ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত

তিন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি হাজারো পরিবার

তিন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত, পানিবন্দি হাজারো পরিবার
×

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৫৪ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারী বৃষ্টিতে পদ্মা নদীতে পানি বাড়া অব্যাহত রয়েছে। কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও নাটোরের চরাঞ্চল এবং নদীতীরবর্তী নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। পাশাপাশি তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার বসতবাড়ি, সড়ক ও ফসলি জমি। 

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নিম্নাঞ্চলের অনেক বসতবাড়িতে কোমরপানি। উপজেলার চিলমারী ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। আবার অনেকে ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিবার-পরিজন ও গবাদি পশু নিয়ে উঁচু স্থানে বা আত্মীয়দের বাড়িতে উঠছেন। পানির তোড়ে নিম্নাঞ্চলের যোগাযোগ সড়কগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। চলাচলের জন্য নৌকা ও টিনের ডিঙি এখন একমাত্র মাধ্যম।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১০ দিন ধরে পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করলেও এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত ত্রাণ বা খাদ্যসামগ্রী পৌঁছায়নি। চরের ফসলি জমি ও গোচারণভূমি ডুবে থাকায় গো-খাদ্যের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে কম দামে পোষা গবাদি পশু বিক্রি করে দিচ্ছেন। নলকূপ ও রান্নার স্থান প্লাবিত হওয়ায় রান্নাবান্না ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাপের উপদ্রব প্রতিরোধ এবং পানিবাহিত রোগ মোকাবিলায় ভ্রাম্যমাণ মেডিকেল টিম পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শ্রেণিকক্ষে পানি উঠে যাওয়ায় চরাঞ্চলের ১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। 

বাহেরমাদিয়া চরের মহিমা বেগম বলেন, চারদিকে শুধু পানি আর পানি। গরু রাখার জায়গা নেই, খাওয়ানোর ঘাসটুকুও পানিতে তলিয়ে গেছে। আশ্রয়ের খোঁজে গিয়ে কোনো উপায় না দেখে বাধ্য হয়ে পোষা দুটি গরু অনেক কম দামে বিক্রি করে দিতে হয়েছে।

দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ১৮ টন চাল ও দুই লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। ১০ কেজি করে চালের প্যাকেট ও শুকনো খাবারের ১ হাজার ৮৫০টি প্যাকেট প্রস্তুত করা হয়েছে। আজ রোববার থেকে এসব সহায়তা বিতরণ শুরু হবে। 

রাজশাহীর বাঘায় ১৩ গ্রাম প্লাবিত
রাজশাহীতে গত ১০ দিন ধরে প্রতিদিন পদ্মার পানি বাড়ছে। নদীতীরের নগরীর পঞ্চবটি এলাকার বেশ কিছু ঘরে পানি ঢোকায় বাসিন্দারা মালপত্র নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিচ্ছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, পদ্মার পানি এখনও বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শহর রক্ষা বাঁধ নিয়ে এই মুহূর্তে কোনো ঝুঁকি নেই। ঝুঁকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান।

অন্যদিকে জেলার বাঘা উপজেলার চকরাজাপুর ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামের মধ্যে ১৩টি গ্রামই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আতারপাড়া, দিয়াড়কাদিরপুর, চৌমাদিয়া, কড়ারি নওশারা, নীচ পলাশী, কালিদাসখালীসহ অধিকাংশ গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তায় হাঁটু থেকে কোমরপানি। কাজ ও ফসলি জমি নষ্ট হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্থানীয় দিনমজুররা। নদীভাঙনের মুখে পড়ে চৌমাদিয়া ও ফতেপুর পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাস্তা ডুবে থাকায় শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসতে পারছে না।

মাঠ ডুবে যাওয়ায় গরু-ছাগলের খাবার নেই। অনেকে মেঝেতে মাচা করে থাকলেও উঁচু জায়গাতে পশু রেখেছেন। বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের সংকটও প্রকট। স্থানীয় বাসিন্দা রাজা ব্যাপারী, সোবহান মোল্লা ও বাতেন মোল্লা জানান, তাদের চেয়ে গরু ছাগলের খাদ্য নিয়ে ভয়াবহ সংকটে পড়েছেন। দ্রুত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি ও শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। 

উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রব্বানী জানান, ভাঙনের কবলে পড়ায় ফতেপুর পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিমুক্ত। পানি বাড়তে থাকলে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তকী ফয়সাল তালুকদার জানান, আতারপাড়া ১০০ পরিবারকে ১৫ কেজি করে চাল ও নীচ পলাশী গ্ৰামের ৫০ পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। দুই একদিনের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের মানুষকেও সহায়তা দেওয়া হবে। 

লালপুরে পানিবন্দি চার শতাধিক পরিবার
পদ্মায় আকস্মিক পানি বাড়াতে নাটোরের লালপুর উপজেলার বিলমাড়িয়া ইউনিয়নের নওশারা সুলতানপুর, চাকলা বিনোদপুর, দিয়াড়শংকরপুর, আরাজি বাকনাই, রসুলপুরসহ ১৮টি চর এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে চার শতাধিক পরিবার। চরাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় গো-খাদ্য সংকটে পড়েছেন গরু-মহিষ খামারিরা।

কৃষক মুনতাজ আলী ও আলাল আলী জানান, চরে তাদের মুলা ও বেগুনের আবাদ তলিয়ে গেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আবির হোসেন বলেন, নওশারা সুলতানপুর চরের ৩০টি পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। বাকি পরিবারে মাঝে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দ্রুত পৌঁছে দেওয়া হবে।

তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো ও প্রতিনিধি

আরও পড়ুন

×