ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রচ্ছদ

ঘরেই শরীরচর্চা

ঘরেই শরীরচর্চা
×

তাসলিমা তামান্না

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০

বর্ষাকাল মানেই আকাশ কালো করা ঘন মেঘ, যখন-তখন ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। পথেঘাটে কাদাপানি। কখনও ভ্যাপসা গরম। এ আবহাওয়ায় ঘরে শরীরচর্চা নিয়ে লিখেছেন তাসলিমা তামান্না

বর্ষার জলে স্নাত হতে কার না মন চায়। বৃষ্টির দিনে মন হয়ে ওঠে আকুল, জাগে রোমান্টিকতা। বর্ষার প্রবল বারিধারায় চারপাশ হয়ে ওঠে সতেজ ও প্রাণবন্ত। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে/ পাগল আমার মন জেগে ওঠে।’ কিন্তু বর্ষা মানেই তো শুধু বৃষ্টিতে ভেজা বা রোমান্টিসিজম নয়। কাজকর্মে যেতে হয়, আবার ফিটনেস ধরে রাখাটাও জরুরি। ফিটনেস ধরে রাখতে শরীরচর্চারও বিকল্প নেই। এ সময়ের আবহাওয়া বাইরে হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা শরীরচর্চার জন্য মোটেও উপযোগী নয়। অবিরাম কিংবা থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এ মৌসুমে রাস্তাঘাটে পানি জমে কাদায় একাকার হয়ে যায়। বৃষ্টি না হলে পড়ে ভ্যাপসা গরম। এ পরিস্থিতিতে ঘরই হতে পারে শরীররচর্চার কেন্দ্র।

নিজেকে স্থির রাখুন যোগব্যায়ামে সুস্থ থাকতে এবং ফিটনেস ধরে রাখতে যোগব্যায়াম হতে পারে দারুণ সমাধান, জানালেন রাজধানীর ধানমন্ডির ‘জয়সান ইয়োগা’র খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক খাদিজাতুল কোবরা। তাঁর ভাষায়, একজন যখন যোগব্যায়ামের জন্য আসন নেবে, প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অনুভব করতে পারবে, সম্পূর্ণভাবে নিজের মধ্যে ডুবে যাবে। বাইরের সবকিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবে। খাদিজাতুল বলেন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার, মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সেরা উপায় হচ্ছে যোগব্যায়াম। মন সুস্থ থাকা মানে শরীর সুস্থ থাকা। তাঁর মতে, যত ব্যস্ততা থাকুক না কেন, সুস্থ থাকতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ মিনিট যোগব্যায়াম করা খুবই উপকারী। মানসিক সুস্থতার পাশাপাশি এই ব্যায়াম ক্যালরি ঝরাতে, পেটের মেদ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ইয়োগা প্রশিক্ষক খাদিজাতুল কোবরা বলেন, বাইরে যদি ব্যায়াম করতে না যেতে পারেন, তাহলে ঘরে বসে তো বটেই ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বিছানায় বসেই পাঁচ মিনিটের ফ্রি হ্যান্ড এক্সসারসাইজ করতে পারেন।

যারা যোগব্যায়াম শুরু করতে যাচ্ছেন, তাদের পক্ষে একবারেই অনেকক্ষণ যোগব্যায়াম করা সম্ভব নয় বলে মত দেন এই প্রশিক্ষক। তাঁর ভাষায়, প্রথমে ১০ মিনিট, এরপর ১৫ মিনিট করে সপ্তাহে অন্তত চার দিন যোগব্যায়াম করলে শারীরিক-মানসিকভাবে ভালো থাকতে পারবেন।

যারা নিয়মিত যোগব্যায়াম করেন, আর যারা করেন না, তাদের মধ্যে তুলনা করে এই প্রশিক্ষক জানান, যারা যোগব্যায়াম করেন, তারা যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজেকে অনেক বেশি স্থির রাখতে পারেন। অন্যদিকে যারা করেন না, সবে শুরু করতে যাচ্ছেন, তাদের স্থির থাকাটা তুলনামূলকভাবে কঠিন মনে হয়।

