কেমন ছিল কৃষি ও শ্রমবাজার?
গোলাম মোরশেদ
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২১ | ০১:২৮
কৃষিশুমারি ২০১৯ অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট খানার সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি, যার মধ্যে পল্লি এলাকায় বসবাস করে প্রায় ৩ কোটি। এর মধ্যে কৃষি খানার সংখ্যা অর্ধেকের কম (৪৬.৬১ শতাংশ) এবং এর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। দেশের ১১.৩৩ শতাংশ খানার কোনো নিজস্ব্ব জমি নেই। ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টস স্ট্যাটিস্পি ২০২০ অনুযায়ী ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৩.০২ শতাংশ, যার ভেতর মূলত তিনটি উপ-খাত (ক) শস্য ও উদ্যান, (খ) পশুপালন এবং (গ) বনায়ন ও অন্যান্য সেবা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার আগের বছর জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ১৩.৩২ শতাংশ।
২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষি খাতের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির হার ধারণা করা হয়েছিল ৩.১১ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৩.৯২ শতাংশ। প্রতিবেদনে (নভেম্বর ২০২০) আরও উল্লেখ করা হয়, আমনসহ অন্যান্য শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে শস্য ও উদ্যান উপ-খাতে ০.৮৯ শতাংশ বেশি প্রবৃদ্ধি হতে পারে। গত অর্থবছরের আউশ ধানের উৎপাদন ধরা হয়েছিল ২৭.৫৪ লাখ টন, আমন ধানের উৎপাদন ১৪০.৬৩ লাখ টন এবং বোরো ধানের উৎপাদন ১৯৫.৬০ লাখ টন। অন্যদিকে, ভুট্টার উৎপাদন বিগত সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। গত বছর ভুট্টার অনুমিত উৎপাদন ছিল ৩৫.৬৯ লাখ টন ও গমের উৎপাদন ১০.১৬ লাখ টন। গত অর্থবছরে পাটের উৎপাদন ছিল ৮৫.৭৬ লাখ বেলস, যা আগের অর্থবছরের উৎপাদনের চেয়ে কম। তা ছাড়া ডাল, মসলা, আখ, ফল, শাক-সবজি ও তামাকের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শস্যগুলো গত বছরে এই উপ-খাতের প্রায় ৩০ শতাংশ অবদান রাখতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়। আবার কৃষি খাতে শস্য উৎপাদনের পাশাপাশি অ-শস্য কৃষিজ উপ-খাত যেমন- পশুপালন, বনায়ন ও মাছ চাষের প্রবৃদ্ধি হার গত বছরের তুলনায় কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
২০১৯-২০ অর্থবছরে কৃষি খাতের পর দেশের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৫.৩৬ শতাংশ, যেখানে প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করা হয়েছিল ৬.৪৮ শতাংশ, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১২.৬৭ শতাংশ। আর জিডিপিতে সর্বোচ্চ অবদান রেখেছে সেবা খাত (৫৫.৮৬ শতাংশ), যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৫.৫৩ শতাংশ।
২০২০ সালের কৃষি ও শ্রমবাজারে করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব ছিল প্রকট। করোনার প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে কিংবা বহির্বিশ্বের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে সংকট সৃষ্টি হয়। করোনার প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত করার কারণে কৃষিজ কাঁচামাল পরিবহনে সমস্যা দেখা যায়। ফলে প্রায় সারাদেশেই কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছিল বিশেষত নগর অঞ্চলে। এ ছাড়া কয়েক দফা বন্যার প্রভাবে দেশে শীতকালীন সবজি উৎপাদনে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলম্ব হয়। এর প্রভাবে প্রায় সারাবছর শাক-সবজির দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এ বছর ভারি বৃষ্টিপাত ও বন্যার কারণে আমন ধান নষ্ট হওয়ায় ধান ও চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছিল। ২০১৯ সালের মতো ২০২০ সালেও নির্দিষ্ট কিছু পণ্য যেমন- পেঁয়াজ, আলু ইত্যাদির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা আলোচনায় ছিল। একপর্যায়ে প্রতি কেজি পেঁয়াজ ১৩০ টাকা ও আলু ৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
করোনাভাইরাসের প্রভাবে খামারি পর্যায়ে মুরগি, ডিম ও দুধের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে জানা যায়, খামারিরা করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক লাখের মতো মুরগির বাচ্চা মাটিতে পুঁতে ফেলেছিল। পোলট্রি খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা লোকসান হয়েছে বলে দাবি করা হয়। কাঙ্ক্ষিত মূল্যে বিক্রি করতে না পেরে অনেকে দুধ ফেলে দিয়েছে। এ ছাড়া লকডাউনের কারণে মৎস্য খামারিরা মাছের পোনা সংগ্রহ ও অবমুক্ত করতে পারছিল না বলে জানা যায়, যা সামগ্রিকভাবে মাছের উৎপাদনকে বিঘ্নিত করেছে। এ ছাড়া মে মাসের শেষের দিকে ঘূর্ণিঝড় আম্ম্ফানের কারণে কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড় আম্ম্ফানের প্রভাবে কয়েক হাজার হেক্টর জমির খাদ্যশস্য, পানের বরজ, ফলের বাগান ও শাক-সবজির আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এ বছর কৃষিকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে তেমন কোনো সংগঠিত অসন্তোষ বা আন্দোলন দেখা যায়নি।
