ভ্রমণ
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে একদিন
সুমন্ত গুপ্ত
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ০৫:১১
ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূল ভবন ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে সাজানো। বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা অমূল্য প্রতিকৃতি, মোগল আমলের নানা নিদর্শন, টিপু সুলতানের তরবারি, মহারানীর ব্যবহারের চেয়ার, পিয়ানো, গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ রয়েছে সেখানে
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চলল। এখনও রোশনির দেখা নেই। রোশনি এলেই আমরা বের হবো নতুন গন্তব্যে। কলকাতা ভ্রমণের চতুর্থ দিন। গত তিন দিন এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরে বেড়িয়েছি। আজ একটু বিশ্রাম নিয়েই বের হওয়ার পরিকল্পনা। রোশনি উপস্থিত। সঙ্গে বর শুভদ্বীপ। দেরি না করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম নতুন গন্তব্যের পথে। চার চাকার যানে উঠতেই রোশনিকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাব আজ? রোশনি বলল, গত কয়েক দিন আমরা ঠিক করেছি কোথায় যাব। আজ টুকাই দা ঠিক করুক কোথায় নেবে আমাদের। বলতেই চার চাকার গাড়ির কাণ্ডারি টুকাই দা বলল, অনেক তো তোমরা ঘুরেছ কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গাতেই যাওনি। বলতেই রোশনি বলে উঠল, কোন জায়গার কথা বলছ টুকাই দা। প্রত্যুত্তরে টুকাই দা বলল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের কথা বলছি। ভারতের স্থাপত্য বিস্ময়ের তালিকায় মহিমার দিক দিয়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল তাজমহলের পরেই গণ্য হয়। তবে স্থাপত্যশৈলীর একত্রকরণের ভাষায় বলতে গেলে, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল সম্ভবত মহান তাজকেও ছাড়িয়ে যায়। আমরা আছি নিউমার্কেটের সামনে। বাংলাদেশের ঢাকার নিউমার্কেটের মতো এখানেও বেশ ভিড়।
টুকাই দার কাছে জানতে চাইলাম, আর কতক্ষণ লাগবে পৌঁছাতে আমাদের গন্তব্যে? বলল, এখান থেকে চার কিলোমিটার হবে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ২০ মিনিটের মতো লাগবে আমাদের পৌঁছাতে। হাজির হলাম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের ফটকের সামনে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছিল রূপকথার কোনো রাজ্যের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। টিকিট কাউন্টারে মানুষের দীর্ঘ সারি। আমি আর শুভদ্বীপ গেলাম টিকিট কাউন্টারে টিকিট কাটতে। প্রায় ৩০ মিনিট লাইনে দাঁড়ানোর পর টিকিট হাতে পেলাম আমরা। এবার ভেতরে প্রবেশের পালা। প্রবেশপথে বিশালদেহী দুই সিংহ আমাদের স্বাগত জানাল। পদব্রজে গেলাম এগিয়ে। এখানেও লাইন। কষ্টের ফল ভালো হয়- মনকে বোঝালাম। প্রথমেই চোখে পড়ল সুন্দর ফুলের বাগান।
নানা রঙের ফুল ফুটেছে সেখানে। সামনে এগিয়ে যেতেই দেখা পেলাম সিংহাসনে বসা রানী ভিক্টোরিয়ার ভাস্কর্যের। রোশনি বলল, আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্ট সিটি হলের স্থাপত্যশৈলীর আদলে এ স্মৃতিসৌধের নকশা প্রস্তুত করেন স্যার উইলিয়াম এমারসন। তাই এটি দেখতে অনেকটা আগ্রার তাজমহলের মতো। অনেকেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালকে পশ্চিমবঙ্গের তাজমহল বলে আখ্যায়িত করেন। প্রথমে তাঁকে ইতালীয় রেনেসাঁ স্থাপত্যশৈলীতে স্মৃতিসৌধের নকশা প্রস্তুত করতে বলা হলেও, তিনি শুধু ইউরোপীয় স্থাপত্যশৈলী প্রয়োগের বিরোধিতা করেন এবং ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীর সঙ্গে মোগল উপাদান যুক্ত করে মূল সৌধের নকশা প্রস্তুত করেন। ভিনসেন্ট এসচ ছিলেন এই সৌধের অধীক্ষক স্থপতি। সৌধসংলগ্ন যে বাগানটি দেখতে পাচ্ছ, তার নকশা প্রস্তুত করেছিলেন লর্ড রেডেসডেল ও স্যার জনপ্রেইন। কলকাতার মার্টিন অ্যান্ড কোং সংস্থার ওপর নির্মাণকাজের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল। ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯০৬ সালে। সৌধটির উদ্বোধন হয় ১৯২১ সালে। আমরা পদব্রজে এগিয়ে যেতে লাগলাম মূল ভবনের দিকে। মূল ভবন ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে সাজানো। এটি রয়্যাল গ্যালারি নামে পরিচিত। এই গ্যালারিতে দেখতে পেলাম ব্রিটিশ রাজপরিবারের বিভিন্ন ছবি।
দেখা পেলাম বিখ্যাত শিল্পীদের হাতে আঁকা অমূল্য প্রতিকৃতির। দেখতে পেলাম মোগল আমলের নানা নিদর্শন, টিপু সুলতানের তরবারি থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলে হাতে লেখা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ, চিঠি। মহারানীর ব্যবহারের চেয়ার, পিয়ানোসহ বিবিধ জিনিস। মৃত্যুর ঠিক এক বছর আগে ভারতের শাসকদের উদ্দেশে লেখা মহারানীর শেষ চিঠিটিও দেখতে পেলাম এই গ্যালারিতে। এই গ্যালারিতেই আরও দেখতে পেলাম ব্রিটিশ আমলে ব্যবহার করা নানা রকমের অস্ত্র, পোশাকসহ বিভিন্ন জিনিস। প্রতিটি জিনিস বহন করে চলেছে সময়ের ইতিহাস। ভিক্টোরিয়া স্মৃতিসৌধের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন অংশ হলো, এই স্থাপত্যের ঠিক মধ্যভাগের একটি ডোম বা গম্বুজ। এই ডোমের ঠিক নিচের ঘরটিকেই বলা হয় কুইন'স হল। ডোমটির ঠিক ওপরেই মধ্যস্থলে বসানো রয়েছে বিউগল হাতে ডানা মেলা ব্রোঞ্জের সেই বিশ্বখ্যাত পরীটি। নিচে, ভেতরে এই ঘরটির পাশ দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি দিয়ে চলে যাওয়া যায় ওপরে। ডোমটির গোলাকৃতি ঘিরেই রয়েছে একটি রেলিং দেওয়া পথ। এ পথের ঠিক ওপরের পোর্টিকোগুলোয় স্থাপিত হয়েছে ১২টি বেশ বড় মাপের ছবি। রোশনি বলল, দীর্ঘকাল এই অনবদ্য চিত্রকলাগুলো সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। ২০১২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাজ্যপাল কে আর নারায়ণন এই ডোম পাথওয়েটি খুলে দিয়েছিলেন উৎসাহী দর্শকের জন্য।
এখন সব সময় অনুমতি না মিললেও এই অসাধারণ রাজকীয় মহিমাসমৃদ্ধ কুইন'স হলের ভেতরে এসে একবার ওপরের দিকে তাকান, ঠিক চোখে পড়বে মহারানী ভিক্টোরিয়ার জীবনীসহ এই অসাধারণ ছবিগুলো। আমরা একে একে ঘুরে দেখলাম স্কাল্পচার গ্যালারি, রয়্যাল গ্যালারি, সেন্ট্রাল হল, পোর্ট্রেট গ্যালারি, আর্মস অ্যান্ড দ্য ম্যান গ্যালারি, ক্যালকাটা গ্যালারি এবং আরও বেশ কিছু গ্যালারি। এ ছাড়া এখানে সেই সময়ের স্ট্যাম্প, কয়েন এবং ম্যাপের একটি গ্যালারিও আছে, যা খুবই ইন্টারেস্টিং। শুভদ্বীপ বলে উঠল, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের জমির ওপরেই আগে ছিল প্রেসিডেন্সি কারাগার। পরে এই কারাগার সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় আলিপুরে এবং সেই কারাগারের জমির ওপরেই তৈরি করা হয় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল। ভারত স্বাধীন হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। তার পরে এই দেশে নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন ব্রিটিশ শাসকের যে ভাস্কর্য ছিল, তা তুলে ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ রকম অনেক ভাস্কর্যই এখন শোভা পায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের এই বিশাল বাগানে। সেই সময়ে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বানানোর জন্য বিভিন্ন রাজ্য থেকে টাকা জমা করা হয়। লর্ড কার্জনের যে আবেদন বা অনুরোধ ছিল, সেই মতো এই সৌধ বানানোর জন্য সব রাজ্য তাদের সাধ্যমতো অর্থ তুলে দেয়। এই স্মৃতিসৌধ বানাতে সে সময় খরচ হয়েছিল ১ কোটি ৫ লাখ টাকা।