খাদিজাতুল কোবরার সঙ্গে সুর মেলালেন রাজধানীর কাজীপাড়া ও সায়েন্স ল্যাবের ‘এভারগ্রিন ইয়োগা’র আরেক যোগব্যায়াম প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তনুও। তাঁর ভাষায়, অন্যান্য ব্যায়ামের সঙ্গে যোগব্যায়ামের মূল পার্থক্য হলো, এই ব্যায়াম শরীর ও মন দুটিই ফুরফুরে রাখে। তিনি জানান, মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অসংক্রামক রোগ (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, থাইরয়েড) নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখে যোগব্যায়াম। আজকাল অনেকেই ইউটিউব দেখে যোগব্যায়াম করছে উল্লেখ করে বাপ্পা শান্তনু বলেন, ওজন কমাতে চাইলে এভাবে যোগব্যায়াম করতেই পারেন। তবে রোগ নিরাময়ে যোগব্যায়াম করতে চাইলে অবশ্যই একজন প্রশিক্ষকের সহায়তা নিয়ে ঠিকভাবে করতে হবে। নিয়ম মেনে যোগব্যায়াম করলে এসব রোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

যোগব্যায়ামের কোন আসন কোন কাজ করে প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তনু জানান, প্রতিদিন যোগব্যায়াম করলে ফুসফুসের শ্বাস গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ে, বাড়ন্ত বয়সে করলে উচ্চতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি হাঁপানি রোগীদের জন্যও খুব উপকারী। শান্তনু জানান, যোগাব্যায়ামের কয়েকটি আসনের কথা। এসব আসন শরীরে একেক ধরনের কাজ করে। যেমন–

বৃক্ষাসন: এই আসন মনোযোগ বৃদ্ধি করে, মানসিক চাপ কমায়, স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, চঞ্চল মন শান্ত করে।

উৎকটাসন: যোগব্যায়ামের এই আসনটি পায়ের মাংসপেশি দৃঢ় করে, হাঁটুতে বল বৃদ্ধি করে।

ত্রিকোণাসন: পেটের পাশের দিকের ফ্যাট কমাতে, কোমরের গঠন সুন্দর করতে ত্রিকোণাসন দারুণ কার্যকর।

মলাসন: এই আসন প্রজননতন্ত্রে ভালোভাবে রক্ত সঞ্চালন হয়ে বিভিন্ন জটিলতা থেকে দূরে রাখে, মেয়েদের নরমাল ডেলিভারিতে সুবিধা হয়।

পাদহস্তাসন: মেরুদণ্ড শিথিল রাখতে পাদহস্তাসন বেশ উপকারী। নিয়মিত অভ্যাস করলে কোমর ব্যথার মতো জটিলতা আসবে না, তবে সমস্যা থাকলে এ আসন করবেন না।

কন্ধরাসন: এই আসনে ছেলেদের ধাতুরোগের সমস্যা দূর হয়, মেয়েদের মাসিক সম্পর্কিত জটিলতা দূর করে। এটি কোমর ব্যথা কমাতেও উপকারী।

ভূজঙ্গাসন: কোমর ব্যথা উপশম করতে, বুকের গঠন সুন্দর রাখতে (ছেলেমেয়ে উভয়ের) ও মেরুদণ্ডের শক্তি বাড়াতে করতে পারেন ভূজঙ্গাসন।

অনুলোম-বিলোম প্রাণায়াম: এই আসন উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য জরুরি। শুধু তাই নয়, এই আসন মনকে শান্ত করে, মনোযোগ বাড়ায়, মানসিক চাপ কমায়।

ইয়োগা প্রশিক্ষক বাপ্পা শান্তনুর ভাষায়, ঘুমানোর আগে ৫ মিনিটের মতো এই আসনটি করলে ঘুম ভালো হয়।

বাপ্পা জানান, প্রতিটি আসন শুরুতে কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড ধরে রাখা উচিত। এর পর আস্তে আস্তে অভ্যস্ত হলে ৩০ সেকেন্ডের মতো করতে হবে ৩-৫ বার। তাঁর মতে, রোগের তারতম্য অনুযায়ী যোগব্যায়ামের সময় বা আসন ভিন্ন হতে পারে, যেটি প্রশিক্ষকের কাছে শুনে নেওয়া উচিত। বাপ্পার মতে, কেউ যোগব্যায়াম শুরু করতে চাইলে প্রাণায়ন বা নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম দিয়েই করা উচিত।

এ তো গেল যোগব্যায়ামের উপকারিতার কথা। এ ছাড়া ঘরে আরও কয়েক ধরনের শরীরচর্চা করা যায়।

