ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

অনিন্দ্য সুন্দর কেরালা

অনিন্দ্য সুন্দর কেরালা

তানিয়া এ্যানি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

ঘুম ভাঙা চোখে জানালায় চোখ রাখতেই দেখলেন চারপাশে অথৈ পানি, দু’ধারে সারি সারি নারকেল বাগান, আশপাশে বয়ে চলেছে ছোট-বড় আর কতশত নৌকা– কী সুন্দর অনুভূতি! প্রচণ্ড তৃষ্ণা পেলে পাশের কোনো গ্রামে বোট থামালেই পেয়ে যাবেন একদম সতেজ ডাবের পানি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ডাবের রংটা আলাদা ধরনের; খানিকটা কমলা রঙের, আকারেও বড়। আবার চাইলেই জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে বোটে ফিরে রান্না বসিয়ে দিতে পারেন। ভিনদেশি মাছ, রান্নার স্বাদ ও গন্ধ। সঙ্গে ধোঁয়া ওঠা ভাত। একটুখানি ভাতঘুম দিয়ে উঠে এক কাপ চায়ের সঙ্গে জলে পা ডুবিয়ে আয়েশ! আহা, বোহেমিয়ান যাপন।
বলছিলাম কেরালার আলেপ্পে বা আলাপুজ্জা ব্যাকওয়াটার বোট হাউসের কথা। দেশজুড়ে বোট হাউস এখন বেশ জনপ্রিয় হলেও, এই ধারণা মূলত আমাদের কাছে পরিচিত করেছে কেরালার বোট হাউস। যেখানে ছোট ছোট সাজানো ডিঙি নিয়ে বেশ আয়েশিভাবে রাতযাপন করা যায়। রাতযাপন ছাড়াও আপনি চাইলে সারাদিন ঘুরতে পারবেন ভেমবানাড লেক ধরে। রাতযাপনের জন্য সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বোট হাউসও রয়েছে। প্রাচ্যের ভেনিসখ্যাত আলাপুজ্জা আপনাকে হতাশ করবে না একটুও, চাইলেই পেয়ে যাবেন পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ জলের সমুদ্র।
তবে সমুদ্র দেখার জন্য সবচেয়ে উত্তম হলো ভারকালা, কোভালাম শহর। কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরমের অন্তর্গত ভারকালা সৈকত ভারতের অন্যতম পরিচ্ছন্ন সৈকত হিসেবে বেশ বিখ্যাত। অ্যারাবিয়ান সমুদ্রতীর আর ওয়েস্টার্ন ঘাট ধরে গড়ে ওঠা ভারতের দক্ষিণের এই রাজ্যটি বেশ পরিচিত ‘ঈশ্বরের নিজের দেশ’ হিসেবে। পৌরাণিক বিবরণ অনুসারে, ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার, যোদ্ধা ঋষী পরশুরাম একটি উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে হিংস্র সমুদ্রকে প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর যোদ্ধা কুঠার সমুদ্রে নিক্ষেপ করেন এবং সেখানেই ভেসে উঠে সম্পদ ও প্রাচুর্যে ভরা আজকের ‘কেরালা’। মালাবার উপকূলে অবস্থিত ভারতের এই রাজ্যে কী নেই! পাহাড়, সমুদ্র, ব্যাকওয়াটার, চা-কফি, মসলার রাজত্ব, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি বৈচিত্র্যে ভরা খাবারদাবার সবই আছে সেখানে।
কেরালার প্রতি কোণে কোণে মন্দির-গির্জা-মসজিদের সহাবস্থানের দেখা মেলে। প্রত্যেক ধর্মের মানুষের একে অন্যের প্রতি আন্তরিকতা কেরালাকে করেছে অনন্য। শিক্ষার হারেও এগিয়ে রয়েছে এই রাজ্য।
আপনি যদি ভোজনরসিক হোন, জীবনে একবার হলেও ঢুঁ দেবেন কেরালার স্থানীয় এবং ঐতিহ্যবাহী খাবারের দোকানগুলোয়। কোচিন, কালীকটের মতো শহরগুলো আপনাকে যেমন জানাবে ইতিহাস-ঐতিহ্য, তেমনি পরিচিত করবে নানা খাবারের স্বাদের সঙ্গে। দক্ষিণ ভারতে বসে বাঙালি মুসলিম হিসেবে আপনার যদি হুট করে ইচ্ছা করে গরুর মাংস খেতে, তাহলে এর স্বাদও নিতে পারবেন। কেরালায় আপনি এমন সব রেসিপি ও খাবার দেখবেন, যা কখনোই দেখেননি। আগে খাননি।
জানা যায়, পরোটা আর বিফ কেরালার মানুষের অন্যতম পছন্দের খাবার। এ ছাড়াও সামুদ্রিক নানা ধরনের মাছসহ খাবারের নানা বৈচিত্র্য তো রয়েছেই। তবে হ্যাঁ, রাজ্যজুড়ে নারকেলের সহজলভ্যতা বেশি। এ জন্যই হয়তো বাটা নারকেল কিংবা নারকেলের দুধ ছাড়া কোনো রান্না সম্পূর্ণ হয় না! মালাইলিরা বিশ্বাস করে, নারকেলের ব্যবহারই এনে দেয় খাবারের মূল স্বাদ। যদি কেরালায় বেড়াতে যান, তাহলে অবশ্যই কলার চিপস খেয়ে দেখবেন।
কোচিন বা কোচি শহরটা পরিচিত ভারতের অন্যতম প্রাচীন সমুদ্রবন্দর এবং বর্তমানে অন্যতম আধুনিক শহর হিসেবে। চৌদ্দ শতকে ভারতের প্রধান মসলা রপ্তানিকারক শহর ছিল কোচিন। ভারতের প্রথম ইউরোপিয়ান উপনিবেশ হিসেবে কোচিন এখনও আগলে রেখেছে সেই ঐতিহ্য স্থাপনা। পুরোনো এক ছোটখাটো জাহাজ মাত্র ২০ রুপিতে আপনাকে নিয়ে যাবে সমুদ্রে মাঝের এক দ্বীপে, যার পরতে পরতে সাজানো আছে ডাচ, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ স্থাপত্যশৈলী। পর্তুগিজ নাবিক এবং পরিব্রাজক ভাস্কো দা গামার একটি বাড়িও রয়েছে এই শহরে। তিনি মৃত্যুবরণও করেন এ শহরেই।
ফোর্ট কোচিসহ পুরো কেরালাতেই বিদেশি পর্যটকের আনাগোনা বেশ লক্ষণীয়। হবেই বা না কেন, একই সঙ্গে এতকিছু দেখার সুযোগ ভারতের অন্যান্য রাজ্যে তুলনামূলক নেই বললেই চলে। এ জন্য হয়তো কেরালাকে বলা হয়, ঈশ্বরের নিজস্ব দেশ, যাকে ঈশ্বর সাজিয়েছেন নিজ হাতে। প্রকৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, খাবার বৈচিত্র্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সবটা মিলিয়েই কেরালা অনন্য।
ওয়ানাইড, মুন্নার, থেক্কেডি শহরগুলো চট করে আপনাকে নিয়ে যাবে বিস্তীর্ণ সবুজের সমারোহে। উঁচু-নিচু ও আঁকাবাঁকা রাস্তা, পথের দু’ধার ধরে রাশি রাশি চা বাগান আর বর্ষায় ভরা যৌবনা ঝরনাধারা– সবকিছুরই সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। উঁচু উঁচু পাহাড় ধরে আছে নানা ধরনের অ্যাক্টিভিটিসও, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় লোকজন নির্দ্বিধায় গা ভাসাতে পারেন। পর্যটনশিল্পে কেরালা বেশ সমৃদ্ধ হলেও, তা কখনোই কেরালার প্রাণিকুলের জন্য ক্ষতির কারণ হয়নি। কেরালা তার প্রাণিকুলের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবেও বিবেচিত। সম্প্রতি শর্ট ফিল্ম ক্যাটেগরিতে অস্কারজয়ী কেরালার ‘দ্য এলিফ্যান্ট হুইসপারার্স’ তার অন্যতম উদাহরণ।
ছবি: লেখক