কীভাবে যাবেন
কলকাতা যেতে হলে প্রথমে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। আর ভিসা পাওয়ার পর বিভিন্ন রুটে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে পারবেন।
উড়োজাহাজে ঢাকা থেকে কলকাতা
বাংলাদেশ থেকে কলকাতা সবচেয়ে কম সময়ে, সহজে ও আরামে যাওয়ার জন্য উড়োজাহাজ বেছে নিতে হবে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ্র ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে বিভিন্ন ফ্লাইট প্রতিদিনই যাতায়াত করে। উড়োজাহাজের ক্ষেত্রে কলকাতায় যাওয়ার জন্য রয়েছে বাংলাদেশ বিমান, ইন্ডিগো, স্পাইস জেট ও এয়ার ইন্ডিয়া। আর উড়োজাহাজে চড়ে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা সময় লাগে।
ট্রেনে ঢাকা থেকে কলকাতা
বাংলাদেশ-ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগে মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনে সরাসরি কলকাতা যেতে পারবেন। মৈত্রী এক্সপ্রেস শুক্র, শনি, রবি ও বুধবার সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করে। এই ট্রেন দর্শনা বর্ডার দিয়ে গেদে হয়ে কলকাতার চিতপুর স্টেশনে যায়। ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে সময় লাগে প্রায় ৯-১৩ ঘণ্টা। ট্রাভেল ট্যাক্সসহ এসি সিটের জনপ্রতি ভাড়া ৩ হাজার ৪০০ টাকা আর এসি চেয়ারের জনপ্রতি ২ হাজার ৫০০ টাকা। তবে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের ভাড়া অর্ধেক।
এ ছাড়া ঢাকা থেকে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে বেনাপোল গিয়ে সেখান থেকে আলাদাভাবে কলকাতা যেতে পারবেন। আর বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেন খুলনা থেকে কলকাতার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে কলকাতা-দমদম-বনগাঁও-পেট্রাপোল-বেনাপোল-ঝিকরগাছা-যশোর-খুলনা রুটে বন্ধন এক্সপ্রেস যাতায়াত করে। বন্ধন এক্সপ্রেস খুলনা থেকে দুপুর দেড়টায় রওনা দিয়ে সন্ধ্যা ৭-৮টার মধ্যে কলকাতায় পৌঁছে। খুলনা স্টেশন কাউন্টারে বন্ধন এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়।
বাসে ঢাকা টু কলকাতা
বাসের ক্ষেত্রে শ্যামলী, বিআরটিসি স্ক্যানিয়া, গ্রিন লাইন, দেশ ট্রাভেলস, সোহাগ, সৌহার্দ্য ও রয়েল কোচে ঢাকা থেকে কলকাতা যেতে পারবেন। এসব বাসের মধ্যে বিআরটিসি, সোহাগ, শ্যামলী ও গ্রিন লাইনের সার্ভিস ভালো। ঢাকা টু কলকাতা বাস ভাড়া :নন-এসি বাসের জনপ্রতি ভাড়া ১২০০ টাকা আর এসি বাসের ভাড়া ১৫০০-১৯০০ টাকা।
কলকাতার শিয়ালদহ রেলস্টেশন থেকে নয়াপাড়া ৫ রুপি ভাড়ায় মেট্রো ট্রেনে রবীন্দ্রসদন নেমে খানিকটা হেঁটে গেলেই ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল। তা ছাড়া ক্যাব ভাড়া করেও যেতে পারবেন ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে।
কোথায় থাকবেন
কলকাতার নিউমার্কেট, মারকুইস স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, রফি আহমেদ রোডে রয়েছে অনেক হোটেল। আপনি আপনার বাজেট ও পছন্দমতো কোনো হোটেলে থাকতে পারবেন। সাধারণত মোটামুটি মানের নন-এসি রুমের ভাড়া ৮০০-১২০০ টাকার মধ্যে এবং এসি রুমের ভাড়া ১৪০০ রুপির ওপরে।