পৃথিবীতে মহাকাশ বর্জ্যের আঘাত
মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসা বর্জ্য বা ‘স্পেস জাঙ্ক’-এর আঘাতে সরাসরি আহত হওয়া ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মানুষ লটি উইলিয়ামস
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাতের নিস্তব্ধ আকাশে হুট করে জ্বলে ওঠা ‘খসে পড়া তারা’ বা উল্কাপাত দেখলে আমরা অনেকে রোমাঞ্চিত হই। চোখ বুজে হয়তো মনে মনে কোনো গোপন ইচ্ছে পূরণের বাসনাও করি। ভাবুন তো, সেই মহাজাগতিক বিস্ময় যদি আকাশ থেকে সোজা নেমে এসে আপনার কাঁধে আছড়ে পড়ে? কল্পবিজ্ঞানের পাতায় এমন ঘটনার কথা মানালেও বাস্তবে এমন এক অবিশ্বাস্য ঘটনার শিকার হয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী। মহাকাশ থেকে ধেয়ে আসা বর্জ্য বা ‘স্পেস জাঙ্ক’-এর আঘাতে সরাসরি আহত হওয়া ইতিহাসের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র মানুষ তিনি–লটি উইলিয়ামস।
১৯৯৭ সালের ২২ জানুয়ারি, বুধবার। যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা অঙ্গরাজ্যের তুলসা শহরের টারলি এলাকার ও’ব্রায়েন পার্ক। কনকনে শীতের ভোর, তাপমাত্রা হিমাঙ্কের কাছাকাছি। রাতের শিফটে বা একদম ভোরের শিফটে কাজ করেন এমন একদল নারী প্রতিদিনের মতো সেদিনও পার্কে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন। মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছিল অগণিত তারা।
ঘড়িতে তখন রাত ৩টা ৩৬ মিনিট। দলের একজন, পেশায় ডাককর্মী লটি উইলিয়ামসের চোখ হঠাৎ আটকে গেল আকাশের দিকে। দেখলেন, উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে একটি উজ্জ্বল ‘খসে পড়া তারা’ ছুটে যাচ্ছে। পশ্চিম দিগন্তের কাছাকাছি পৌঁছাতেই সেটি আগুনের গোলার মতো জ্বলে উঠল। লটির ভাষায়, ‘মনে হলো যেন পুরো আকাশে আগুন লেগে গেছে!’ চোখের পলকে আবার মিলিয়ে গেল সেই মহাজাগতিক দৃশ্য। এই অভাবনীয় সৌন্দর্য দেখে অভিভূত হলেও প্রাতর্ভ্রমণ থামাননি লটি ও তাঁর বন্ধুরা। এর ঠিক কয়েক মিনিট পরে ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। গাছের ডালপালা ভেঙে কোনো ভারী বস্তু পড়ার মতো এক বিকট শব্দে কেঁপে উঠলেন তারা। ঠিক তখন একটি খালি সোডা ক্যানের মতো ওজনের ছোট্ট একটি বস্তু সরাসরি এসে আঘাত করল লটির কাঁধে। হতবাক লটি এগিয়ে গিয়ে বস্তুটি ঘাস থেকে কুড়িয়ে নিলেন। আলোর নিচে ধরে দেখলেন, এটি কালচে রঙের, আংশিক গলে যাওয়া এবড়োখেবড়ো প্লাস্টিকের মতো এক অদ্ভুত টুকরো। তিনি তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, এইমাত্র তিনি ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে ফেলেছেন।
আকাশে দেখা সেই উজ্জ্বল আলোর সঙ্গে এই অদ্ভুত বস্তুর কোনো যোগসূত্র আছে কিনা, তা জানতে লটি প্রথমে ছুটলেন স্থানীয় লাইব্রেরিতে। সেখান থেকে তুলসা শহরের অ্যাস্ট্রোনমি ক্লাবে যান। সেখানকার বিশেষজ্ঞরা একে দেখাতেই বুঝতে পারেন, এটি মানুষের তৈরি কোনো যানের অংশ। তাদের সহায়তায় লটি যোগাযোগ করেন ইউনিভার্সিটি অব তুলসা এবং ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে। একপর্যায়ে অদ্ভুত সেই ধ্বংসাবশেষটি পরীক্ষার জন্য পৌঁছায় ভার্জিনিয়ার ‘দি অ্যারোস্পেস করপোরেশন’-এর গবেষণাগারে। দীর্ঘ পরীক্ষার পর বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এটি আসলে মহাকাশযানে ব্যবহৃত উচ্চমানের ফাইবারগ্লাসের একটি গলে যাওয়া টুকরো। অর্থাৎ এটি নিশ্চিতভাবে একটি স্পেস জাঙ্ক বা মহাকাশ বর্জ্য! প্রশ্ন হলো, এটি কার? ওই সময়ে পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা বস্তুগুলোর ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। তাতে বেরিয়ে আসে আসল ‘অপরাধী’র নাম। বস্তুটি ছিল মূলত ‘ডেল্টা টু’ রকেটের দ্বিতীয় স্তরের একটি অংশ। ১৯৯৬ সালের এপ্রিলে ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যানডেনবার্গ বিমান ঘাঁটি থেকে একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের কাজে এটি ব্যবহার করা হয়।
তথ্যসূত্র: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ওয়েবসাইট
- বিষয় :
- পৃথিবী