সাইক্লিং/ট্রেডমিল ব্যবহার: আজকাল অনেকেই ঘরে সাইক্লিং করেন। কেউ কেউ ট্রেডমিলও ব্যবহার করেন। বৈরী আবহাওয়া কিংবা ব্যস্ত সময়ের উপকারী শরীরচর্চা হতে পারে এসব। এ ব্যাপারে সিএমএইচের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ লে. কর্নেল ডা. নাসির উদ্দিন আহমদ বলেন, যাদের বয়স ৩৫ এর ওপরে তাদের জোরে দৌড়ানো ঠিক নয়। তারা বাইরে হাঁটতে না পারলে ঘরে ট্রেডমিল মেশিনে দৌড়াতে পারেন। আধুনিক ট্রেডমিলে বিভিন্নভাবে দৌড়ানোর আলাদা প্রোগ্রাম রয়েছে। যেটি আপনার জন্য উপযোগী, সেটিই বেছে নিতে পারেন। তবে গতি মাঝারি রাখাই ভালো। তাঁর ভাষায়, ঘরে ব্যায়াম করতে চাইলে সাইক্লিংও করতে পারেন। তবে বাইরে শরীরচর্চা বা হাঁটার একটা সুবিধা হলো প্রকৃতির সান্নিধ্য পাওয়া। কিন্তু বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম বা বৈরী আবহাওয়ার কারণে একান্তই বাইরে যেতে না পারলে ঘরেই সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে হবে। সে ক্ষেত্রে দরজা-জানালা খুলে শরীরচর্চা করুন। এতে মাংসপেশি সক্রিয় হবে, শরীরও সুস্থ থাকবে। ডা. নাসির উদ্দিনের ভাষায়, কারও যদি ইনডোর সাঁতারের সুযোগ থাকে তাহলে সেটি আরও ভালো ব্যায়াম হবে। সাঁতার ফিটনেসের জন্য দারুণ উপকারী।

দড়ি লাফ: শরীর থেকে অতিরিক্ত ক্যালরি এবং চর্বি ঝরাতে দড়ি লাফ কার্যকরী ব্যায়াম। এটি পা, হাত, কাঁধসহ পুরো শরীরের হাড় এবং মাংসপেশি শক্তিশালী করতে উপকারী। ঘরের যে কোনো স্থানে এটি স্বাচ্ছন্দ্যে করা যায়।

১০০ বার দড়ি লাফ দিলে ২০০ ক্যালরি শক্তি পোড়ে। যত দ্রুত এই লাফ দেওয়া যায়, ক্যালরি ক্ষয়ের পরিমাণও তত বেশি হয়। নিয়মিত দড়ি লাফের অভ্যাস গড়ে তুললে ওজন কমে, পাশাপাশি রক্তচাপ এবং রক্তে শর্করার পরিমাণও নিয়ন্ত্রণে থাকে। তবে কোমরে ব্যথা, হাঁটুব্যথা থাকলে কিংবা গর্ভাবস্থায় দড়ি লাফ না দেওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা: একান্তই যদি কোনো ধরনের ব্যায়াম করার সময় না পান বা আলসেমি লাগে, তাহলে সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামা করতে পারেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একেবারে হাঁটাহাঁটি না করার চেয়ে কয়েকশ কদম হাঁটা বা কষ্ট করে কিছু সিঁড়ি বেয়ে ওঠা, এর যে কোনোটিই ভালো। বৃষ্টির দিনে বা বৈরী আবহাওয়ায় এটি হতে পারে ভালো ব্যায়াম। সিঁড়ি ব্যবহার করলে হাঁটার তুলনায় প্রতি মিনিটে প্রায় দ্বিগুণ ক্যালরি খরচ হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ থাকতে শুধু ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়, এর পাশাপাশি প্রয়োজন সুষম খাদ্যাভ্যাস। সেক্ষেত্রে পুষ্টিবিদের পরামর্শ মতো লো-ক্যালোরির প্রোটিনসমৃদ্ধ ঘরোয়া সুষম খাবার খেতে হবে। যে কোনো ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। মোট কথা, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস আর নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন পদ্ধতিই হলো সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। 

মডেল: শামা মাখিং; ছবি : ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

রাজধানীর ‘জয়সান ইয়োগা’র খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক খাদিজাতুল কোবরার ভাষায়, একজন যখন যোগব্যায়ামের জন্য আসন নেবে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে অনুভব করতে পারবে, সম্পূর্ণভাবে নিজের মধ্যে ডুবে যাবে। বাইরের সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে পারবে। খাদিজাতুল বলেন, মানসিকভাবে সুস্থ থাকার, মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সেরা উপায় হচ্ছে যোগব্যায়াম। মন সুস্থ থাকা মানে শরীর সুস্থ থাকা। তাঁর মতে, যত ব্যস্ততা থাকুক না কেন সুস্থ থাকতে প্রতিদিন কমপক্ষে ১০ মিনিট যোগব্যায়াম করা খুবই উপকারী

আরও পড়ুন

×