বোরো মৌসুমে করোনাভাইরাসের প্রভাবে কৃষকদের মধ্যে ধান কাটা নিয়ে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হলেও তা স্থায়ী হয়নি। প্রথমদিকে মনে হচ্ছিল করোনাভাইরাসের প্রভাবে কৃষি শ্রমিকরা যদি দেশের অভ্যন্তরে যাতায়াত করতে না পারে, তা হলে কৃষকরা ধান কাটা নিয়ে বিপাকে পড়তে পারেন। বিশেষত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হাওর এলাকায় ধান কাটা শেষ করতে না পারলে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কৃষকরা খুব ভালোভাবেই তা সামলেছেন। করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসীরা নিজ নিজ গ্রামে অবস্থান করায় প্রায় সবাই একত্রে ধান কাটার কাজে যুক্ত হন। শুধু তাই নয়, এ বছর কৃষকরা গতবারের তুলনায় বোরো মৌসুমে বেশি ফলনও পেয়েছেন। ধানের দাম নিয়েও কৃষকদের মধ্যে তেমন অসন্তোষ দেখা যায়নি।
২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধি কমেছে। কারখানাগুলো কয়েক মাস সম্পূর্ণ বা সীমিত আকারে বন্ধ ছিল। ছোট আকারের কিছু কিছু কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কাজ হারিয়েছেন অনেক শ্রমিক। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, চাহিদা হ্রাস, ক্রয়াদেশ বাতিল এবং রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে সরকার ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল।
দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬৪.৬ মিলিয়ন, যেখানে নারী ৮২.২ মিলিয়ন এবং পুরুষ ৮২.৪ মিলিয়ন। মোট জনসংখ্যার ১০৯.১ মিলিয়ন জনগোষ্ঠীর বয়স ১৫ বছরের ঊর্ধ্বে। তাদের মধ্যে ৬৩.৫ মিলিয়ন কর্মক্ষম, যার ভেতর ৬০.৮ মিলিয়ন শ্রমবাজারে নিয়োজিত আছে (শ্রম শক্তি জরিপ ২০১৬-১৭)। দেশের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ হার ৫৮.২ শতাংশ, যেখানে পুরুষের উপস্থিতি ৮০.৫ শতাংশ এবং নারীর উপস্থিতি ৩৬.৩ শতাংশ। শ্রমবাজারের বাইরে রয়েছে ৪১.৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী। আবার ২৯.৮ শতাংশ লোক রয়েছে যারা শিক্ষা, কর্ম কিংবা প্রশিক্ষণ কোনো কিছুতেই নেই। মোট কর্ম খাতের ৮৫.১ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাত, আর মাত্র ১৪.৯ শতাংশ আনুষ্ঠানিক। পেশাগতভাবে কৃষি খাতে দক্ষ শ্রমিক হিসেবে সর্বোচ্চ ৩২.৪ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে। আবার খাতভিত্তিকভাবেও সর্বোচ্চ ৪০.৬ শতাংশ লোকবল কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলাদেশে বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ, যার পরিমাণ সংখ্যায় ২.৭ মিলিয়ন। যাদের ২২ লাখেরই বয়স ২৯ বছরের কম। পুরুষের বেকারত্ব ৩.১ শতাংশ, অন্যদিকে নারীর বেকারত্ব ৬.৭ শতাংশ। সর্বশেষ শ্রম শক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অশিক্ষিতদের তুলনায় শিক্ষিতদের বেকারত্বের হার ৩ গুণ বেশি। শিক্ষার লেভেল বিবেচনায় উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ঊর্ধ্বমুখী। যেমন- নিম্ন মাধ্যমিকের তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিক পাসকৃতদের বেকারত্ব প্রায় ৪ গুণ, আর স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তরদের মধ্যে বেকারত্ব ৩ গুণ বেশি। তবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে ২০২০ সালে এই বেকারত্বের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে দেশে তরুণদের বেকারত্বের হার সামগ্রিক গড় বেকারত্ব হারের তিন গুণ, সেখানে আবার করোনার প্রভাবে এই তরুণদের মধ্যেই বেকারত্বের পরিমাণ আরও বেড়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) 'ট্যাকলিং দ্য কভিড-১৯ ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট ক্রাইসিস ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক' (আগস্ট ২০২০) শীর্ষক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, করোনার আগে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ১২ শতাংশ, যা এরই মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে।
- বিষয় :
- চতুরঙ্গ
- গোলাম মোরশেদ