অর্থনৈতিক গুরুত্ব না থাকায় বিপন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা
ছবি-সমকাল
আবু সালেহ রনি
প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০০:৪৪ | আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ০৬:৩১
ইংরেজির আগ্রাসন সত্ত্বেও দেশে বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটছে। শুধু মায়ের ভাষা বলে নয়, এই বিকাশ দৈনন্দিন ব্যবহারের মধ্য দিয়েও। তবে বাংলার বিকাশ ঘটলেও গভীর সংকটে রয়েছে দেশে বসবাসকারী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা। কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কারণে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর তরুণ প্রজন্ম মাতৃভাষাবিমুখ হয়ে এখন বাংলার ওপর নির্ভরশীল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বাংলাসহ ৪১টি ভাষার অস্তিত্ব রয়েছে, যা ২০১৮ সালে গেজেটভুক্ত হয়। তবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট পরিচালিত ২০২৪ সালের সর্বশেষ জরিপ বলছে, দেশে টিকে আছে বাংলাসহ ৪৫টি ভাষা। এর মধ্যে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ১১টি ভাষা বিপন্নপ্রায়। কয়েক বছরের মধ্যে ওইসব ভাষা হারিয়ে যেতে পারে।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশে ইউনেস্কোর বিপন্ন তালিকায় থাকা কয়েকটি ভাষার অবস্থা এতই শোচনীয় যে, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ থেকে ১২ জন প্রবীণ ওই ভাষায় কথা বলেন। গবেষকরা বলছেন, বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রক্ষায় অন্য ভাষাগুলো সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কিন্তু নানা বাস্তবতায় বাংলা ক্রমেই নৃগোষ্ঠীর ভাষার মধ্যে প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষাগুলো হলো– কোল, কোডা, মালতো, কুড়ুখ, মুন্ডারী, সান্তাল, সাদরি উত্তরবঙ্গ, সাদরি সিলেট অঞ্চল, মাহালে, চাকমা, মারমা, তঞ্চংঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ককবরক, ত্রিপুরা উসুই, গুর্খালি, খুমি, ম্রো, অহমিয়া, পাংখোয়া, মারমা নর্থ, মারমা সাউথ, খিয়াং লাইতু, খিয়াং কংতু, বম, লুসাই, রেংমিটচা, রাখাইন, চাক, গারো আবেং, গারো আত্তং, গারো মিগাম, হাজং, কোচ, মণিপুরি মৈতৈ, মণিপুরি বিষ্ণুপ্রিয়া, খাসিয়া, মাদ্রাজি, তেলেগু, ঠার, ঢাকাইয়া উর্দু, কুই, লালেং, খাড়িয়া, উড়িয়া, সৌরা, কড়া ও পাহাড়িয়া।
ইউনেস্কোর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সাত হাজারের বেশি ভাষার মধ্যে অন্তত ৪৩ শতাংশ ভাষা সংকটাপন্ন। বিশ্বায়নের কারণে, বিশেষ করে বহু জাতিগোষ্ঠীর ভাষা বিলুপ্তির পথে। প্রতিষ্ঠানটির এক গবেষণায় বলা হয়, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। যখন একটি ভাষা হারিয়ে যায়, তখন ঐতিহ্য, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার একটি অংশ থেকে পুরো বিশ্ব বঞ্চিত হয়। অথচ একেকটি ভাষা ওই দেশ ও সমাজের সাংস্কৃতিক এবং প্রথাগত জ্ঞান বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, ‘ভাষা বেঁচে থাকে ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। ব্যবহার যদি না হয়, তাহলে সেই ভাষা হারিয়ে যায়। বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষার দিকে ঝুঁকছে, কারণ চাকরি থেকে শুরু করে জীবনযাপনের সব কিছুতেই তাদের বাংলার ওপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে।’ তাঁর মতে, দেশে ইংরেজির আগ্রাসনে বাংলা ভাষা যেমন সংকুচিত হচ্ছে, একইভাবে বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর সদস্যরা চাকরিসহ নানা ক্ষেত্রে বাংলার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় হলো, নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের অবশ্যই তাদের মাতৃভাষা ব্যবহারের সুযোগ দিতে হবে।
বিপন্নপ্রায় ১১টি ভাষা
