ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুষ্প

সোর্ড প্লান্টের শুভ্র ফুল

সোর্ড প্লান্টের শুভ্র ফুল
×

নারায়ণগঞ্জের জিন্দা পার্কে সম্প্রতি ফুটেছে সোর্ড প্লান্টের ফুল লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৪৭ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৯:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

২৮ ভাদ্র, দুপুরবেলা। শরৎ ঋতুর অর্ধেকের শেষ পর্যায়। দুপুর ১২টায় গিয়ে হাজির হলাম নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে জিন্দা পার্কের দিঘির পাড়ে। জলে কানায় কানায় পূর্ণ। তার পাড় ধরে ঝোপ করে বেড়ে উঠেছে কতকগুলো জলজ উদ্ভিদ। কিনারা ধরে সবুজ বেষ্টনীটা অপূর্ব লাগছে। শরৎ হলেও আকাশে চলছে মেঘ আর রোদের লুকোচুরি। তাই সবুজ ঝোপের ভেতরে কখনও আলো, কখনও ছায়া পড়ে নান্দনিক হয়ে উঠেছে। 

হাঁটতে হাঁটতে জলাশয়ের ধারে গেলাম, পাড়ে হিজলের ছায়া। পেছনে হাওয়ায় দোল খাওয়া কাশফুলের শুভ্র মঞ্জরি। কাছে গিয়ে নিবিড়ভাবে দেখতেই চোখ আটকে গেল অনেক শুভ্র-স্নিগ্ধ ফুলে। এত সাদাও হয়! এমন শুভ্রতা তো শরৎকেই মানায়। 

বিদেশি ফুল, তাই নামটা রয়ে গেছে তার ইংরেজি– মেক্সিকান সোর্ড প্লান্ট। নার্সারির লোকরা ডাকেন সোর্ড লিলি বলে। কিন্তু এটি ভুল। সোর্ড লিলি বলা হয় গ্ল্যাডিওলাস ফুলকে। তা ছাড়া এটি লিলিজাতীয় কোনো ফুল না। লিলির মতো এসব গাছের গোড়ায় কন্দও হয় না। এর নাম মেক্সিকান সোর্ড প্লান্ট। এ গাছটির জন্মভূমি মেক্সিকো ও ব্রাজিল। 

উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Aquarius palifolius, প্রতিনাম Echinodorus palifolius ও Sagittaria palaefolia, গোত্র অ্যালিসম্যাটাসি। এর পূর্ববর্তী Echinodorus গণনাম এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ থেকে যার অর্থ যথাক্রমে হেজহগ (সজারু) ও ল্যান্স (বর্শা)। পাতার কাঁটাযুক্ত বা তীক্ষ্ণ আকৃতি এবং গঠনশৈলী থেকেই এই নামের উৎপত্তি।

এটি জলজ ও অংশিক জলজ সপুষ্পক বীরুৎ জাতীয় উদ্ভিদ। পাতার আকৃতির কারণে মনে হয় এর নাম হয়েছে সোর্ড প্লান্ট। পাতার বোঁটা লম্বা ও সরু, পত্রফলক বর্শার ফলার মতো উপবৃত্তাকার, সবুজ, স্পষ্টভাবে শিরাবিন্যাস দেখা যায়। একটি লম্বা শক্ত ডাঁটার গিঁটে গিঁটে ফুল ফোটে। ফুল কোমল, পাতলা কাগজের মতো সাদা রঙের পাপড়ি,  ফুলের আকৃতি অনেকটা পিরিচের মতো, পাপড়ি থাকে তিনটি। ফুলের আকার প্রায় ৪ সেন্টিমিটার। এ গাছের গোড়া থাকে জলের ভেতরে, সেখান থেকে লম্বা চাবুকের মতো বেরিয়ে আসে পুষ্পদণ্ড। ফুলের ভার ও দৈর্ঘ্যের কারণে তা বেঁকে ধনুকের মতো হয়ে যায়। 

মেক্সিকান সোর্ড প্লান্ট অত্যন্ত লম্বা ও সুদর্শন এক জলজ উদ্ভিদ। গাছ ১২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। পাতা ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার চওড়া হয়। প্রতি গোছায় ৯ থেকে ১২টি পাতা থাকে। পাতার বোঁটাগুলো খুব লম্বা ও সরু এবং পাতার ফলকগুলো বর্শার মতো আকৃতিবিশিষ্ট। উদ্ভিদটি যদি জলের উপরিভাগ পর্যন্ত বেড়ে ওঠে তবে তাতে ফুল ফোটে এবং এর পুষ্পদণ্ডে ছোট ছোট নতুন অণুচারা জন্মায়। সাধারণত মে থেকে অক্টোবরে ফুল ফোটে। তবে জলাশয়ে জল থাকলে এরা সারাবছর বেঁচে থাকে ও ফুল দেয়। এর ফুলগুলো সাদা ও তিন-পাপড়িযুক্ত, কেন্দ্রস্থলে থাকে খাটো একগুচ্ছ হলুদ রঙের পুরুষকেশর। একটি শক্ত, কৌণিক ও লম্বা কাণ্ডের ওপর বেশ কিছুটা ব্যবধানে চক্রাকারে ফুলগুলো বিন্যস্ত থাকে। একসঙ্গে একস্থানে দু-তিনটি ফুল ফোটে। মেক্সিকান সোর্ড প্লান্ট মূলত ব্রাজিল ও মেক্সিকোর স্থানীয় উদ্ভিদ। 

জলাশয়ের সৌন্দর্যবর্ধন বা জলবাগান তৈরির জন্য এটি একটি ভালো উদ্ভিদ। জলের তলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ গাছ বাড়ে। অগভীর জলাশয় বা বাগানের জলাধার, পুকুর এবং বড় আকারের অ্যাকুয়ারিয়ামে শোভাবর্ধক উদ্ভিদ হিসেবে এটি চাষ করা হয়। অণুচারা বা প্লান্টলেট থেকে চারা জন্মে। জলতলের ওপরে যেসব ফুল ফোটে সেসব ফুল শেষে ফল ও বীজ হয়। সেসব বীজ থেকেও চারা তৈরি করা যায়। যেখানে জন্মে সেখানে আপনা আপনি দ্রুত বাড়ে। তবে আগ্রাসী স্বভাবের না, এসব ঝোপকে ছেঁটে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

আরও পড়ুন

×