সমাজও এসব নিয়ে কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত, ভীত। সাধারণ মানুষ জীবন ধারণের দুঃসাধ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে ক্লান্ত-শ্রান্ত। ক্ষমতাপ্রেমী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের জন্য তা বেশ সুবিধার ব্যাপার। সরকার প্রায় ঘোষণা দিয়েই বসেছে যে, অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি কেবলই বৈশ্বিক ব্যাপার এবং বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তারা পদক্ষেপ গ্রহণে সক্ষম নয়। তেমন সক্ষমতা সরকারের থাকারও কথা নয়। কেননা, এটা ওপেন সিক্রেট যে সরকারদলীয় আধিপত্যের বহুমাত্রিক চেইনেরই একটি হলো ব্যবসায়িক ‘সিন্ডিকেট’। এসব ক্ষয় ও ক্ষত ঋণনির্ভর বড় বড় বাহ্যিক উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে কিংবা সুকৌশলে গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে এসব চেষ্টা অন্তত আধিপত্যবাদী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর কাছে শেষ পর্যন্ত গোপন থাকে না। ফলে তারা বাংলাদেশের মাতবর হবার ঠান্ডা লড়াইয়ে লিপ্ত। অন্যদিকে আমরাও তাদের পাত্তা দিচ্ছি গুরুত্বের সঙ্গে। কালেভদ্রে নব্য সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করলেও সাম্রাজ্যবাদের সৌজন্যে আমরা গদগদ হচ্ছি। এ রকম বিচিত্র অপরাজনীতির অভিঘাতে জনসাধারণের মনোজাগতিক বৈকল্য তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

সম্ভবত এ কারণেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর সফর সাম্প্রতিক অস্থির সময়ের চাপে চ্যাপ্টা আমাদের মনোজগতে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করল। মাখোঁর সফরের মূল বিষয়গুলোর চেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল তাঁর ভ্রমণসূচি। বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর ঔপনিবেশিক এক রাষ্ট্রের এই নেতা জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়িতে গিয়ে একতারা বাজানোর দীক্ষা নিয়ে জাতিকে বিমোহিত করেছেন; ধন্য করেছেন ফুটপাতের শিঙাড়াওয়ালা আর তুরাগের খেয়ানৌকার মাঝির জীবন। তাঁর পরিচ্ছন্ন ধানমন্ডি লেক দেখতে পাওয়া যেন আমাদের জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি। শিল্পমনা মাখোঁর প্রতি মুগ্ধতার হুজুগ তৈরি করতে আমাদের গণমাধ্যমও যথেষ্ট তৎপরতা দেখিয়েছে। অথচ ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে এ দেশে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঢেউ দেখে অন্যরকম ধারণাই হয়েছিল। সে দেশে মহানবীর (সা.) কার্টুন প্রকাশ এবং তা নিয়ে মাখোঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা থেকে ফরাসি দূতাবাস সরানো এবং ফরাসি পণ্য বর্জনের ডাক এসেছিল। এই আন্দোলনের একজন নেতা আবু তাহের জিহাদি আল কাশেমী এমন কথাও বলেছিলেন, ‘ফ্রান্সের পক্ষ নিয়ে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারবে না।’ তখন মাখোঁ আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমি সর্বদা আমার দেশের মানুষের বাকস্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষা করব।’

তাঁর এ কথা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্স ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক রাখার আইন ‘লে-ল্যসিটে’ (laïcité‹) প্রণয়ন করেছে। তিনি ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন যে, ম্যাগাজিন শার্ল এব্দো একটি বেসরকারি ও স্বাধীন পত্রিকা। সুতরাং এ বিষয়ে তাঁর সরকারের দায় নেই।

তবে এসব সত্ত্বেও বাংলাদেশে তাঁর আগমনে ইসলামপন্থিদের প্রতিবাদ কার্যক্রমের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। আমরা আনন্দিত যে, সে রকম কোনো পরিস্থিতি মাখোঁর সফরের সময় তৈরি হয়নি। তবে কৌতূহলোদ্দীপক হলো, এ রকম মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটা দেশে এয়ারবাসের ১০টি বিমান ও একটি স্যাটেলাইট তিনি বেচতে পেরেছেন। আমরাও সম্ভবত খুশি হয়েছি মার্কিন দেশের বিমান ক্রেতা হওয়ার পাশাপাশি ফরাসি দেশের বিমান ক্রেতা হতে পেরে। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ও নির্বাচন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে প্রকৃত ব্যবসায়ীর মতো তিনি এখানে অস্ত্র বিক্রির আশা করাসহ উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

তো এসব বিমানে কারা চড়বে? অবশ্যই মূল্যস্ফীতি যাদের কাছে ব্যাপার নয়। বাণিজ্য নিয়ন্ত্রক ধনীদের পাশাপাশি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পিয়ন-ড্রাইভার, পুলিশের মাঝারি কর্তারাও খুশি হবেন। এতে অবশ্য বৈষম্য আরেকটু দৃশ্যমান হবে। সাধারণ মানুষ নোংরা, বাকল ওঠা, কালো ধোঁয়া-ছাড়া বাসে চড়ে যানজটে নাকাল হতে বাধ্য, তা সে যত উন্নতিই হোক। আরেকটি স্যাটেলাইটের সুবিধা নিম্নবিত্ত ও নব্য নিম্নবিত্তের কার কাছে কীভাবে চুইয়ে পড়বে, তা বোঝার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কমই আছে। গরিবের কথা হিসেবে আনার প্রয়োজনই নেই। সহজ কথায়, বহুল কাঙ্ক্ষিত সমতাভিত্তিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় মাখোঁ সফরের অবদান আদৌ দৃশ্যমান নয়।

অনেকে বলছেন, ঔপনিবেশিক ফ্রান্স আফ্রিকার দেশে দেশে যে মৌরসি পাট্টা ভোগ করছিল, ইদানীং বিশেষত সামরিক বিদ্রোহের কারণে তা সে হারাতে বসেছে। আর অনেকটা এর ক্ষতিপূরণের লক্ষ্য নিয়েই সে ভূরাজনৈতিক কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থিত বাংলাদেশের দিকে পা বাড়িয়েছে। কিন্তু তা জেনে-বুঝেও, শত উদ্বেগের মধ্যেও মাখোঁর সফরে আমাদের আনন্দ উথলে উঠল কেন? বাউলের একতারা মাখোঁ সাহেবের হাতে তুলে দিতে পারার গৌরব অবাউল তারকা শিল্পী রাহুল আনন্দ বহন করতেই পারেন। কিন্তু বাংলাদেশের আপামর জনগণ সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষায় সজাগ না হলে উপনিবেশবাদী ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো এর সুযোগ নিতে সচেষ্ট হবে না কেন?

নূরুননবী শান্ত: গল্পকার ও অনুবাদক

আরও পড়ুন

×