ঢাকা বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পর্দায় নারী সংগ্রামের ১৪ গল্প

পর্দায় নারী সংগ্রামের ১৪ গল্প
×

কোলাজ: সমকাল

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ১৩:১৬ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২৪ | ১৩:২৮

একজন নারী তার পরিপূর্ণ অধিকার আদায়ের দাবিতে দীর্ঘকাল ধরে যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তারই সম্মানস্বরূপ প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে ৮ মার্চ নারী দিবস পালন করা হয়। উপমহাদেশের বেশিরভাগ চলচ্চিত্রই নায়ককেন্দ্রিক ছবি, বাংলা চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। এর মাঝেও এই দেশে নির্মিত হয়েছে বেশ কিছু নারীকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র, যার বেশিরভাগই হয়েছে দর্শকনন্দিত, পেয়েছে প্রশংসা, পুরস্কারও।
 
রূপবান
বলা হয়, ঢাকায় নির্মিত প্রথম নারীকেন্দ্রিক ছবি রূপবান। ১৯৬৫ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি ওই সময়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সালাউদ্দিন নির্মিত এই ছবির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুজাতা। নারীর ত্যাগ ও সংগ্রামের অনন্য উপাখ্যান তুলে ধরা হয়েছে এতে। এতে আরও অভিনয় করেছেন মনসুর, চন্দনা, সিরাজুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, ইনাম আহমেদ প্রমুখ।
 
সারেং বউ
১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় ‘সারেং বউ’ সিনেমা। শহীদুল্লাহ কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালনা করেছিলেন আবদুল্লাহ আল মামুন। এতে জুটি বেঁধে অভিনয় করেন ফারুক ও কবরী। ছবিতে একজন গৃহবধূর ভূমিকায় দেখা যায় কবরীকে; যে তার স্বামী, সংসার ও নিজের প্রতি সৎ ও নিষ্ঠাবান থাকার জন্য নানা সংগ্রাম অতিক্রম করে।
 
গোলাপী এখন ট্রেনে
১৯৭৮ সালে মুক্তি পেয়েছিল কিংবদন্তি নির্মাতা আমজাদ হোসেনের ছবি ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’। এতে অভিনয় করেছেন ববিতা, ফারুক, আনোয়ার হোসেন, রোজী সামাদ, আনোয়ারা, রওশন জামিল, এটিএম শামসুজ্জামানের মতো নন্দিত তারকারা। তৎকালীন সমাজের বাস্তবতায় একজন খেটে খাওয়া নারীর অসামান্য সংগ্রামকে তুলে ধরা হয়েছে ছবিটিতে।

সূর্য দীঘল বাড়ী
ঢাকার চলচ্চিত্রে অসামান্য এক নির্মাণ এটি। আবু ইসহাকের কালজয়ী উপন্যাস অবলম্বনে এটি পরিচালনা করেছেন মসিউদ্দিন শাকের ও শেখ নিয়ামত আলী। এতে দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, মাতৃত্ব সর্বোপরি এক নারীর জীবন সংগ্রামের চিত্র দেখানো হয়েছে ছবিটিতে। এই ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন ডলি আনোয়ার। এছাড়াও এ ছবিতে আছেন রওশন জামিল, আরিফুল হক, এটিএম শামসুজ্জামানসহ অনেকে। ১৯৭৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি।

ভাত দে
আমজাদ হোসেনের আরও এক কালজয়ী নির্মাণ এই ছবি। সেই সঙ্গে কিংবদন্তি নায়িকা শাবানার অভিনয় দক্ষতার উৎকৃষ্ট নিদর্শন। ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়ার পর এই ছবি নয়টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল। ছবিতে এক গরিব বাউলের মেয়ে জরির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শাবানা। একদিন ভাতের জোগাড় করতে গিয়েই মারা যায় জরির বাবা। এরপর জরির অভাব-অনটনের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। প্রেম ও করুণ পরিণতি তাকে ঠেলে দেয় চরম দুরবস্থায়। ভাতের জন্য জরির অবর্ণনীয় কষ্ট আর করুণ পরিণতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে ছবিতে। এতে অনবদ্য অভিনয় করে শাবানা পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
 
হাঙর নদী গ্রেনেড
মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন মায়ের অসামান্য ত্যাগের গল্পে নির্মিত ছবি এটি। নির্মিত হয়েছে সেলিনা হোসেনের উপন্যাস অবলম্বনে। পরিচালনা করেছিলেন চাষী নজরুল ইসলাম। ছবির মূল চরিত্র বুড়ির ভূমিকায় আছেন সুচরিতা। দুরন্ত শৈশব পেরিয়ে আসা বুড়ির বিয়ে হয় তার চেয়ে দ্বিগুণ বয়স্ক গফুরের সঙ্গে। গফুরের আবার আগের সংসারের দুই পুত্র রয়েছে। এরপর বুড়ি নিজেও মা হয়। কিন্তু তার সন্তান বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। মুক্তিযুদ্ধের সময় বীর যোদ্ধাদের বাঁচাতে সেই সন্তানকেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেয় বুড়ি। স্বাধীনতার জন্য এক মায়ের এমন ত্যাগের দৃশ্য অশ্রুসিক্ত করেছিল দর্শককে। ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি চারটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিল। 

খায়রুন সুন্দরী
২০০৪ সালে দেশজুড়ে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল এই ছবি। এর গান যেন বাতাসের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল! এ কে সোহেল নির্মিত ছবিটির গল্প লোকজ ধাঁচের। এতে তুলে ধরা হয়েছে স্বামীর প্রতি এক গ্রামীণ বধূর ভালোবাসা ও বিশ্বাসের উপাখ্যান। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একজন নারী কেমন বঞ্চিত হয়, তার চিত্রও উঠে এসেছে এখানে। ছবিটিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন মৌসুমী। এতে আরও আছেন ফেরদৌস, দিলদার, এটিএম শামসুজ্জামান প্রমুখ।
 