বাংলাদেশ বহু ভাষা, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের সম্প্রীতিপূর্ণ সহাবস্থানের একটি দৃষ্টান্ত। বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির পাশাপাশি এই ভূখণ্ডে আরও প্রায় অর্ধশত ভাষাজাতি রয়েছে। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা অধিকাংশই বিপন্নপ্রায়। ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের সর্বশেষ জরিপের তথ্য বলছে, দেশের ১১টি ভাষা বিপন্নপ্রায়। ভাষাগুলো হলো– গুর্খা, সৌরা, লালেং, মাদ্রাজি, অহমিয়া, কুড়ুখ, উড়িয়া, খাড়িয়া, কুই, রেংমিটচ্য ও লুসাই। এর মধ্যে রেংমিটচ্যর মতো ভাষাও আছে, যার মাত্র পাঁচজন ব্যবহারকারী বেঁচে আছেন। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই ভাষা বিভিন্ন কারণে আবেদন ও উপযোগিতা হারিয়ে ফেলেছে। বাকি সব ভাষার কোনোটির ব্যবহার সম্প্রদায় পর্যায়ে এবং কোনোটির পারিবারিক পর্যায়ে। আর ১৪টি ভাষা এখনও মৌখিক পর্যায়েই রয়ে গেছে। এই ভাষাগুলো যেমন বিপন্নতার ঝুঁকিতে রয়েছে, একই সঙ্গে লিখিতরূপ থাকা চাক, কোডা, কোল ও পাংখোয়ার মতো কিছু ভাষাও হারিয়ে যাওয়ার বাস্তবতার মুখে আছে। এই নিরিখে লিখিত ও অলিখিত সব ভাষাকে সঠিক উপায়ে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা না হলে ভাষাগুলো হারিয়ে যেতে পারে।
সরকারের উদ্যোগ
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে ২০১৭ সালে গৃহীত ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের আওতায় ভাষা সংরক্ষণের কার্যক্রম শুরু করে সরকার। এর আওতায় ২০২২ সালে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ দেশীয় ভাষা সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাসহ দেশের সব ভাষা সংরক্ষণে ডিজিটাল রিসোর্স রিপোজিটরি (তথ্যভান্ডার) তৈরি করা হয়েছে। এই তথ্যভান্ডারে বাংলাদেশের ৪৫টি ভাষার সংক্ষিপ্ত নমুনা সংরক্ষণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণের জন্য মাঠ পর্যায়ে রাজশাহী, দিনাজপুর, রাঙামাটি, বান্দরবান, সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা জোনে (অঞ্চল) জরিপের মাধ্যমে ৪৪টি ভাষার ২০২ জনের ১২ হাজার ৫১৭ মিনিট কথা ডিজিটাল আর্কাইভ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব করিম সমকালকে বলেন, ‘জরিপে অনেক নতুন তথ্য উঠে এসেছে। শিগগির তথ্যাদি পর্যালোচনা করে প্রকাশ করা হবে। আশা করছি, এই কার্যক্রম সম্পন্ন হলে বাংলাসহ দেশের সংস্কৃতিতে সব ভাষাই বহমান থাকবে।’
পাঠদানেও সংকট
২০১২ সালে প্রথম দফায় পাঁচটি মাতৃভাষায় প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং পড়াশোনা শুরুর উদ্যোগ নেয় সরকার। আর ২০১৭ সাল থেকে দেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর শিশুদের মাতৃভাষায় পড়াশোনার জন্য বই বিতরণ শুরু হয়। ২০১৭ সালে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির জন্য এবং ২০১৮ সালে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণি ও প্রথম শ্রেণির জন্য বই বিতরণ করা হয়। তবে এই উদ্যোগ অনেকটা থমকে আছে। কারণ পাঠদানের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক তৈরি হয়নি।
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে যাতে শিক্ষার প্রতি উৎসাহ তৈরি হয়, সে জন্যই সরকার তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাদের ভাষায় পাঠ্যসূচির পাশাপাশি বইও তৈরি করা হয়েছে। মাতৃভাষার সঙ্গে সংযোগ স্থাপনই এর লক্ষ্য। এ ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানে সরকার সচেষ্ট।’
সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. জফির সেতু সমকালকে বলেন, ‘কোনো ভাষার যদি রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি না থাকে, তাহলে ওই ভাষার অর্থনৈতিক গুরুত্ব হারিয়ে যায়, সেটি বিপন্ন হতে শুরু করে। এর কারণ, যে কোনো ভাষার মূল শক্তি তরুণ সমাজ। তারা যখন রাষ্ট্রীর কাজে যুক্ত হন এবং দেখতে পান তার নিজের ভাষার অবস্থান সমাজে দুর্বল, কর্মসংস্থানেও তেমন ভূমিকা রাখছে না; এ জন্যই বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী লোকজন নিজের ভাষা পরিত্যক্ত করে অর্থাৎ মাতৃভাষা থেকে বিচ্যুত হতে শুরু করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অর্থনৈতিক কারণে বাংলা ভাষাও ইংরেজির আগ্রাসনের মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাপী ইংরেজির গুরুত্ব বাড়ছে। তাই বাংলাসহ দেশের সব ভাষা সংরক্ষণ ও ব্যবহারিক গুরুত্ব তৈরি করা প্রয়োজন। নয়তো বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষার যে সংকট চলছে, তা আরও বিস্তৃত হবে।’
- বিষয় :
- ভাষার মাস