মাধ্যমিকের ফল
ইংরেজি-গণিতে দক্ষ শিক্ষকের সংকট কতকাল
সাব্বির নেওয়াজ
সাব্বির নেওয়াজ
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৪২
এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার এক কঠিন বাস্তবতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে। ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার, জিপিএ ৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়া এবং ইংরেজি ও গণিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা কেবল একটি পরীক্ষার ফল নয়; দীর্ঘদিনের অবহেলা, নীতিগত দুর্বলতা ও শিক্ষক সংকটের সম্মিলিত প্রতিফলন।
শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এবার ‘মন খুলে’ নম্বর দেওয়া হয়নি। তাই প্রকৃত ফলই সামনে এসেছে। এই যুক্তি আংশিক সত্য থাকলেও প্রশ্ন হলো, যদি প্রকৃত মূল্যায়নই হয়ে থাকে, তবে
প্রকৃত সমস্যার মুখোমুখিও কি আমরা হবো? নাকি প্রতিবছর একইভাবে বলা হবে, ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীরা দুর্বল?
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য উদ্বেগজনক। মাধ্যমিক পর্যায়ে গণিত পড়ানো শিক্ষকদের প্রায় ৮৭ শতাংশেরই গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেই। ইংরেজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র; প্রায় ৮৫ শতাংশ শিক্ষক অন্য বিষয়ে ডিগ্রিধারী। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষক এমন একটি বিষয় পড়াচ্ছেন, যেখানে তাদের নিজস্ব একাডেমিক ভিত্তিই দুর্বল। এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যথাযথ মানের দক্ষতা প্রত্যাশা করা অবাস্তব। এটি শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শ্রেণিকক্ষে।
গণিত হয়ে উঠছে মুখস্থনির্ভর; যুক্তিনির্ভর নয়। ইংরেজি শেখানো হচ্ছে পরীক্ষা পাসের কৌশল হিসেবে; ভাষা হিসেবে নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সামান্য ভিন্ন ধরনের প্রশ্নেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছে। বোঝার পরিবর্তে মুখস্থ করার প্রবণতা তাদের সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস দুই-ই নষ্ট করছে। গণিত ও ইংরেজি এমন দুটি বিষয়, যেগুলো মুখস্থ করে আয়ত্ত করা যায় না। এগুলো বোঝাতে হয়; অনুশীলনের মাধ্যমে দক্ষতা গড়ে তুলতে হয়। কিন্তু যখন শিক্ষক নিজেই বিষয়টির গভীরে প্রশিক্ষিত নন, তখন পাঠদানও হয়ে পড়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও মুখস্থনির্ভর। ফলে প্রশ্নপত্রে সামান্য পরিবর্তন এলেই শিক্ষার্থীরা উত্তর খুঁজে পায় না। এই দুর্বলতার মূল্য তারা দেয় এসএসসি, এইচএসসি, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা; শেষ পর্যন্ত চাকরির বাজারে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এ সংকট নতুন নয়। বহু বছর ধরে শিক্ষাবিদ, শিক্ষা কমিশন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম একই সমস্যার কথা বলে আসছেন। কিন্তু বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, বিদ্যমান শিক্ষকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ কিংবা যোগ্যতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব কমই ঘটেছে। ফলে সমস্যাটি বছর বছর আরও গভীর হয়েছে।
এর সামাজিক প্রভাবও কম নয়। দক্ষ শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের বড় অংশ প্রাইভেট ও কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যেসব পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা অতিরিক্ত খরচ করে ঘাটতি পূরণ করতে পারছে। কিন্তু দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেই বৈষম্যের একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হচ্ছে।
অবশ্য এবারের ফল খারাপ হওয়ার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। নবম ও দশম শ্রেণিতে আলাদা শিক্ষাক্রমে পাঠদান, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, ডিভাইসে আসক্তি কিংবা গত কয়েক বছরের সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এসব কারণ সাময়িক; দক্ষ শিক্ষকের সংকট দীর্ঘমেয়াদি এবং কাঠামোগত। তাই মূল সমস্যা পাশ কাটিয়ে অন্য কারণ সামনে আনলে সমাধান মিলবে না।
এখন শুধু ফল বিশ্লেষণ নয়; প্রয়োজন সাহসী নীতিগত সিদ্ধান্ত। প্রথমত, ইংরেজি ও গণিতে বিষয়ভিত্তিক ডিগ্রিধারী শিক্ষক নিয়োগ কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেসব শিক্ষক ইতোমধ্যে কর্মরত কিন্তু সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাডেমিক প্রস্তুতি নেই, তাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনঃপ্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদ্যালয়ে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ফল মূল্যায়নের মাধ্যমে কোথায় দুর্বলতা তৈরি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগ, পদায়ন ও প্রশিক্ষণকে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বিবেচনার বাইরে এনে সম্পূর্ণ পেশাগত মানদণ্ডের ভিত্তিতে পরিচালিত করতে হবে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করার কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সেই প্রস্তুতির ভিত্তি গড়ে ওঠে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। সেখানে যদি ইংরেজি ও গণিতের শিক্ষকই বিষয়ভিত্তিক দক্ষ না হন, তাহলে ভবিষ্যতের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার স্বপ্ন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
প্রতিবছর ফল প্রকাশের পর ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতার একই ব্যাখ্যা শুনতে শুনতে সমাজ ক্লান্ত। শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা শিক্ষক– কেউই আর এর পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না। যদি সত্যিই শিক্ষার মানোন্নয়ন সরকারের অগ্রাধিকার হয়, তাহলে সবচেয়ে আগে বিনিয়োগ করতে হবে দক্ষ শিক্ষক তৈরিতে। কারণ একটি পাঠ্যবই যতই উন্নত হোক; যতই আধুনিক শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হোক; একজন অদক্ষ শিক্ষক সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে সফল করতে পারেন না।
এসএসসির এবারের ফল তাই কেবল একটি সতর্কবার্তা নয়; শিক্ষা সংস্কারের জন্য শেষ দিকের একটি সুযোগও বটে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়; আমরা কি আগামী বছর একই প্রশ্ন করব– ‘ইংরেজি-গণিতে এত ফেল কেন?’ নাকি এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে এই প্রশ্নটি আর করতে হবে না?
সাব্বির নেওয়াজ: বিশেষ প্রতিনিধি, সমকাল
Sabbir.newaz@gmail.com
- বিষয় :
- এসএসসি
- সাব্বির নেওয়াজ