আশায় বসতি: অনিশ্চিত সময়ে ইরানিরা যে আশ্রয় আঁকড়ে ধরে
তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে হাঁটার সময় বুদবুদ দেখে হেসে ওঠেন তিন নারী। ফাইল ছবি: এএফপি
মিডল ইস্ট আই
প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৪:৩৫
দুই বছরে দুটি যুদ্ধের প্রভাব এবং নতুন সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা অনেক ইরানির দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও বাড়তে থাকা আবাসন ব্যয় দীর্ঘমেয়াদি অনেক পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে।
রাজনৈতিক হতাশা ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিধিনিষেধের কারণে অনেক সচেতন নাগরিক এখন ভালো ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেন না। তারা বরং ভাবছেন, ভবিষ্যতের জন্য কোনো পরিকল্পনা করা আদৌ সম্ভব কি না।
সম্প্রতি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে তেহরানের ভেলায়াত পার্কে জড়ো হয়েছিল কয়েক’শ মানুষ। দৌড়ের পোশাকে অনেক নারী আয়োজকদের দেওয়া স্পোর্টস হেডকভার পরেছিলেন। কয়েকজন মাথা না ঢেকেই দৌড়ান। সেই ভিডিও দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের কর্তৃপক্ষ বাধ্যতামূলক পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আয়োজকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এই ঘোষণার আগে অংশগ্রহণকারীদের কাছে প্রতিযোগিতাটি আনন্দদায়ক একটি মুহূর্ত ছিল। মনোবিজ্ঞানী ফাহিমেহ বলেন, সেদিনের পরিবেশে তিনি বিরল এক ধরনের প্রাণশক্তি, আশা ও জীবনের অনুভূতি পেয়েছিলেন।
আশা বলতে কী বোঝেন, তা নিজেই ব্যাখ্যা করেন ফাহিমেহ। আগামীকাল সবকিছু ভালো হয়ে যাবে- এমন বিশ্বাস করাকে আশা মানতে তিনি রাজি নন। বরং আজই কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলাকে ‘আশা’ মনে করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভবিষ্যৎ নিয়ে ইরানিদের মাঝে যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা না দেখলে ফাহিমেহের ওই সিদ্ধান্তের বিষয়টি বোঝা কঠিন।
আশার পরিবর্তিত রূপ
তেহরানে যেদিন দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল সেদিনই আরেকটি স্থানে বড় সমাবেশ হয়। ‘জান-ফাদা’ নামের ওই কর্মসূচিতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, সশস্ত্র স্বেচ্ছাসেবক ও সরকার সমর্থকরা অংশ নেন।
দুটি আয়োজনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু মানুষের জীবনের বিপরীত দুটি চিত্র তুলে ধরে। একদিকে মানুষ দৌড়ের মতো প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রাণশক্তি লাভের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে কেউ কেউ জাতীয় প্রতিরক্ষা ও আত্মত্যাগের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিষয়টিকে সরলীকরণ না করে অন্যভাবেও দেখা যায়। আয়োজন দুটিতে মানুষ ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে গেলেও তারা আসলে একই ধরনের আর্থিক পরিস্থিতি ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রটিতেই ভবিষ্যত নিয়ে তাদের আশার পরিধি বদলে গেছে।
কিশোর সন্তানের বাবা ও সাংবাদিক হামেদের মতে, একজন মানুষের হাতে থাকা শেষ সম্পদটুকুই আশার উপকরণ। কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মানুষের আশাকে হয়তো পুরোপুরি শেষ করে দেয়নি। কিন্তু ধরনকে বদলে দিয়েছে।
একসময় কেউ বাড়ি বা গাড়ি কেনার স্বপ্ন দেখতো। এখন কারও কারও ক্ষেত্রে আকাঙক্ষার পরিধি ছোট হয়ে নতুন ফোন কেনা, অল্প কয়েকদিনের জন্য কোথাও ঘুরতে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য কম খরচের কোনো উপায় খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
হামেদের কাছে এসব ছোট ছোট সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, পরিধি ছোট হয়ে গেলেও মানুষ এখনো ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করছে।
‘বেঁচে থাকাটাই মূল্যবান’
কিছু ইরানির ক্ষেত্রে কেবল দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যাশার পরিধি ছোট হয়ে যাওয়াটাই মূল সমস্যা নয়। তারা আসলে উদার রাজনৈতিক পরিবেশের আশায় আছেন।
২০২৪ সালে কট্টরপন্থি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুর পর দায়িত্ব নেন সংস্কারপন্থি মাসুদ পেজেশকিয়ান। তখন নাগরিক সমাজ আরও কিছুটা সুযোগ পাবে বলে আশা করেছিলেন এক পরিবেশকর্মী ও লেখক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, কিছু সীমিত পরিবর্তন এসেছিল। তবে তা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম।
দুটি যুদ্ধে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু পরিবেশকর্মী হয়েও ওই লেখক কিছু করতে না পরার অনুভূতিতে ভুগছেন। সবশেষ সংঘাতের সময় চাকরিটাও চলে গেছে। ফলে যুদ্ধ তাঁর ভালো লাগা ও টিকে থাকার দুটি ক্ষেত্রেই আঘাত হেনেছে।
তবুও তিনি নিজেকে নৈরাশ্যবাদী মনে করেন না। চেকপ্রজাতন্ত্রের লেখক ভাৎসলাভ হাভেলের আশা ও আশাবাদের মধ্যকার পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে ওই পরিবেশকর্মী বলেন, ‘সবকিছু ভালোভাবে শেষ হওয়ার নিশ্চয়তা কোনো আশা নয়। বরং একজন মানুষ যা করেন, সেটির ফলাফল যাই হোক না কেন, অন্তত সেই কাজের অর্থ তৈরি হওয়ার বিশ্বাসটুকুই আশা।’
ওই পরিবেশকর্মীর মতে, দুই বছর পর তাঁর জীবন ভালো হবে নাকি আরও খারাপ হবে, তা তিনি জানেন না। তাঁর কাছে ‘বেঁচে থাকাটাই মূল্যবান’।
- বিষয় :
- আশার আলো
- অনিশ্চিত
- জীবন-সংগ্রাম
- ইরান
- মূল্যস্ফীতি
- নারী