নিরন্তর
কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘জনম জনম’ উপন্যাস অবলম্বনে ‘নিরন্তর’ ছবিটি নির্মাণ করেছেন আবু সাইয়ীদ। যার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বাণিজ্যিক ছবির সফল নায়িকা শাবনূর। ছবিতে তিথি নামের এক তরুণীর জীবনের গল্প উঠে এসেছে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে যার জন্ম, বাবা অন্ধ, ভাই বেকার। সংসারের পুরো দায়িত্ব তিথির ওপর। উপায় না পেয়ে পতিতাবৃত্তি বেছে নেয় তিথি। এক পর্যায়ে ভাইয়ের সুবাদে পরিবারে সচ্ছলতা এলে তিথি তার কাজ ছেড়ে দিতে চায়। কিন্তু অন্ধকার এই জগত ছাড়ার কোনও পথ খুঁজে পায় না সে। ছবিটিতে শাবনূরের সঙ্গে আরও আছেন ইলিয়াস কাঞ্চন, আমিরুল হক চৌধুরী, ডলি জহুর, লিটু আনাম প্রমুখ। 

থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার
নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর চলচ্চিত্র ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ এর প্রধান চরিত্র রুবা। নানা সামাজিক সঙ্কটে বেড়ে ওঠা তরুণী বেছে নেয় লিভ টুগেদার। একটি খুনের ঘটনায় সঙ্গী জেলে গেলে নানা ধরনের বিপদে পড়ে। এর মধ্যে সাহায্য করে এক কণ্ঠশিল্পী বন্ধু। ত্রিমুখী এক দ্বন্দ্বে ছবিটি এগিয়ে যায়। রুবা চরিত্রে তিশার অনবদ্য অভিনয়ের পাশাপাশি এই ছবিতে আরো ছিলেন মোশাররফ করিম ও তপু। জনপ্রিয় এই ছবিটি বাংলাদেশের হয়ে অস্কারে প্রতিনিধিত্ব করে।

গেরিলা
মুক্তিযুদ্ধ ও নারী; এই দুইয়ের অনন্য নিদর্শন ছবিটি। নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্মিত এই ছবি জয়া আহসানের ক্যারিয়ারেও একটি মাইলফলক। এতে তিনি প্রধান চরিত্র বিলকিসের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ঘটনাক্রমে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে বিলকিস এবং এক পর্যায়ে বীরের মতো নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিয়েছিল ২০১১ সালে মুক্তি পাওয়া ছবিটি। এছাড়া জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি ১০টি শাখায় পুরস্কৃত হয়েছিল।
 
অগ্নি
এটি নারীকেন্দ্রিক গল্পে গেলো দশকের সফলতম ছবি। এর নাম ভূমিকায় মাহিয়া মাহি অভিনয় করে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। ইফতেখার চৌধুরী পরিচালিত ছবিটি বক্স অফিসেও সাড়া পেয়েছিল দারুণ। ছবিতে তানিশা নামের এক ছদ্মবেশীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মাহি; যে নিজের বুদ্ধিমত্তা আর দুর্ধর্ষ অভিযানে অপরাধ জগতের রাঘব-বোয়ালদের হত্যা করে। ২০১৪ সালের ভালোবাসা দিবসে মুক্তি পেয়েছিল ছবিটি। এতে আরও আছেন আরিফিন শুভ, আলীরাজ, মিশা সওদাগর, ড্যানি সিডাক প্রমুখ।

সুতপার ঠিকানা
একজন নারীর শৈশব থেকে বৃদ্ধ পুরো জীবন কাটে বাবা, স্বামী, সন্তানদের আশ্রয়ে। এর মাঝেও কিছু নারী নিজের ঠিকানা খুঁজতে চেষ্টা করে। তেমনিই এক নারী সুতপা।দর্শকদের মাঝে এইরকম-ই গল্প উপহার দিয়েছেন প্রসূন রহমান। সরকারি অনুদানে নির্মিত এই ছবিতে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছে অপর্ণা ঘোষ। পুরো ছবি তিনি একাই টেনেছেন, কুমার বিশ্বজিতের সঙ্গীতায়োজন ছিল প্রশংসনীয়, ধারা বর্ণনায় আসাদুজ্জামান নূর অন্যরকম আবহ সৃষ্টি করেছে। ছবিটি বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুরস্কার অর্জন করেছে।
   
ন ডরাই
সার্ফিং নিয়ে দেশের প্রথম ছবি বলা হয় এটিকে। মুক্তি পেয়েছে ২০১৯ সালে। এর মূল ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সুনেরাহ বিনতে কামাল। আয়েশা নামের সেই তরুণী সামাজিক বাঁধা অতিক্রম করে নিজেকে সার্ফার হিসেবে গড়ে তোলে। ছবিতে আরও আছেন শরিফুল রাজ, সাঈদ বাবু, নাসির উদ্দিন খান প্রমুখ। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ছয়টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছে ছবিটি।
 
রেহানা মরিয়ম নূর
সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এই ছবি নির্মাণ করেছেন আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ। এর নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। এটি দেশের ইতিহাসে প্রথম ছবি হিসেবে বিখ্যাত কান উৎসবের ৭৪তম আসরের ‘আঁ সার্তে রিগা’ প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছিল। এছাড়া আরও কিছু উৎসবে ছবিটি পুরস্কার পেয়েছে। ছবিতে এক বেসরকারি কলেজের শিক্ষিকার পেশা ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা দিক তুলে আনা হয়েছে। ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০২১ সালে।

আরও পড়ুন

×