ঢাকা সোমবার, ০৪ মার্চ ২০২৪

জামালপুরে কৃষকদের বদলে যাওয়ার গল্প

জামালপুরে কৃষকদের বদলে যাওয়ার গল্প

হাসান জাকির

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৮:০০

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার ধর্মকুড়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক মো. ফকির আলী। স্ত্রী সুমিতা আক্তার মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোলেও ফকির আলী পড়াশোনা তেমন করতে পারেননি। স্বল্প কৃষিজমিতে ফকির আলীর চাষবাসই জীবিকার একমাত্র ভরসা। বিয়ের পর একে একে ফকির-সুমিতা দম্পতির কোলজুড়ে আসে তিন সন্তান। ফকির-সুমিতা দম্পতির তিন ছেলের বয়স এখন সাড়ে আট বছর, সাড়ে তিন বছর আর ৭ মাস। সুমিতার শাশুড়িসহ ছয়জনের সংসারে খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অভাব-অনটনও বাড়তে থাকে। তবে তাদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় ওয়ার্ল্ড ভিশনের নিউট্রিশন সেনসেটিভ ভ্যালু চেইনস ফর স্মলহোল্ডার ফারমার্স (এনএসভিসি) প্রকল্প। শুধু আচরণগত পরিবর্তন যে প্রাত্যহিক জীবন বদলে দিতে পারে তার উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ফকির-সুমিতা দম্পতি। সেই দেড় বিঘা জমিতেই ধানের পাশাপাশি নানা ধরনের ফসল চাষ করছেন তারা। প্রকল্প থেকে সহায়তা পেয়ে কিনেছেন সেচ পাম্প। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সেচের সেবা প্রদান করে সুমিতা আক্তার হয়েছেন একজন সফল নারী উদ্যোক্তা। স্বামীর পাশাপাশি চাষবাদেও হাল ধরছেন সুমিতা। বাড়ি ফিরে দু’জনে মিলে করছেন সাংসারিক কাজ। বাড়ির আঙিনায় গড়ে তুলেছেন পুষ্টিবাগান, যেখানে বেড়ে উঠেছে লালশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, লাউসহ নানা ধরনের সবজি। ফকির আলী হাটবাজারে যাওয়ার আগে স্ত্রীর কাছে জেনে নিচ্ছেন কী কী কেনা প্রয়োজন। সাধ ও সাধ্যের সমন্বয় করে কিনে আনছেন পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ খাবার।

নিজের বাড়ির আঙিনায় বসে সুমিতা এ প্রতিবেদককে বলেন, অভাবের সংসারে স্বামী-শাশুড়ির সঙ্গে কলহ লেগেই থাকত। কী খাবার খাব, কীভাবে খাব– এসব নিয়ে চিন্তা করতে হতো। তবে সেসব এখন অতীত। ‘আচরণগত পরিবর্তন’ কি এমন বিষয়, যার ফলে বদলে গেছে ফকির-সুমিতার দিন? এ প্রতিবেদককে সুমিতার স্বামী ফকির আলী বলেন, ওয়ার্ল্ড ভিশনের এ প্রকল্প থেকে দম্পতিদের নিয়ে একটা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করে আমরা বুঝতে পারি, সাংসারিক যে কোনো সিদ্ধান্ত স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে হয়। স্ত্রী তথা নারী শুধু ঘরের কাজ করবেন আর স্বামী তথা পুরুষ শুধু বাইরের কাজ করবেন এটা ঠিক নয়। আমরা এখন স্বামী-স্ত্রী দু’জন মিলেই ঘরে-বাইরের কাজ একসঙ্গে করি। আমার স্ত্রী এই প্রকল্পের পুষ্টিবিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন। সেখানে অন্তঃসত্ত্বা আর শিশুর মায়েদের নিয়ে একটা আইওয়াইসিএফ দল গঠন করে তাদের পুষ্টির ব্যাপারে তথ্য দেওয়া হয়েছে। কীভাবে রান্না করলে খাবারে পুষ্টিগুণ থাকে, কী কী খাবারে কী পুষ্টি পাওয়া যায়, বাড়ির পাশের খালি জায়গায় কীভাবে পুষ্টিবাগান করতে হয়, শিশুর আর তার মায়ের যত্ন কীভাবে নিতে হয় এসব শিখে আমার স্ত্রী আমাকেও জানিয়েছে। প্রকল্পের কর্মীরা বাড়িতে এসেও আমাদের এসব আবার বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। এনএসভিসি প্রকল্প অস্ট্রেলিয়া সরকারের সহায়তায় অস্ট্রেলিয়ান এনজিও কো-অপারেশন প্রোগ্রামের (এএনসিপি) অর্থায়নে এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন অস্ট্রেলিয়ার কারিগরি তত্ত্বাবধানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন সংঘকে সঙ্গে নিয়ে জামালপুর সদর, দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুরের ২১টি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবারের সঙ্গে কাজ করেছে। প্রান্তিক চাষিদের খোরাকি কৃষি থেকে বের করে এনে বাণিজ্যিক কৃষির মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি ও পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত করাই এ প্রকল্পের উদ্দেশ্য।

জামালপুরের এ তিন উপজেলায় নারীর অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জামালপুর সদরের কেন্দুয়ার সাতকুড়া পূর্বপাড়ার আবুল কালাম ও চায়না বেগম দম্পতি, দেওয়ানগঞ্জের আব্দুর রশিদ-সখিনা দম্পতি কিংবা ইসলামপুরের পশ্চিম মোজা-আটার সাখাওয়াত হোসেন-রাবেয়া খাতুন দম্পতির কথায়ও মেলে একই সুর। তারা এখন জানেন, সাংসারিক সমৃদ্ধিতে নারীর ক্ষমতায়ন কতটা জরুরি। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিতকরণে, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, অন্তঃসত্ত্বা মায়ের যত্ন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ, পারিবারিক সিদ্ধান্তে ও অর্থনৈতিক কাজে নারীর অংশগ্রহণ, নারী-পুরুষ-শিশু সবার জন্য সমহারে পুষ্টিকর খাবার এমন নানা বিষয়ে সম্পর্কে জানতে পারছেন অংশগ্রহণকারীরা। তারা জানান, এ প্রকল্পের অংশ হয়ে তারা এখন যে কোনো বিষয়ে পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন। বাড়ির আশপাশে নানা ধরনের শাকসবজি চাষ করেন। প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খান।

এনএসভিসি প্রকল্প ব্যবস্থাপক অসীম চ্যাটার্জী সমকালকে বলেন, এ ক্ষেত্রে মেনকেয়ার অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে পরিবারের স্বামী-স্ত্রী-শাশুড়ির মতো সদস্যদের নিয়ে কমিউনিটি পর্যায়ে সেশন ও এলাকাবাসীকে নিয়ে সচেতনতামূলক সভা আয়োজন করা হয়। দশ জোড়া দম্পতি এবং শাশুড়িদের নিয়ে ১৪টি সেশনে সম্পন্ন হয় এই প্রশিক্ষণ। এর ফলে ক্ষুদ্র কৃষক পরিবারগুলোয় জেন্ডার বৈষম্য দূর করে কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধি এবং পরিবারের সদস্যদের উন্নত পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে। এ রকম ৪৩৮টি মেনকেয়ার গ্রুপ রয়েছে এই তিন উপজেলায়। এর ফলে পরিবারগুলোয় বেড়েছে সম্প্রীতি এবং সৌহার্দ্য।

আরও পড়ুন

×