ভ্রমণের টুকিটাকি

কেরালার রাজধানী তিরুবনন্তপুরম হলেও, কোচির সঙ্গে অন্য শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ। কোচিতে রয়েছে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। কলকাতা থেকে কোচির ফ্লাইটে সময় লাগবে প্রায় ৩ ঘণ্টা। দিল্লি থেকেও সময় লাগবে প্রায় একই। আগে টিকিট করে রাখলে খরচ পড়বে বাংলাদেশি টাকায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। এয়ারপোর্ট থেকে মূল শহরে চলে গেলেই পাবেন বাজেটের মধ্যে থাকার হোটেল।
অনলাইনে আগেও বুক করে নিতে পারেন আপনার সাধ্যমতো। সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু হোটেল আপনাকে এয়ারপোর্টে পিক ও ড্রপ সুবিধাও দেবে। কেরালায় দিন হিসেবে ক্যাব বুক করতে পারবেন। যে শহরেই যেতে চান, সারাদিন শহরের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ঘুরিয়ে দেখাবে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার রুপিতে।  হাউস বোটে থাকতে আপনাকে কোচি থেকে যেতে হবে আলেপ্পেতে। কোচি থেকে যার দূরত্ব ৫৪ কিলোমিটার। বাস কিংবা ক্যাবে যেতে পারবেন সহজেই। বোটের সাইজ অনুযায়ী দাম মিটিয়ে সারাদিন ঘুরতে পারবেন। দামাদামি করে নেওয়ার সুযোগ আছে। রাতে থাকতে হলে কাপল রুম এবং খাওয়া-দাওয়াসহ খরচ পড়বে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা।

আরও পড়ুন

×