ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাম্পের চিত্র

পরিমাণে কম পেট্রোল কিনে বাজেট ঠিক রাখার চেষ্টা মানুষের   

ভিড় কমেছে যানবাহনের, আছে ক্ষোভ-অসন্তোষও   

পরিমাণে কম পেট্রোল কিনে বাজেট ঠিক রাখার চেষ্টা মানুষের   
×

রাজধানীর রমনা পেট্রোল পাম্পে তেল নিচ্ছেন মোচরসাইকেল চালক

অমরেশ রায়

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:১৪ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৫৯

রাজধানীর মৎস্য ভবন সংলগ্ন রমনা পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে এসেছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী জাফর আহমেদ। জ্বালানি তেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব তার কাছে জানতে চাইলে ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘কী আর বলবো! আগে দিনে ৫ লিটার অকটেন নিতাম। দাম বাড়ানোর পর গত দু’দিন ধরে তার থেকে কম পরিমাণ কিনতে হচ্ছে। বাজেট ঠিক রাখতে পরিমাণে কম কিনে হিসেব করে চলতে হচ্ছে।’ 

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির এমন প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের জীবনে। এমনিতে আগে থেকেই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কষাঘাতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ। অনেকটাই হিসেব করে জীবন চালাতে হচ্ছিল। এবার তেলের দাম বাড়ার কারণে সেই হিসেবকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। 

মঙ্গলবার বিকেলে রমনা পেট্রোল পাম্পসহ রাজধানীর অনেকগুলো পাম্প ঘুরে দেখা গেছে, দাম বাড়ানোর পর গত দু’দিনে বেশিরভাগ পেট্রোল পাম্প ও ফিলিং স্টেশনে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল এবং তেলচালিত অন্য যানবহনের ভিড় কম। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম আসছেন। তবে কয়েকটি পাম্পে স্বাভাবিক সময়ের মতোই ভিড় দেখা গেছে।   

মগবাজারের ‘যমুনা মইন মোটর’ নামের তেলের পাম্পের কর্মচারী নূর আলমের ভাষ্য- কেবল পরিবহন ও চালকদের ভিড়ই কমেনি, তেলের বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। যারা আসছেন, তারাও আগের তুলনায় পরিমাণে কম তেল নিচ্ছেন। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকরা হিসেব করে তেল নিচ্ছেন। প্রাইভেটকার, জিপ ও মাইক্রোবাস চালকরা সংখ্যায় কম আসলেও, তারা আগের মতো প্রায় একই পরিমাণ তেল নিচ্ছেন বলে জানান নূর আলম।      

পাম্প কর্মচারীদের এমন কথার সায় মিললো রাইড শেয়ারিং করা মোটরসাইকেল চালক আরিফ হোসেনের কথায়ও। তিনি বললেন, ‘আগে ২০০ টাকার তেল নিতাম। এখনও সেই পরিমাণ টাকার তেল নিলে লিটারের হিসেবে কম পাব। এই কারণে টাকার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩০০ টাকার নিতে হচ্ছে। কিন্তু যাত্রীরা তো আর বেশি ভাড়া দিতে রাজি হবেন না বা হচ্ছেনও না। ফলে হিসাব মিলাতে গিয়ে হিমসিম খাচ্ছি।’   

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রাইভেটকার চালক আলমাস আলী জানালেন, তার প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা ও আইন মেনেই তেল নিতে হয় তাকে। তিনি চাকরি করেন, তেলের হিসাব মেলানোর দায়িত্ব তার নয়।   

রমনা পেট্রোল পাম্পের স্বত্ত্বাধিকারী নাজমুল হক অবশ্য বলেছেন, পাম্পগুলোতে তেল নিতে আসা মানুষের ভিড় এমন কমে যাওয়ার পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নাকি রাজধানীতে সাম্প্রতিক ককটেল বিস্ফোরণ ও সহিংসতা দায়ী- সেটা বুঝতে পারছি না। কেননা তেলের দাম বাড়ানোর আগের দিন রোববার থেকেই রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া ও মানুষের ভিড় স্বাভাবিকের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছিল। এর পরপরই সোমবার থেকে তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা এলো। গত দু’দিন ধরে পেট্রোল পাম্পে তেল নিতে আসা মানুষের ভিড় কমে গেছে। এখন দাম বাড়ানো নাকি সহিংসতা ঠিক কোনো কারণে এই ভিড় কমলো, সেটা আমরাও বুঝতে পারছি না। 

তিনি বলেন, তবে এটুকু দেখেছি, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মোটরসাইকেল চালকরা। তাদের এখন আগের বাজেট ঠিক রেখে, কিন্তু পরিমাণে কম তেল নিয়ে হিসেব করে চলতে দেখছি। 

রোববার জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, সোমবার থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। ডিজেলের দাম বেড়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫, পেট্রোল ১৬০ ও অকটেন ১৬৫ টাকা লিটার করা হয়েছে। এটা দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের সর্বোচ্চ দাম। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, পেট্রোল ১৪০ ও অকটেন ১৪৫ টাকা লিটারে বিক্রি হয়েছে। 

সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষোভ-অসন্তোষ চলছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশেষ করে স্বল্পআয়ের মানুষের মধ্যে। মিরপুর-সদরঘাট রুটে চলাচলকারী বিহঙ্গ পরিবহনের হেলপার আবুল কাশেমের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই এরকম, ‘বুঝলাম তেলের দাম বাড়াতে হবে! তাই বলে একলাফে ২০ টাকা। এখন তো ভাড়া বাড়াতে গেলেই যাত্রীরাও খেপে যাবে।’ পাশে থাকা যাত্রী মনসুর আহমেদ বললেন, মাত্র কয়েকদিন আগেও তেলের দাম বাড়ায় বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। এখন আরেকবার বাড়ালে আমরা কই যাব! 

রমনা পেট্রোল পাম্পের স্বত্ত্বাধিকারী নাজমুল হক আরও বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য একলাফে ২০ টাকা, বিশেষ করে ডিজেলের দাম একবারে এতটা বাড়ানো ঠিক হয়নি। কেননা সাধারণ মানুষের পরিবহন এবং কল-কারখানা চালানো জন্য বেশি দরকারি। ফলে কল-কারখানা ও রাস্তায় চলাচল করা গণপরিবহন এবং সাধারণ গাড়িগুলো বিপাকে পড়বে। একবারে না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে তেলের দাম বাড়ানো উচিৎ ছিল বলেও মন্তব্য করেন নাজমুল হক।

আরও পড়ুন

×